সাহিত্য হিসেবে নাটক ও মঞ্চকলা - আবু হেনা আবিদ জাফর

OHS
By - Imran Ali Shagor
0


নাট্য
সম্ভবত শিল্প ও ললিতকলার সবচেয়ে শক্তিমত্ত নিদর্শন। নাট্যে আমরা পারফর্মিং আর্ট ও নন-পারফর্মিং আর্টের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় দেখতে পাই। নাটক করতে যেমনি আবৃত্তি, সঙ্গীত, এমনকি নৃত্যকেও আত্মস্থ করতে হয়, বিজ্ঞানকেও তেমনি আয়ত্তে আনতে হয়। খৃ: পূ: ৪৬৫ সালে ইস্কিলাস ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’ রচনা করেন। শৃংখলিত প্রমিথিউস মানুষের হাতে ভবিষ্যত বিজ্ঞানের রূপক আগুন তুলে দেয়। অভিনয় যেমনিভাবে পারফমিং আর্টের একটি জঙ্গম প্রকাশ, তেমনিভাবে সামগ্রিক অর্থেই মঞ্চকলা, এমনকি সাহিত্য হিসেবে নাটক নন-পারফমিং আর্টের একটি উন্নত উপস্থাপনা। 

ইদানীং নাটকের উপলক্ষ্য যেমন পাল্টেছে, তেমনি পাল্টে গেছে এর স্টাইল, এমনকি দর্শকও। আজকের দর্শক আর নাটকে শুধু অভিব্যক্তির প্রকাশ দেখতে যায় না, মঞ্চ প্রকরণের বিস্ময়কর প্রয়োগ দেখে মুগ্ধ হতে চায়। একটি নাট্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উঁচু আসনটি আজ নির্দেশকের; অথচ শিল্পের বাজারে সাহিত্য হিসেবে নাটক যে কত উঁচু মূল্যে বিকোয় তা আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছি।

নাটকের দু’টি ভূমিকা: একটি মঞ্চে- যুথবদ্ধ দর্শকের সামনে, অন্যটি পাঠকক্ষে- নির্জন মুহুর্তের উপভোগে। নাটক শুধু মঞ্চে অভিনয়ের জন্যই না, সাহিত্য হিসেবে পাঠের জন্যও। মঞ্চের অভিনয় শেষ হয়ে গেলে নাটকের ভূমিকা শেষ হয়ে যায় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী সাহিত্যানুরাগী পাঠক সে নাটক পড়ে উদ্বেলিত হন। ভিন্ন ভাষায় উন্নত নাট্য সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির রসাস্বাদন সম্ভব পঠনের মাধ্যমেই। শেক্সপিয়র শ্রেষ্ঠ নাট্য প্রতিভা হিসেবে বিবেচিত শুধু এই কারণে নয় যে তিনি মঞ্চে অভিনয় যোগ্য নাটক লিখেছেন বরং এই কারণেও যে তিনি জীবনের অপরূপ মহাকাব্য লিখে গেছেন যা সুপাঠ্যও। 
কবিতা সার্বজনীন। কিন্তু নাটকের জন্য চাই বিশেষ শিল্প অভিজ্ঞতা। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, অনুভব ও কল্পনাকে অবলম্বন করে একজন নাট্যকারকে কলম ধরতে হয়। তিনি একজন স্ক্রিপ্ট লেখক মাত্র নন, তিনি একজন শিল্পী। ইতিহাস, দর্শনকে আত্মস্থ করতে হয় তাকে। কালের দৈর্ঘ্য-প্রস্থকে নয়, তার গভীরতাকেও ধারণ করেন তিনি। এভাবেই রচিত হয় উত্তম নাটক, তাই আমরা বছরে বছরে জন্ম নিতে দেখি না ইবসেনকে, শেক্সপিয়র কিংবা সফোক্লিসকে। একজন বার্নাড শ’র জন্য ইংরেজি সাহিত্যকে আড়াইশ’ বছর অপেক্ষা করতে হয়। চেকভকে অতিক্রম করতে পারে না কোন রুশ নাট্যকার। 
আমরা যে সব গ্রীক ও এলিজাবেথীয় নাটক পড়ি, বস্তুত চিরায়ত যে নাটকই পড়ি, তা উন্নত সাহিত্য হিসেবে লেখা হয়েছিল বলেই মহৎ নাটক হতে পেরেছে; মঞ্চে ও পাঠে আজও তা আমাদের উদ্বেলিত করে। এসব নাটক যখন লেখা হয়েছিল তখন নাটক ছাপার কোন ব্যবস্থা ছিল না, কিংবা আজকের দিনে বইয়ের বাজার বলতে যা বুঝায় সে অর্থে সাহিত্য হিসেবে নাটকের কোন বাজার ছিল না। তবু এসব নাটক কালোত্তীর্ণ হলো কিভাবে ?

মঞ্চকে আশ্রয় করে স্বকালে আদৃত হয়েই এদেরকে সময়ের সিড়ি ডিঙ্গিয়ে আসতে হয়েছে। 
নাটক মঞ্চে অভিনয়ের জন্যে লিখিত সংলাপ-নির্ভর সাহিত্য হলেও থিয়েটারে অভিনীত কোন নাটকই নাট্যকার লিখিত পাÐুলিপি মাত্র নয়। সাহিত্য মূল্য বিচারে নাটকের একটি গুরুত্ব অবশ্যই আছে, তবে উত্তীর্ণ নাটকের জন্য মঞ্চসফলতা একটি অনিবার্য প্রয়োজন। নাটককে সফল হতে হলে তার মধ্যে যেমন নাটকীয়তা থাকতে হবে, তেমনি থাকতে হবে মঞ্চগুণ। দ্ব›দ্ব নাটকের আত্মা, তবে সংলাপ নাটকের প্রাণ। বহুবর্ণিল কাহিনী, রহস্যঘন বহুমাত্রিক চরিত্র সৃষ্টির পর সংলাপকেও ঋদ্ধ হতে হয় মেধায়, ভাষায় ও মননে। অভিনয় সফল হলেই নাটক সফল মনে করা ঠিক না। নাটকের বিচার হবে একই সঙ্গে- মঞ্চযোগ্যতা দেখে এবং সাহিত্যের মানদÐে। যে নাটক মঞ্চযোগ্য নয়, তা যেমন নাটক না; যে নাটক মঞ্চযোগ্য কিন্তু সাহিত্য হিসেবে নিকৃষ্ট, তাও নাটক না। নাটক রচনার সময় নাট্যশৈলী ও মঞ্চের প্রয়োগ পদ্ধতি সম্বন্ধে পূর্ণ সজাগ থাকতে হয় নাট্যকারকে।

শেষ পর্যন্ত মঞ্চই নাটককে ধারণ করে। নিঃসঙ্গ একাকী শিল্পী দ্বারা সুর সৃষ্টি হয়, ক্যানভাসে ছবি আঁকা যায়, কবিতা বা সাহিত্য সৃষ্টিও সম্ভব, কিন্তু নাট্য-‘পাÐুলিপি’ রচিত হলেও ‘নাট্য’ শিল্প সম্ভব না। নাটকের জন্য চাই মঞ্চ। সাজিয়ে তোলা না হলেও, অন্তত চাই কোন (ত্রিমাত্রিক) স্থান, চাই পাত্র-পাত্রী, কলাকুশলী, আর চাই দর্শক (প্রতিক্রিয়া)। নাটক কবিতার খাতা না, যে দেরাজবন্দী থেকে গেলেও পরবর্তী কোন অনুকূল সময়ে উদ্ধার পেয়ে শিল্প-মূল্যে ঝলসে উঠবে; কিংবা ক্যানভাসের ছবিও না যে সমকালীন উপেক্ষা পেরিয়ে ভ্যানগগ, পল গঁগ্যার অবিক্রিত অবহেলিত ছবির মত শত বছর পরে তার যথা-মূল্য আদায় করে নেবে। নাটক সময় ও স্থানের গÐিতে এবং মঞ্চকলার চাতুর্যে এত বেশি আবদ্ধ যে কেবল কালের স্বীকৃতি এবং মঞ্চ প্রকরণের সমসাময়িক কারিগরী উৎকৃষ্টতার সমদক্ষতায় তা উত্তীর্ণ হতে পারে। 
জীবনে যখন সংঘাত সৃষ্টি হয় তখন তা নাটকের বিষয় হয়ে ওঠে। জীবন প্রতিফলিত হয় নাটকীয় আঙ্গিকে। বিমূর্ততায়, প্রতীকে, রূপকে, বিন্যাসে জীবনকে তুলে আনা হয় মঞ্চের আলোছায়ায়। এখানেই মঞ্চকলার বিরাট দায়িত্ব। নাট্যকারের প্রধান সহযোগী ও মন্ত্রণাদাতা হয়ে ওঠে মঞ্চকলা। জীবন ঠিকমতো বিম্বিত হয়ে উঠলো কি? নাট্যকার যে মেসেজটি দিতে চেয়েছেন তা কি দর্শকের মগজের গভীরে পৌঁছেছে? স্পর্শ করেছে কি তার হৃদয়? নইলে লাল-নীল বাতি জ¦লা, আবহ, শব্দের এতসব কারসাজির কি প্রয়োজন? এখানেই নাট্যকার এসে নির্দেশকের হাত চেপে ধরেন।
এক সময় দর্শক রঙ্গালয়ে যেত শুধু মুখ্য অভিনেতা/অভিনেত্রীকে দেখতে। অন্যান্য বিষয় ও পাত্রপাত্রীর প্রতি দৃষ্টি থাকতো কম মনোযোগী। এই স্টার ধারণাকে বাতিল করে দিয়ে প্রত্যেক অভিনেতাকে সমমূল্যায়ন করা শুরু করেন বিখ্যাত রুশ নাট্য নির্দেশক স্তানি¯øাভস্কি। তিনি বলেন, থিয়েটারে কোন অপ্রয়োজনীয় চরিত্র নেই। নাটকের নান্দনিক ঐক্য নিশ্চিত করবে নির্দেশক। নাট্য বিষয়, ফর্ম, স্টাইলের সমন্বয় ও নাট্যকারের অভিপ্রায় পরিস্ফুটনের দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। সেই থেকে শুরু হয় পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ এবং মঞ্চ প্রকরণের চর্চা। মঞ্চ প্রয়োগকলাকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে দীর্ঘকালের পরিবর্তন ও ক্রম বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আজকের এই পরিপক্ক অবস্থায় আসতে হয়েছে। অ্যাম্ফিথিয়েটারের চতুর্দিক খোলা দর্শকবৃত্তের গোলক ধাঁধাঁ থেকে অ্যাপ্রন স্টেজ, প্রসেনিয়ামের সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে আজ আধুনিক মঞ্চ স্থানিক সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করে প্রয়োজনে দর্শকদেরকেও গলাধ:করণ করেছে। বিবেক, কোরাস, ত্রয়ী ঐক্যের অনুশাসন তো কবে ভেসে গেছে, এমনকি অভিনেতা ও দর্শকদের অবস্থানের ব্যাকরণ পর্যন্ত ভেঙ্গে যাচ্ছে। অষরবহধঃরড়হ আর ঘধঃঁৎধষরংস জট পাকিয়ে গেছে; নাটকের ভড়ৎস, পড়হঃবহঃ, ংঃুষব নির্দেশকের পরিকল্পনার যধৎসড়হ  তে বন্দী হয়ে পড়েছে।

কিছু প্রধান অনুষঙ্গের দিক থেকে এক হলেও বিভিন্ন দেশে থিয়েটার সে সব দেশের লোক শিল্পের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এবং সে দেশের রাজনীতি ও সমাজ-পরিবেশের সংস্পর্শ থেকে বিষয় ও উপাদান গ্রহণ করে একেক জায়গায় একেক রকম রূপ নিয়েছে। বিষয় ও অভিনয় রীতির দিক থেকে আমাদের রয়েছে ঐশ^র্যময় উত্তরাধিকার। বাংলা নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তার অন্তর্নিহিত সঙ্গীতধর্মীতা, বর্ণনাত্মক সংলাপ ও নৃত্যভঙ্গীমা। তাই একটি পর্যায়ে এসে ইউরোপীয় নাটকের টেনশন ও ক্ষীপ্রতার বদলে গীতল ভাষা, চিত্রল বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতির লোকনাট্য অনুষঙ্গকে অঙ্গীকৃত করলে বাংলা নাটক একটি ভিন্ন শক্তিশালী মাত্রা পেয়েছে।

১৯৭৩ সালে সেই যে ‘নাগরিক’ বৃটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে বাদল সরকারের ‘বাকী ইতিহাস’ দিয়ে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চায়নের সূচনা করেছিল, তারপর ? তারপরের আর বাকী ইতিহাস কি এতটা পথ আসার? আমরা মঞ্চ ভেঙেছি, মঞ্চকে সাজিয়েছি মূর্ত-বিমূর্ত নানা ভঙিমায়। আবার মঞ্চ থেকে নীচে নেমে এসেছি দর্শকের মাঝে। মঞ্চে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ, মঞ্চে এসেছেন শেক্সপীয়র, ইবসেন, মলিয়ের, ব্রেখট প্রমুখেরা। আমাদের দেশীয় নাট্যকাররা এসেছেন অমিত তেজ ও সম্ভাবনা নিয়ে। প্রাচ্য ঘরানার নাট্যরীতি পাশ্চাত্য আঙ্গিককে পরাজিত করেছে। 

স্বাধীনতা উত্তরকালে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নাটকের স্পর্ধিত বিকাশই হচ্ছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। নতুন নতুন নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। নতুন নাটক লেখা হয়েছে, নতুন দল হয়েছে। স্টেজের অপরিসরতায় ভাবতে হয়েছে নতুন প্রয়োগ কৌশলের কথা। স্টেজ সাজাবার সহজ ধারণা এসেছে। মঞ্চে অভিনয়ে সনাতনী মেলোড্রামা-মার্কা উঁচুলয়ের সংলাপ প্রক্ষেপনের প্রভাব কেটে গেছে। তবে নিরীক্ষার নামে কিছু উদ্ভট ও অভিনব পরিকল্পনা নানান বর্জ্য পদার্থও সরবরাহ করেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কোন রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই ঐ সব নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। সময়ের দাবী মেটাতে চেয়েছে এসব নাটক, কিন্তু শিল্পের দাবী মেটাতে পারেনি। সমসাময়িক রাজনীতির সাথে কম্প্রোমাইজ করতে যেয়ে শিল্পের উৎকর্ষ থেকে সরে আসতে হয়েছে। বক্তব্যের বিষয় বলতে হবে বক্তৃতার ভাষায় নয়, শিল্পের ভাষায়। রাজনৈতিক স্থ’ূলতা মাঙ্গলিক চেতনাকে আহত করলে, আদর্শ আর রাজনৈতিক বিশ^াস জিগির হয়ে উঠলে শিল্পের বিনাশ অনিবার্য। 
সমগ্র মঞ্চরীতি ও উপস্থাপন পরিকল্পনার মধ্যে একটি যধৎসড়হু অবশ্যই থাকতে হবে। 
‘পোস্টার ড্রামা’ জাতীয় চড়া সুরের প্রযোজনা উত্তুঙ্গ বিদ্রোহী চেতনায় শিল্পের আঙ্গিক ও উপাদান দু’ক্ষেত্রেই প্রচলিত সব বিধান ভঙ্গ করেছিল। প্রলেতারীয় থিয়েটার এবং রাজনৈতিক থিয়েটার তাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। প্রবল প্রতিবাদী জার্মান নাট্যকার ‘পিসকাটর’ তাই নাট্য ঐতিহাসিকদের বিবেচ্য হয়ে আছেন, নাট্যশিল্পীদের অনুকরণীয় হননি। 

ব্রেখটের কথায়, প্রতিকী বা প্রাকৃতিক কোন ভঙ্গীই যথার্থ নয়, যদি না দর্শককে তা আকৃষ্ট করে। অনেকের তো এইসব জটিল মঞ্চপ্রকরণ প্রয়োগে ঘোরতর আপত্তি। রবীন্দ্রনাথের উক্তি- আধুনিক য়্যুরোপীয় নাট্যমঞ্চের প্রসাধনে দৃশ্যপট একটা উপদ্রব রূপে প্রবেশ করেছে। ওটা ছেলেমানুষী, লোকের চোখ ভোলাবার চেষ্টা। সাহিত্য ও নাট্যকলার মাঝখানে ওটা গায়ের জোরে প্রক্ষিপ্ত। কালিদাশ মেঘদূত লিখে গেছেন, ওই কাব্যটি ছন্দোময় বাক্যের চিত্রশালা। রেখা-চিত্রকর তুলি হাতে এর আশেপাশে রেখাঙ্ক ব্যাখ্যা যদি চালনা করে, তাহলে কবির প্রতিও যেমন অবিচার পাঠকের প্রতিও তেমনি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। নিজের কবিত্বই কবির পক্ষে যথেষ্ট; বাইরের সাহায্য তার পক্ষে সাহায্যই নয়, সে ব্যাঘাত এবং অনেক স্থলে স্পর্ধা। 

রক্তকরবী আদৌ মঞ্চায়নের পরিকল্পনা নিয়ে লেখা হয়নি। অসাধারণ সাহিত্য-মূল্যসম্পন্ন এ নাটকটি অসম্ভব মঞ্চগুণসম্পন্ন। একবার শান্তি নিকেতনে এ নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে শুনে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- তোমরা নাকি এ নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছ? এটাতো আমি পড়ার জন্য লিখেছি। এটা কি অভিনয় হবে ? 

আমরা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সে সময় থেকে অনেক এগিয়ে এসেছি। রক্তকরবীর মুগ্ধ প্রযোজনা দেখেছি। রবীন্দ্রনাথের কল্পনার নন্দিনী হয়ে তৃপ্তি মিত্র মঞ্চ কাঁপিয়ে গেছেন। 
নাটকে জীবনের বিশাল ক্যানভাসকে স্পর্শ করার স্পর্ধা থাকতে হবে। মঞ্চপ্রকরণের নব নব অভিনব কৌশল আর মেধার ঝিলিক চমকে দেবে সবাইকে। নাট্যকারের ভূমিকা খাটো না করেই মঞ্চকলার পদ্ধতিগত ও যুক্তিগ্রাহ্য উৎকর্ষ আগামীকালের সূর্যোদয়ের মতই অবশ্যম্ভাবী বাস্তব। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে নাটকে আসছে গতি, তবে শিল্প হিসাবে বাড়ছে নাটকের আকর্ষণ। মঞ্চের সীমাবদ্ধতা দূর হয়ে যাচ্ছে দ্রæত। নাট্যাভিনয়ের সকল উপকরণের মধ্যে ‘নাটক’ই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ উপকরণ, বরং তারও বেশি- এক টুকরো জীবন। নাট্যাভিনয় যৌথ শিল্প, নাট্যকার এই প্রয়াসের সকল সহযোগীর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তি। আগে নাটক লেখা হয়, তারপর সে নাটক অভিনয়ের জন্য নাট্যমঞ্চের দরকার হয়, মঞ্চ সাজানোর প্রয়োজন পড়ে।

এ প্রশ্ন আজ অবান্তর- কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? 

নাট্যাভিনয় সমাপ্ত হলে সব কর্মী ঘরে ফিরে যান, মঞ্চের সমস্ত উপকরণ খুলে ফেলা হয়, মেকআপ সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে ফেলা হয়। কিন্তু নাট্যকার তারপরেও থেকে যান তার নাটক নিয়ে, তার স্পট লাইটটি কালের অন্ধকারে ফোকাস করেন তিনি- আরো অনেক দূরের মিছিলে যোগ দেন- অনাগত ভবিষ্যতে। তিনি থাকেন বৃহত্তর সাহিত্যের অনুগামী হিসাবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)