সাদা মনের মানুষ - মাহবুবুল মাওলা রিপন

OHS
By - Imran Ali Shagor
0


নাম মানুষকে বড় করে না।
কর্মই মানুষকে বড় করে। সমাজে এমন কিছু লোক থাকে যারা আপন গতিতে স্বমহিমায় পরিচিত হয়, নিজের সৎ কর্মের মাধ্যমে। এদের কোন ভালো বা সৎ কর্মের প্রচার কেউ করে না। অন্যদের মত লোক দেখানো কিছু কাজ করে ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয় না।

মূলত : এরা ভালো মানুষ। এরাই সাদা মনের মানুষ। মুন্সী চাচা সেই সাদা মনের একজন মানুষ। 

হায়দার আলীর আলীশান অফিস। মুন্সী চাচা সেই অফিসের একজন পিয়ন। অফিসে আরো দুইজন পিয়নসহ মোট ৩ জন পিয়ন কাজ করছে। সবার চেয়ে মুন্সী চাচা বয়সে অনেক বড়। বাকি দুই পিয়ন মুন্সী চাচার ছেলে সমতুল্য। মুন্সী চাচার বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। ৬ মাস পরে চাকুরি থেকে অবসরে যাবেন। দিন যত যাচ্ছে, মুন্সী চাচা ধীরে ধীরে চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে নিজ বাড়িতে চলে যাওয়ার চিন্তা করছে। 
মুন্সী চাচার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানায়। প্রায় ১ যুগ ধরে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে আসছে। দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে তাদের সুন্দর সংসার। স্ত্রী মর্জিনার চাহিদাও খুব বেশি না। কোন রকম ডাল ভাত হলে চলে। চাকুরির সুবাদে পদ্মা নদীর ওপাড়ে শরিয়তপুর মাদারীপুর সর্বশেষ ফরিদপুরে আসছে। 
হালকা পাতলা গড়নের মুন্সী চাচা ছিল ব্যবহারে অসাময়িক। অসাধারণ বুদ্ধি সম্পন্ন। এই রকম বয়স্ক মানুষটি ছিল অফিসে সকলের কাছে খুবই প্রিয়। সর্বদা পায়জামা-পাঞ্জাবী পড়ে মুন্সী চাচা অফিসে আসত। মুখের দাঁড়িও তাকে দারুণ মানাতো। মুন্সী চাচাকে মুরব্বী হিসেবে সম্মান করতে কোন আপত্তি ছিল না। তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের সম্মান নিজে ধরে রাখতে চেষ্টা করতেন। দায়িত্ব পিয়ন, আবার বয়সে বড় দুইটির কোনটা তাকে হীনমন্যতায় ফেলে দিতে পারতো না। 
শহরতলীতে মুন্সী চাচা দুই কক্ষের একটি বাসা নিয়ে বসবাস করতেন। প্রতিদিন সকাল ৮টায় অফিসে গিয়ে সন্ধ্যা ৬টা অথবা রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করতেন। অল্প বেতনে শহরে পরিবার নিয়ে বসবাস করা খুবই কঠিন। তাই মুন্সী চাচা বাড়তি আয়ের জন্য পাশাপাশি অফিসে আসা-যাওয়ার পথে চা ও কাগজের ঠোঙ্গা তৈরী করে বিক্রি করতেন। ঘরে তৈরী কাগজের ঠোঙ্গা বানিয়ে শহরের বিভিন্ন দোকানে পৌঁছে দিতেন। 
মুন্সী চাচা ফুটপাতে চা-বিক্রি করতেন অফিসে আসা যাওয়ার পথে। সকাল ৯টার আগে অফিসে পৌঁছাতেন। বাসা থেকে সকাল ৭টার আগে বের হয়ে হাতে একটা বড় ফ্ল্যাক্স রং চা ভর্তি করে নিতেন। চায়ের সাথে ছিল প্লাষ্টিকের অন্য কৌটায় বিস্কুট। এক কাপ চা ৩ টাকা আর ১টি বিস্কুট ২টাকা সহ মোট ৫ টাকা জনপ্রতি বিক্রি হতো। ফুটপাতের রিকসা ড্রাইভার, দিন মজুর ও ভাসমান মানুষ ছিল তার কাস্টমার। চা বিক্রী করতে করতে ৯ টার আগে অফিসে পৌঁছত। আবার ৫টার পর অফিস শেষ করে চা বিক্রি করতে করতে রাত ৮টায় বাসায় ফিরত। প্রতিদিন এই রুটিনে তাকে চলতে হত। তবে অফিস বন্ধে দিনব্যাপী চা বিক্রি করতেন। সেই দিনের ইনকাম হত প্রচুর। 
মুন্সী চাচার ফরিদপুর অফিসে আজ নতুন বস্ যোগদান করবে। তাই একটু কষ্টের মাঝেও আনন্দের সুবাতাস। অফিসে গত ২দিন থেকে জমজমাট আয়োজন চলছে। সকাল ১০টায় নতুন স্যার যোগদান করবেন। সবাই অপেক্ষা করছে নতুন স্যারের জন্য। ফুলের মালা হাতে কেউ, আবার কেউ লাল নীল পতাকা নিয়ে। স্যার গতকাল এসে হোটেলে অবস্থান করছেন। বড় স্যারের ব্যাপারে আগ থেকে মাঠে কথা আছে, তিনি খুবই নীতিবান মানুষ। নীতির কাছে কোন আপস করেন না। তেল মারার এ যুগে তিনি নাকি আলাদা। তাই মুন্সী চাচার মনে বড়ই আনন্দ। বড় স্যারের মাধ্যমে হয়ত তার ভাগ্যের কপাল খুলবে। সব স্যারেরা শুধু আশার ফুলঝুঁরি ছেড়েছেন, কাজের কাজ কিছু করেননি। নতুন স্যার নাকি অসহায়ের, নির্যাতিত ও বঞ্চিত কর্মকর্তা কর্মচারীর জন্য কথা বলেন। মুন্সী চাচা নতুন কিছু পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে আছেন। 

ঘড়ির কাঁটা ১০টা। নতুন স্যার পৌঁছে গেছেন। সবাই লাল গোলাপ শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। স্যার হাত নেড়ে চেয়ারে বসে সবাইকে ধন্যবাদ দিলেন। স্যারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে অনেক দাবী আদায়ের কথা হল। এবার স্যারের বক্তব্য শুরু। প্রতিশব্দ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হল শ্রোতার মনে। কাদা মাটির মত মনে গেঁথে গেল সব কথা। দোয়া চাইলেন ভালো কাজ করার জন্য। সকলে সভা শেষে হাত মেলাচ্ছে, কথা বলছে। মুন্সী চাচা এক পাশে ফ্যাল ফ্যাল করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ স্যারের চোখ পড়ল মুন্সী চাচার উপর। আঙ্গুল ইশারায় ডাকলেন। 
স্যার: নাম কি বলে হ্যান্ডশেক করলেন 
মুন্সী: নুরুল ইসলাম মুন্সী
স্যার: কি করেন? 
মুন্সী: স্যার অফিস পিয়ন
স্যার: পিয়ন মুন্সীর দিকে আগাগোড়া তাকালেন। আহারে এ বয়স্ক মানুষটি এখন ঘরে বসে খাওয়ার কথা ছিল। সে অফিস পিয়ন। ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর আবার প্রশ্ন করলেন। থাকেন কোথায়?
মুন্সী: নতুন বাসস্ট্যান্ড। 
স্যার: ছেলে মেয়ে কি?
মুন্সী: দুই ছেলে। 
স্যার: ভালো থাকেন। 
মুন্সী: দোয়া করবেন স্যার। 
নতুন স্যার সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করলেন। এক সাথে খাওয়া দাওয়া শেষ করে তারপর কবি জসিমউদ্দীনের বাড়ি ঘুরতে গেলেন। 
আজ সকাল সন্ধ্যা মুন্সী চাচার চা বিক্রি হয় নাই। অফিস শেষে সোজা বাসায়। তাছাড়া নতুন স্যার অফিসের পিয়ন আবার রাস্তায় রাস্তায় চা বিক্রি করে এটা কেমন কথা? কি মনে করে? আদৌ চা বিক্রি করতে পারবে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন মুন্সী চাচার মনে। বাসায় গিয়ে নতুন স্যারের খুব প্রশংসা। বউকে বলে আমার সাথে স্যার হাত মিলিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে। অতীতে কোন স্যার এরকম আন্তরিকতা দেখায়নি। স্যারের জন্য সবাইকে দোয়া করতে বলে। 

নতুন স্যারের নাম হায়দার আলী। অফিসে যোগদান করার এক সপ্তাহ অতিক্রম হল। অফিসের সবাই স্যারের উপর খুব খুশি। তিনি প্রথম দিন বক্তৃতায় বলেন, আমাকে তোমরা বস বা বড় স্যার না ভেবে তোমাদের একজন খাদেম মনে করবে। সব ধরনের বিষয় আমার সাথে শেয়ার করবে। আমি তোমাদের সুখ-দুঃখের সাথী হতে চাই। আমাকে ভয় করবে না-ভালোবাসবে। মুন্সী চাচা তার এই কথাগুলো বাসায় বলেছে। মুন্সী চাচার স্ত্রীও এ কথা শুনে স্যারের জন্য নামাজে হাত তুলে দোয়া করে। হায়দার আলী অফিসের সকলের সাথে বিগত দিনে ব্যক্তিগত পরিচয় করে খোঁজ খবর নিয়েছে। আজ বিকেলে মুন্সী চাচার সাথে হায়দার আলীর কন্ট্রাক আছে। মুন্সী চাচা তার সমস্যাটা হায়দার স্যারকে বলবে। বিকেলে স্যারের চেম্বারে মুন্সী চাচার ডাক পড়ল। দুই জন অনেকক্ষণ কথা বলার পর মুন্সী চাচা সাহস করে চা, ঠোঙ্গা বিক্রি করে বাড়তি আয়ে সংসার চালানোর কথা বলেন। হায়দার স্যার বিষয়টি শুনে খুবই খুশি হলেন এবং সাহসী পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানালেন। ৫টার পর অফিসের সময় শেষ হলে সাথে সাথে চলে গিয়ে চা বিক্রিতে উৎসাহ দিলেন। মুন্সী চাচার মন ভরে গেল। সব পিয়নদের ৫টার পর ইচ্ছা হউক আর অনিচ্ছা হউক ৭টা - ৮টা পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয়। কিছু কিছু বস আছেন, তাদের অফিসে গল্প গুজবে বাড়তি সময় ব্যয় হয়। নিজেরা মজা পেলেও পিয়ন নামের কর্মচারীদের দিকে তাদের নজর থাকে না। অথচ ভারতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞানী আব্দুল কালাম বলেছেন, অফিস সময় শেষ হওয়ার পর যারা অফিসে বসে বসে আড্ডা দেয়, তারা অফিসের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তারা অফিসার নয়। তার দৃষ্টিতে অফিস টাইমের পরে অফিসে থাকলে নানান ধরনের কুকর্ম সৃষ্টি হয়। তাই যথা সময়ে অফিস শেষ করা উচিত। মুন্সী চাচা হায়দার স্যারের কথায় খুশি হলেন। মনে মনে স্যারের জন্য দোয়া করলেন। 
মুন্সী চাচার দুই ছেলে। বড় ছেলে আদিল বিদেশ থাকে। ছোট ছেলে নাদিম একটা মুরগীর ফার্মে কাজ করে। আদিল বিদেশ থাকলেও টাকা পয়সা দিতে পারে না। পরে জানা যায় আদিল তার বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দ গ্রামের এক মেয়ের সাথে বিদেশ থেকে মোবাইলে প্রেম করে। বিদেশ থেকে তার মনোরঞ্জনের জন্য টাকা পয়সা পাঠায়। চাকুরির বেতনও একেবারে কম। তারপর আবার প্রেম। তাই বাড়িতে মা বাবার জন্য কিছু পাঠাতে পারে না। ঘটনাক্রমে আবার আদিলের চাকুরি চলে যায়। এখন তার বিদেশ থেকে বাড়ি আসারও পয়সা নেই। মুন্সী চাচা অনেক কষ্ট করে টাকা পাঠালে সে দেশে ফিরে আসে। দেশে এসে গাড়ি ড্রাইভ শুরু করে। সংসারেও বেশ সহযোগিতা করে। মাঝ পথে আবার ছন্দ পতন। সংসারে টাকা পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেয়। টাকা কি করে কোন জবাব নেই। বেশ এলোমেলো ভাবে আবার সংসার চলতে থাকে। 
আদিল বিদেশ থেকে আসার পর মুন্সী চাচার সংসারে আবার স্বচ্ছলতা আসে। মাঝপথে আবার টানাপোড়ন শুরু হয়। ছোট ছেলে নাদিম খুবই সংসারী মনোভাব। নিজে যত টুকুন বেতন পায় এক মাসের জন্য মা বাবার ঔষধ ক্রয় করে দেয়। আদিল মা বাবার সাথে সপ্তাহে ২/৩ দিন থাকে। বাকি সময় কুমিল্লায় চাচা-মামা-খালার বাসায় বেড়াতে যায় প্রতি সপ্তাহে। এটা তার রুটিনে পরিণত। এতে মুন্সী চাচাকে একটা বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। সংসারে একটি ছেলে মেয়ে এলোমেলো হলে গোটা পরিবার বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। মুন্সী চাচার বর্তমান অবস্থাও এখন সেই রকম। মুন্সী চাচার সুখের সংসারে এখন দুঃখের ঢেউ। দিন যায়-মাস যায় আদিলের পরিবর্তন নেই। গাড়ী চালানো অনিয়ম। তাই চাকুরি নেই। বাসায় আর কুমিল্লা তার অবস্থান। বকাঝকা চলছে অবিরাম। কোন ঔষধে কাজ হচ্ছে না। ইতোমধ্যে খবর আসল আদিল কুমিল্লায় বিয়ে করেছে। মেয়ে কলেজে পড়ে। বিদেশ থেকে মোবাইলে সে মেয়ের সাথে তার প্রেম ছিল। আদিলের পড়ালেখা স্বাক্ষর জ্ঞান পর্যন্ত। বিয়ে করেছে কলেজে অনার্স পড়া মেয়ে। তার জন্য সে কুমিল্লা যায়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মুন্সী চাচা ও পরিবারের সবাই মর্মাহত। মুন্সী চাচা এক পায়ে খাঁড়া। এ বাসায় তার বউয়ের স্থান হবে না। স্ত্রীর কান্না রাত দিন। একদিকে স্বামী অন্য দিকে ছেলে। অনেকটা গানের কলির মত। ‘আমি কূলেতে পাড়ি দেব, কোনটা আমার কূল ।’ মনে চাপা উত্তেজনা নিয়ে চলছে মুন্সী চাচার জীবন। 
মুন্সী চাচা অফিসে আসার আগে পরে নিয়মিত চা বিক্রি করে। কাগজের ঠোঙ্গা তৈরী করে দোকানে দোকানে দিয়ে আসে। মাস শেষে টাকা নেয়। অফিসে আগের মত হাসিখুশি নেই। মনমরা মনমরা ভাব। হয়দার আলী স্যার তাকে কেন মন খারাপ জানতে চায়। ইনিয়ে বিনিয়ে মূল ঘটনা না বলে মুন্সী চাচা পাশ কেটে যায়। ছেলের বিষয় স্যারকে কিভাবে বলি। অফিসে অন্যান্য লোকজন বিষয়টা জানে। ছেলের কর্মকাÐের সকল ভালো-মন্দ অভিভাবকের উপর বর্তায়। মুন্সী চাচা বিষয়টি নিয়ে খুবই লজ্জিত। স্যার যদি কোন রকম জানে তার উপর ধারণা পরিবর্তন করতে পারে। আল্লাহ তুমি আমার ইজ্জত রক্ষা কর। আমাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দাও। বিষয়টি নিয়ে মুন্সী চাচা দিন দিন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। মুন্সী চাচা অফিস পিয়ন হলেও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। পিয়নের অনেক রকমের চরিত্র থাকলেও মুন্সী চাচা একেবারে সাদামাটা। লোভহীন, অল্পভাষী, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। দীর্ঘদিন অফিসে চাকুরি করলেও তার ব্যাপারে কেউ কখনো অনিয়মের অভিযোগ তুলতে পারেনি। নিয়মিত যথা সময়ে অফিসে আসা-যাওয়াতেও কোন ঘাটতি নেই। অন্য কেউ সমস্যায় পড়লে নিজের পকেট থেকে পয়সা খরচ করে উপকার করতে চেষ্টা করে। চাকুরি ছোট হলেও মন অনেক বড়। অফিসে দুপুর বেলা সবাই বাড়ি থেকে খাবার এনে এক সাথে খায়। সাথে মুন্সী চাচাও অন্যান্য স্যারদের সাথে খাবার খায়। কারো কোন ভাত তরকারীর সমস্যা ও ঘাটতি হলে মুন্সী চাচা সবার আগে এগিয়ে যায়। অফিসের জ্যোতি ম্যাডাম, সুরভি ম্যাডাম, কালাম স্যার ও আতিক স্যার সকলে মুন্সী চাচার এই আচরণে প্রশংসা করে।

হায়দার স্যার প্রায় ১ বছর ফরিদপুরের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও মুন্সী চাচার কাজের উপর সন্তষ্ট। মুন্সী চাচাকে দিয়ে কোন অফিসার বেশি কাজ করালে হায়দার স্যার ক্ষেপে যান। বাবার বয়সি মানুষ কেন আপনারা তাকে কষ্ট দিচ্ছেন। আপনাদের মায়া দয়া নেই ইত্যাদি বলে বকাবকি করেন। অফিসে হায়দার স্যার থাকলে মুন্সী চাচার সাহস থাকে। কেউ তাকে উল্টা পাল্টা অর্ডার করতে পারে না। বারবার ৪ তলা থেকে নাস্তার জন্য নীচে পাঠাতে পারে না। মিনিটে মিনিটে কলিংবেল দেবে না। স্যার থাকলে এই কাজগুলি কম হয়। মুন্সী চাচা শান্তি পায়। হায়দার স্যার ফরিদপুর থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ জেলায় মনিটরিং করেন। মাসে প্রতিটি জেলায় স্যারের সফর করতে হয়। কোম্পানীর ব্যবসা ও মাঠ পর্যায়ে সংগঠন সৃষ্টিতে হায়দার স্যারের জুড়ি নেই। তাই কোম্পানী সব সময় হায়দার স্যারকে দুর্বল এলাকায় প্রেরণ করে সবল করে তোলার জন্য। ফরিদপুর আসার পিছনেও এ একই ঘটনা। স্যার সফরে বের হলে ৫/৭ দিন পর অফিসে আসেন। এ সময় মুন্সী চাচার কষ্ট হয়। স্যার না থাকলে কাজ ছাড়াও তাকে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। হায়দার স্যার ১ সপ্তাহ পরে সফর শেষে আজ বিকালে অফিসে উঠে। সবাই না জানা মত করে স্যারের হঠাৎ অফিসে উঠা অনেকের মাঝে আতংক ছড়ায়। 
হায়দার স্যার চেম্বারে জরুরী সকল কর্মকর্তাকে তলব করেন। ব্যবসা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় সার্কুলার নিয়ে ব্রিফিং দেন। মুন্সী চাচার প্রতি স্যারের চোখ পড়ে। আজ তাকে খুবই বিষণœ লাগছে। স্যার ব্যাপার কি জানতে চান। মুন্সী চাচা কখনো কারো ব্যাপারে কোন স্যারকে অভিযোগ করেননি। আজ যেন না বললে নয়। স্যারের অনুপস্থিতিতে আজ সারাদিন ৪টি কলিংবেল বিরতিহীন বাজাচ্ছে। আর মুন্সী চাচার দৌড়াদৌড়িতে জীবন শেষ। স্যারকে আজ কলিংবেলের অভিযোগ বলে সবাইর সামনে মুন্সী চাচাও কেঁদে ফেলে। স্যারও উপস্থিত কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে মর্মাহত। মুন্সী চাচা বলে ফেলে এরকম হলে স্যার আমি মারা যাব। আমাকে একটু বাঁচান। না হয় আমার ৪ তলা থেকে উপরে নীচে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে মরতে হবে। হায়দার স্যার নিজেই যেন অপরাধী। কোন কথা না বলে চুপচাপ। তারপর ক্ষেপে গিয়ে বললেন, কাল থেকে সমস্ত কলিংবেলের কানেকশন ছিঁড়ে দেয়া হবে। প্রত্যেকে চেয়ার থেকে উঠে নিজের কাজ নিজে করবে। আপনি কান্না থামান। এই অফিসে আর কলিংবেল বাজবে না। সবাইকে স্যার বকাবকি করলেন। উপস্থিত সবাই বিষয়টির জন্য স্যারের কাছে ও মুন্সী চাচার কাছে মাফ চাইলেন। 
বিশ্বের উন্নত দেশ গুলোতে অফিসে কোন পিয়নের ব্যবস্থা নেই। সবাই কর্মকর্তা, সবাই পিয়ন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে যারযার কাজ তাকে করতে হয়। অফিসে মেহমান আসলে তাকে চা কফির দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলে ‘টেক ইউর কপি’ মেহমানকে নিজেই চা-কপি তৈরি করে খেতে হয়। শুধু আমাদের দেশে এক অফিসারের ৩/৪ জন পিয়ন। মশা মারতে কামান লাগান। ধরে আনতে বললে বেঁধে নিয়ে আসেন। থানার চেয়ে চৌকিদার গরম। পিয়ন নামের লোকদেরকে মানুষ মনে করা হয় না। গাঁধার মত অফিসে কাজ করায়। অফিস শেষে আবার বাসায় কাজে লাগানো হয়। এরা অফিসার নামে কলংক। অফিসার না বলে এদেরকে অবিচার বললে ভুল হবে না। শুধু অফিস পিয়ন কেন, এরা কাজের মেয়ে, চাকর বাকর, দোকান কর্মচারী, গাড়ীর ড্রাইভার, দারোয়ানকে একইভাবে বাড়তি সুবিধার জন্য ব্যবহার ও নির্যাতন করে। এদের লজ্জা-শরম বলতে কিছুই নেই। অফিসার নামে তথাকথিত মুখোশধারী ভদ্র লোকগুলো সমাজ ও জাতির আবর্জনা। সুদ, ঘুষ ও মদ জুয়ায় লিপ্ত খারাপ এক শ্রেণীর লোকেরা এসকল অপকর্ম করে থাকে। এরা মানবতার দুশমন, এদের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মুন্সী চাচার বিষয়টি সারারাত হায়দার আলীকে খুব বেদনা দেয়। ‘কলিংবেলের যন্ত্রণায় স্যার আমি মরে যাব।’ একটা লোক কতটুকুন কষ্ট পেলে এমন সাহসী উচ্চারণ করতে পারে। অফিস থেকে গিয়ে মুন্সী চাচা বাসায় অসুস্থ হয়ে যায়। রাত ৩টায় তাকে ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভোর ৫টায় মুন্সী চাচা মারা যায়। পরিবারের লোকজন বিষয়টি অফিসের কাউকে জানায়নি। সকাল ৮টায় হায়দার স্যারের কাছে সংবাদ আসলে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাহলে কি মুন্সী চাচা কলিংবেলের কষ্ট নিয়ে মারা গেলেন। হায় আল্লাহ তুমি সব কিছুর মালিক। তাকে জান্নাতে স্থান করে দাও। হায়দার স্যার নিজে খবর শুনে কান্না করলেন। তারপর কলিগদের সাথে দ্রæত যোগাযোগ করে খোঁজ খবর নিতে বললেন। 
আজ শুক্রবার অফিস বন্ধ। মুন্সী চাচার খবর ছড়িয়ে পড়ল অনেকের কাছে। খবর আসল জুমার পর জানাজা হবে। তারপর লাশ গ্রামের বাড়ী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যাবে। হায়দার আলী মুন্সী চাচার লাশ নেয়া, গাড়ী সহ খরচের বিষয়টি মাথায় নিয়ে বেশ কয়েক জন কর্মকর্তাকে টাকা সংগ্রহের নির্দেশ দেন। তিনি মুন্সী চাচার জানাজায় যাবেন। দুপুর ১২টায় কয়েক জন অফিসারসহ আগে আগে গিয়ে তদারকি করবেন। ১১ টায় হঠাৎ খবর আসল মুন্সী চাচাকে জানাজা শেষে ফরিদপুর থেকে কুমিল্লা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কাল বিলম্ব না করে হায়দার আলী ২/১ জন সঙ্গীসহ রওনা হলেন। টেলিফোনে যোগাযোগ করে রাজবাড়ির মোড়ে লাশের গাড়ী থামানো হয়। হায়দার স্যার দ্রæত সেখানে পৌঁছেন। লাশের চেহারা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। স্ত্রী ও ছেলেদের হাতে খরচের টাকা তুলে দিয়ে চিরতরে মুন্সী চাচাকে বিদায় দিলেন। 
হায়দার স্যার ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে বাসায় ফিরলেন। জানাজার নামাজও পড়তে পারলেন না। নিজেকে খুবই অপরাধী মনে করেন। জানাজা জুমার পরে হওয়ার কথা ঠিক ছিল। কিন্তু এলাকার লোকেরা জুমার পর জানাজা হলে কুমিল্লা যেতে অনেক রাত হবে, এই ভেবে তড়িঘড়ি করে ছোটখাট জানাজা পড়ে লাশ বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এই সিদ্ধান্ত হায়দার স্যারসহ কাউকে জানানো সম্ভব হয়নি। মাগরিবের আগে কুমিল্লায় মুন্সী চাচার লাশ পৌঁছে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মুন্সী চাচার মৃত্যুর বিষয়টি হায়দার স্যার ফেসবুকে প্রচার করলে সকলে আপসোস করে যোগাযোগ করতে থাকে। অফিস খোলার দিন সারা দেশে তার জন্য দোয়া করা হয়। পরের জুমাবার মুন্সী চাচার ফরিদপুরের বাসার পাশের মসজিদে তার জন্য এলাকাবাসী দোয়ার আয়োজন করে। ছোট ছেলে হায়দার স্যারকে ফোনে জানালে স্যার সেখানে শামিল হয়। দোয়া শেষে মুন্সী চাচার থাকার ঘরটি স্যার পরিদর্শন করেন। পরে ছেলেকে নানান পরামর্শ দেন। মুন্সী চাচা চলে গেলেন পরপারে। কাউকে কোন কষ্ট না দিয়ে শুধু নিজে কষ্ট নিয়ে গেলেন। হায়দার স্যার অফিসের সবাইকে নিয়ে তার পরিবারের জন্য কি করা যায় বৈঠকে বসলেন। বৈঠকে ২ ছেলেকে চাকুরীর ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এক সপ্তাহে মুন্সী চাচার জন্য বেশ কিছু টাকা পয়সা সংগ্রহ হলে কুমিল্লায় তার স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। হায়দার আলী মুন্সী চাচার অফিসের দেনা পাওনার জন্য দ্রæত পদক্ষেপ নেন। অল্প সময়ে সব ব্যবস্থা করেন। 

মুন্সী চাচা চলে যাবেন হয়ত আল্লাহ তাকে মনে করে দিয়েছে। তাই মারা যাওয়ার বেশ কিছু দিন আগে কুমিল্লায় জাঁকজমকভাবে পুত্র বধূকেও বরণ করে বাসায় এনেছেন। যাবতীয় দেনা-পাওনা পরিষ্কার করে স্ত্রীকে সব বুঝিয়ে দিয়েছেন। অফিসের কলিগদের থেকেও আগের দিন মাফ চেয়ে নিয়েছেন। তবে এভাবে এত অল্প সময়ে চলে যাবেন কে জানত? হায়দার আলীর আফসোস এ রকম সাদা মনের মানুষ এ যুগে হয় না। হায়দার আলীর হৃদয়ে কষ্টের দাগ আজো কাটেনি। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)