নজরুল - হাফিজ: মিলনের সুর ড. কামরুল হাসান

OHS
By - Imran Ali Shagor
0

নজরুল - হাফিজ: মিলনের সুর

ড. কামরুল হাসান

নজরুল ও হাফিজ বাংলাদেশ ও ইরানের বহুপ্রজ প্রতিভাধর দুই কাব্যযোদ্ধা। তারা দুইজনই নিজদেশ ও দেশের বাইরে সমান জনপ্রিয়। কবিতা ছিলো তাদের আরাধনা। দেশপ্রেম ছিলো স্বপ্ন সাধনা। বরেণ্য এই কবিদ্বয়ের জীবন ইতিহাস কিংবা তাদের অবদান বিস্তর ও বিশাল। বক্ষমাণ প্রবন্ধে কেবলই তাদের ঐকতানের দ্যোতনার কিঞ্চিৎ মূর্চ্ছনা বিতরণের প্রয়াস পাবো।

কবিরা বিশেষ কোনো জাত বা পাতের নন। তারা কোনো বিশেষ গোত্র, অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর নন। বরং কবিরা হয়ে থাকেন সমগ্র জনতার, সমগ্র বিশ্বের, কুল কায়েনাতের, সমগ্র মানবতার। সকল দেশের সকল কবিই সমগ্র মানবতার সম্পদ। সব থেকে বড় কথা হলো- হর্ষ, বিষাদ, প্রেম কিংবা আনন্দের চরিত্র কিংবা প্রকাশ জামানা ও এলাকা ভেদে আলাদা হয় না।

প্রেমের আকুতি এবং দুঃখের আর্তির প্রকাশ সবদেশে, সবকালে একই সুরে অনুরণিত ও গুঞ্জরিত। এই ঐক্য এবং ঐকতান যুগে যুগে কবিদের মাঝে প্রত্যক্ষ করা যায় সর্বতোভাবে।

তাই -           

ইরাকের রুসাফি আর বাংলার জীবনানন্দ কিংবা

মসনবীর রুমি    আর বাংলার রবীন্দ্র কিংবা

সিরাজের হাফিজ আর আমাদের নজরুল কিংবা

ব্রিটেনের শেলি   আর বাংলার সৈয়দ শামসুল

তাদের উচ্চারণের মাঝে মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাই না। যদিও তাদের দেশ, জাতি, ভাষা ও জামানার মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। তাদের এই সাদৃশ্য এবং মিলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো- তারা সবাই কল্যাণের বার্তাবাহী। সত্য ও সুন্দরের স্বপ্নদ্রষ্টা। তারা সবাই মানবতাবাদী।

কবির চৈতন্য হয়ে থাকে সর্বদাই মুক্তচৈতন্যের উৎস। আরব নাকি আজম, পারস্য নাকি ইউরোপ, প্রাচ্য নাকি প্রতীচ্য, দেশি নাকি বিদেশী, এশিয়ান নাকি ওসিয়ান এই বিবেচনা কখনও কোনো কবিকে সঙ্কুচিত করে না। মানুষ, মানবতা, মানবিকতাই একজন কবির কাছে উত্তুঙ্গ সত্য রূপে ধরা দেয়। অহিংসা এবং অবৈরিতা হয় তার গন্তব্যের শেষ বিন্দু।

ইরান এবং বাংলার যোগাযোগ অত্যন্ত টেকসই, নিখাঁদ এবং প্রাকৃতিক। এই দুই দেশের বাণিজ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যোগাযোগ অত্যন্ত প্রাচীন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস বিবেচনা করলে পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি নানা ক্ষেত্রে আমাদের থেকে অগ্রগামী বা ঐতিহ্যে বয়েসী। তবে আমাদের স্বীকৃতিবোধ ও ঔদার্য অবশ্যই ঈর্ষণীয়।

একদিকে ইরানীদের ঐতিহ্য অন্যদিকে বাংলার উদার্য।

একদিকে শিরাজের অনবদ্যতা অন্যদিকে বাংলার সকৃতজ্ঞতা।

এ দুয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক অনুপম মেলবন্ধন। ইরান-বাংলার একত্র সাহিত্যবাস। নজরুল-হাফিজের মিলন সুর।

বাংলার বুলবুল কাজী নজরুল এবং বুলবুল-ই-সিরাজ কবি হাফিজের পরিচিতি আমাদের প্রায় সকলের জ্ঞাত ও অধীত। তবুও হাফিজ (... মৃ. ৭৯১হি. মোতাবেক ১৩৮৯খ্রি.) বুলবুল-ই-সিরাজ নামেই যার খ্যাতি সমধিক। বুলবুল-ই-সিরাজ এর অর্থ হলো- সিরাজের ময়না। হাফিজকে পারসিকরা ‘লিসান উল গায়েব’ বা  প্রচ্ছন্নের অভিব্যক্তি, ‘তরজমানুল আসরার’ বা রহস্য ব্যাখ্যাতা ইত্যাদি নামে চিনে থাকে। তার প্রকৃত নাম কবি শামসুদ্দিন মুহাম্মদ। আর তার তাখাল্লুস বা ছদ্মনাম হাফিজ। কাব্য তার নেশা ও পেশা। সঙ্গীত তার বেদনার্ত অন্তরের আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ।

আর কাজী নজরুল একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সুরকার, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার, চিত্রকর, বংশীবাদক, অভিনেতা, উপন্যাসিক, সাহিত্য সমালোচক, বায়োনভেলিস্ট, অত্মচরিত রচয়িতা, ঐতিহাসিক, শিশু সাহিত্যিক, বাগ্মী, সংগঠন ¯্রষ্টা, যাত্রা প্রযোজক প্রভৃতিসহ সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় ছিল তার সদম্ভ পদচারণা। বাংলা সাহিত্যের একক এবং অদ্বিতীয় প্রোজ্জ্বল সাহিত্য তারকা। এর বাইরেও তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ সমাজচিন্তক ও কাব্য দার্শনিক।

পারস্য সাহিত্যের ইতিহাস প্রায় দুই সহ¯্রাব্দের পুরাতন ইতিহাস। পারস্যের সাথে বাংলার বাণিজ্য সম্পর্ক আরো প্রাচীন। পারস্য ভাষা ও সাহিত্যের সাথে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের লেনদেনের শেকড় এখানেই।

ঐঁসধহরঃধৎরধহ পৎবধঃরাব বীঢ়বৎরবহপব তথা মানবিকতার সুশীল অভিব্যক্তি-র উপস্থিতি বুলবুল-ই-সিরাজ এবং বাংলার বুলবুল নজরুল সাহিত্যে অতি প্রবল। সে কারণেই এই দুই ভাষার জনগণের কাছে তারা এতটা প্রিয়। জনদৃষ্টি আকর্ষণে তারা এত বেশি সফল।

চড়বঃ ড়ভ খড়াব এবং চড়বঃ ড়ভ জবাড়ষধঃরড়হ একদিকে প্রেমের কবিতা অন্যদিকে বিদ্রোহের কবিতা যাকে যে অভিধায় অভিষিক্ত করা হোক না কেন তাতে ততটা তৃপ্ত হওয়া যায় না যতটা তৃপ্ত হওয়া যায় তাদেরকে মানবতাবাদি কবি আখ্যা দিতে পারায়। এ যেন প্রেমের সাথে বিদ্রোহ ও বিদ্রোহের সাথে প্রেমের মাখামাখি।

তাদের মাঝে কাল বৈভিন্ন ছিল। কালের দূরত্বও ছিল। তবে তাদের কবিতা রচনায় ছিল মহৎ ঐক্য। জামানা বিবেচনায় হাফিজ পূর্ব জামানার হবার কারণেই হাফিজের কবিতার অনুরক্ত পাঠক ছিলেন নজরুল। তার কবিতা পাঠের অনুরক্তি তাকে হাফিজের ভক্ত বানিয়ে ছাড়ে। হাফিজের কাব্যশক্তি নজরুলকে তার কবিতার অনুবাদে আকৃষ্ট করে। এমনকি নজরুল হাফিজের প্রায় পৌনে একশত কবিতার সার্থক বাংলা অনুবাদ করেন সরাসরি ফার্সি ভাষা হতেই। এ স্বাতন্ত্র কেবলই তার। নজরুলের কাব্যশক্তির নেপথ্য স্পৃহায় সিরাজের কবি হাফিজ খুব শক্ত প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। নজরুল কাব্যে হাফিজ তথা ফারসির প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যায় তুমুলভাবে। নজরুলের পদ্য-গদ্য, গল্প-কবিতা, প্রবন্ধের সর্বত্র ফারসি শব্দের প্রভাবের দেখা মেলে। এটি কবি নজরুলের বাধ্যকতা নয়। বরং এ তার অত্যাগ্রহ। হাফিজের এই প্রভাবকে গুরুত্ববহ করে তুলেছে বাংলা একাডেমির সম্প্রতি প্রকাশিত নজরুল সাহিত্যে আরবি-উর্দ্দু-ফারসি শব্দের অভিধান প্রণয়ন।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বৃত্ত ও বলয় ছিল নিশ্চয়ই। যা ছিল একান্ত তারই। এ বৃত্ত-বলয়ে অন্যের প্রবেশাধিকার ছিল সংরক্ষিত। কোনো ব্যক্তি চরিত্র প্রভাবক হিসেবে গুরুত্ববহ না হলেও ভিন ভাষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি নজরুল ছিলেন সতর্ক এবং উদার। তার দুয়ার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে প্রবেশাধিকার ছিল সংরক্ষিত ও অনুমতি সাপেক্ষ। নজরুলের কবিতা পাঠ করলে ও গান শুনলেই বুঝা যায় ফারসী ভাষার সাহিত্য রসে তিনি ছিলেন উতলা। হাফিজের সাহিত্য রস অতিব উপাদেয় রূপে ধরা দেয় নজরুলের কাব্যশক্তির কাছে।

আরবী ও ফারসীর অনুরক্ত পাঠক হিসাবে দেখা যায় কবি নজরুল সেই বাল্যবেলা থেকেই মক্তবের মৌলভি কাজি ফজলে আলির কাছে আরবীÑফারসীর প্রাথমিক পাঠ এবং পরবর্তীতে আপন উদ্যোগে নজরুল এই দুই ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ফলে দেখা যায়Ñ নজরুল আরবী ১৬টি ছন্দের প্রত্যেকটি দিয়ে কবিতা রচনার সক্ষমতা এবং ফারসী কবিতার যুতসই বাংলা অনুবাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেন। উল্লেখ্য, আরবী কবিতার প্রতিটি ছন্দ-মাত্রাই বেশ জটিল। তাছাড়াও আরবী ছন্দের মাত্রাকে বাংলায় বশীভূত করার সক্ষমতা কেবল তিনিই দেখিয়েছেন।

এক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবকের কাজ করেছিলো সিরাজের বুলবুল কবি হাফিজ ও তার কবিতা। হাফিজের প্রভাবে নজরুল এতো বেশি আপ্লুত ছিলেন যে, তিনি হাফিজকে আমার বন্ধু, আমার প্রিয়তম ইরানী কবি বলে আখ্যা দিয়েছেন। কবি হাফিজের কবিতার সরাসরি ফারসী হতে বাংলায় স্বার্থক অনুবাদ এবং আরবীর ফর্মে বাংলায় কাব্যসৃজন থেকে এটি অত্যুক্তি হবে না- ফারসি ও আরবী ভাষায় নজরুল-এর জ্ঞান ছিলো পাণ্ডিত্যের পর্যায়ে।

হাফিজের সাথে নজরুলের সখ্য এবং অগ্রজের প্রতি অনুজের দায়বোধ অনুমান করা যায়- বুলবুলের মৃত্যু শিয়রে বসে রুবাইয়াত-ই-হাফিজের অনুবাদ শেষ করার দৃশ্য দেখলে। যে-কোনো সাহিত্যপ্রেমী বলতে বাধ্য হবেন- এ যে শিষ্যত্বের মহানত্ব, গুরুর প্রতি ভক্তের অকৃত্রিম শ্রদ্ধার্ঘ। রুবাইয়াত-ই-হাফিজের অনূদিত বইয়ের উৎসর্গপত্র একই সাথে আবেগ, আর্তি ও আকুতির এক পবিত্র শে^তপত্র। নজরুল সেখানে লিখেছিলেন-

বাবা বুলবুল!

তোমার মৃত্যু শিয়রে বসে বুলবুল-ই শিরাজ

হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি, যেদিন

অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি আমার

কাননের বুলবুলি উড়ে গেছ। যে দেশে গেছো তুমি,

সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর?

জানি না তুমি কোথায়? যে লোকেই থাক, তোমার

শোক-সন্তপ্ত পিতার এই শেষ দান শেষ চুম্বন বলে গ্রহণ করো।

তোমার চার বছরের কচি গলায় যে সুর শিখে গেলে,

তা ইরানের বুলবুলিকেও বিস্ময়ান্বিত করে তুলবে।

শিরাজের বুলবুল কবি হাফিজের কথাতেই

তোমাকে স্মরণ করি,

‘সোনার তাবিজ, রূপার সেলেট

মানাত না বুকে রে যার

পাথর চাপা দিল বিধি

হায়, কবরের শিয়রে তার।।

নজরুল এবং হাফিজ যেন একই ধারা হতে উৎসারিত দুইটি স্রোতস্বিনী। নজরুল যেন পথ চলেছেন হাফিজের পথ ধরেই। নজরুল চিত্রকল্পে হাফিজ প্রতিমূর্ত প্রায়শ। হাফিজের রঙিন চিত্রকল্পে আমরা দেখি-

রক্ত-রাঙা হ’ল হৃদয়

তোমার প্রেমের পাষাণ-ব্যথায়।

তোমার ও’রূপ জ্ঞান-অগোচর

পৌঁছে না ক দৃষ্টি সেথায়।

জড়িয়ে গেল ভীরু হৃদয়

তোমার আকুল অলক-দামে,

সন্ধ্যা-কালো কেশে বাঁধা

দেখছি ওরে ছাড়ানো দায়।

আবার নজরুলের কালার্ড ইমেজ লক্ষ করলে দেখা যায়-

নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা লাল তেরি খুন কি খুনিয়া।।

উপর্যুক্ত কবিতাংশের একটি শব্দও বাংলা নয়। কিন্তু আমাদের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। ফারসী শব্দের বাংলায় সমন্বিত উপস্থাপনের যাদুকরি কারিশমায় কবি নজরুল এমনই সফল। কবির স্বার্থকতা এবং স্বাতন্ত্র এখানেই।

অথবা

ললাটে তোমার ভাস্বর টীকা

ব¯্রা গুলের বহ্নিতে লিখা।।

নজরুলের ইসলামী গজলে শোনা যায় হাফিজের গজলের অনুরণন। হাফিজের সুরে শোনা যায়-

আশ^াসেরই বাণী তোমার

প্রতীক্ষার ঐ দূর সাহারায়

ফিরছে আজো আর কতদিন

ঢাকবে রবি মরুর ধুলায়।

আর বাংলার আশিক কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে অনুরণনিত হয়-

ওরে কে বলে আরবে নদী নাই।

যথা রহমতের ঢল বহে অবিরল

দেখি প্রেমে-দরিয়ার পানি, যেদিকে চাই।।

যাঁর কাবা ঘরের পাশে আবে-জমজম

যথা আল্লা-নামের বাদল ঝরে হরদম

যার জোয়ার এসে দুনিয়ার দেশে দেশে

পুণ্যের গুলিস্তান রচিল দেখিতে পাই।।

যার ফোরাতের পানি আজো ধরার পরে

নিখিল নর-নারীর চোখে ঝরে

(ওরে) শুকায় না যে নদী দুনিয়ায়।।

 

যার শক্তির বন্যার তরঙ্গ-বেগে

যত বিষন্ন-প্রাণ ওরে আনন্দে উঠল জেগে

যাঁর প্রেম-নদীতে, যাঁর পুণ্য তরীতে

মোরা ত’রে যাই।।

আমরা নজরুলের গোটা সংগীতকেই উল্লেখ করেছি লোভ সংবরণ করতে পারিনি বলেই। পুরো সংগীতজুড়েই কবি নবী প্রেমের যে ক্যানভাস অঙ্কন করেছেন তা সত্যিই অনবদ্য। কবির কল্পনা শক্তির যে প্রক্ষেপণ এতে রয়েছে তা যে-কোনো মানুষকে বিস্মিত না করে পারে না। কল্পনা শক্তির বলেই তিনি আরবকে প্র¯্রবনের ধারায় প্লাবিত করেছেন। একটি কালার্ড ইমেজের মাধ্যমে নবীর প্রতি তার আসক্তিকে প্রগাঢ় করেছেন।

বস্তুত হাফিজের গান-গজল ও নজরুলের গজল ও শ্যামাসংগীতের মূল বিষয়বস্তুই ছিল সৃষ্টিকর্তা ও নিরেট ধর্ম। প্রেম ব্যতিত দ্রোহ যেন জমে উঠে না। প্রেমিক কবি হাফিজের প্রেমের সাথে বিদ্রোহী কবি নজরুলের প্রেম যেন একই সূত্রে গাঁথা। তুর্কি বালিকার প্রেমে উন্মাদ কবি হাফিজ। হাফিজ তার প্রেমিকার জন্য সবকিছু করতে পারেন। সমগ্র রাজ্যও তাকে লিখে দিতে পারেন। প্রেম উচ্ছ¡াসে উচ্ছল কবি হাফিজ তার প্রেমিকার জন্য বোখারা, সমরকন্দ উৎসর্গ করেন এভাবেÑ

যদিই কান্তা শিরাজ-সজনী ফেরত দেয় মোর চোরাই দিল ফের

সমরকন্দ ও বোখারার দিই বদল তার লাল গালের তিলটের।।

আর কয়েক শতাব্দী পরের কবি নজরুলের রোমান্টিকতা যেন আরো বেড়ে যায়। তিনি তো চন্দ্র-সূর্যকেও প্রেমিকার হাতে তুলে দিতে চান কেবলই প্রেমের বদলায়। নজরুলের প্রেমিক কণ্ঠে উচ্চারিত হয়-

মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী

দেবো খোপায় তাঁরার ফুল

কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথি

চৈতী চাঁদের দুল।।

সমাজ বিনির্মাণে হাফিজ ও নজরুল এক ও অভিন্ন আত্মার। মহাকবি হাফিজ ছিলেনÑ কপট, ভÐ-তপস্বী, শাসকদের স্বৈরাচারীতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। আর বাংলার কবি নজরুলের আক্রমণ ছিলো ধর্মান্ধ, মনোবৈকল্য, দুঃশাসন ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে। হাফিজের কণ্ঠে দৃঢ় উচ্চারণÑ

তোমার আঁখি জানে যথা

বঞ্চনা আর ছলচাতুরি

চমকে বেড়ায় অসি যেন

রণাঙ্গনে ঘুরি ঘুরি।

তড়িত-জ¦ালার ও-চোখ ত্বরিত

গোল বাধারে বধুর সাথে,

যে হিয়াতে শিলা ঝড়ে,

হায় গো তারি তরে ঘুরি।।

কবি এখানে বঞ্চনা আর ছল-চাতুরির বিরুদ্ধে তার সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। যাবতীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি অসি ধারণ করেছেন। তার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন মসির সুতীব্র উচ্চারণে।

আর নজরুল তো বিদ্রোহের মশাল হাতে তীব্র প্রতিবাদী। মাজলুমের পক্ষে তার সরাসরি অবস্থান। শুধু অত্যাচার নয় অত্যাচারীর বিরুদ্ধেও তার বিদ্রোহ সমান প্রতিবাদী। অধিকার, স্বাধিকার, স্বাধীনতা প্রশ্নে নিরাপোষ কবির দৃপ্ত উচ্চারণÑ

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়গ কৃপান ভীমরণ-ভূমে রণিবে না

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হবো শান্ত...

হাফিজ নজরুল একে অন্যের পরিপূরক। নজরুলের সাহিত্য সৃষ্টি ও হাফিজের কাব্যকর্ম উভয়ই আজ বিশ^বাসীর এক মহামূল্যবান সম্পদে পরিণত। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই তাদের সাহিত্যের সংরক্ষণ ও বিশে^র বহুল প্রচলিত ভাষায় তাদের সৃষ্টিকর্মের অনুবাদ খুবই প্রয়োজন। দেশকে টিকিয়ে রাখতে, দেশের স্বাধীনতা অর্থবহ করতে, মানবতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের সম্প্রসার অব্যাহত রাখেতে এর কোনো বিকল্প নেই।

অনেক দূরের দুই কবি যাদের কারো সাথে কারো কোনো সাক্ষাৎ হয়নি কোনোদিন। অথচ তাদের মধ্যকার অসংখ্য মিল এ কেবলই দৈবাৎ নয়। এ যেন অলৌকিকও। আমরা এ দুই কবির ধর্ম ভাবনা ও মৃত্যু চেতনায় সাদৃশ্য দেখলে অবাক হই। হাফিজের ধর্ম কী ছিলো তা নিয়ে সংশায়াবিষ্ট ছিলো তার ভক্তসমাজ। তাই তার মৃত্যুর পর সৎকার নিয়ে বাধে বিপাক। তার সমাধান কল্পে উন্মোচন করা হয় হাফিজের কাব্য খাজাঞ্চি। এটি সে সময়ের রেওয়াজও ছিল। তার কাব্যসমগ্র খুললেই তাতে বেরিয়ে আসেÑ

কদমে দরিগ মদার আজ জানাযায়ে হাফিজ

কে গরচে গর কে গোনাহসত মি রওদ বেহেশত্।

নজরুল এ কবিতার অনুবাদ করেছেন এভাবে-

হাফিজের এই শব হতে গো তুলো নাকো চরণ প্রভু

যদিও সে মগ্ন পাপে বেহেশত্ সে যাবে তবু?

কবি নজরুলের ধর্ম, আকিদা নিয়ে তার জীবদ্দশায় অনেক কথা কিংবা দলাদলি থাকলেও কবির মৃত্যুর পর এমন সমস্যা হয়নি। কবির একটি গানই তার ধর্ম বিশ^াস প্রকাশের জন্য যথেষ্ট ছিলো।

মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই

যেন গোর হতেও মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।

বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ হাফিজকে বাংলায় আমন্ত্রণ জানালে কবি তা সানন্দে গ্রহণ করেন। উচ্ছ¡সিত বার্তাও প্রেরণ করেন-

আজকে পাঠাই বাংলায় যে ইরানের এই ইক্ষু শাখা

এতেই হবে ভারতের সব তোতার চঞ্চু মিষ্টি মাখা।

তবে তার বাংলায় আর আসা হয়নি। এক দৈব ঝড় তার পথে অন্তরায় হয়। খোদ কবি নজরুল ইসলামের মন্তব্য এখানে খুবই মূল্যবান। তিনি লিখেন-পারসিক কবি হাফিজের মধ্যে বাংলার সবুজ দুর্বা ও জুঁই ফুলের সুবাস প্রিয়ার চূর্ণ কুন্তলের যে মৃদু গন্ধের সন্ধান পেয়েছি সে সবই তো খাঁটি বাংলার কথা। বাঙালীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আনন্দ রসের পরিপূর্ণ সমারোহ।

বস্তুত নজরুল ও হাফিজের কাব্য রচনার দূরত্ব কয়েক শতাব্দীর হলেও তাদের জীবনাচার, কাব্য শক্তির অন্তর রহস্য, জীবন সংগ্রাম, পরিমিতিবোধ, প্রতিবেশের সাথে সাংঘর্ষিকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যোগসূত্র ও সাদৃশ্য ছিল অনেকটাই ঐশ^রিক।

লেখক: বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)