স্মৃতির ক্যানভাসে ড. কাজী দীন মুহম্মদ - হারুন ইবনে শাহাদাত

OHS
By - Imran Ali Shagor
0

স্মৃতির ক্যানভাসে ড. কাজী দীন মুহম্মদ

হারুন ইবনে শাহাদাত


  পাঠক ও লেখকের পরিচয়ের প্রথম মাধ্যম লেখা। একজন পাঠকের সাথে একজন লেখকের আত্মার বন্ধন তৈরির বিনাসুতার মালা হলো লেখা। জ্ঞানতাপস বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অধ্যাপক ড. কাজী দীন মুহম্মদের সাথে আমার প্রথম পরিচয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সেই কিশোর বয়সে যখন টাঙ্গাইল জেলার অবহেলিত জনপদ গোপালপুরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সুতী ভিএম সরকারি হাই স্কুলে পড়ি। অবশ্য সেই নব্বইয়ের দশকে স্কুলটি সরকারি ছিল না। তখন ছিল পাইলট হাই স্কুল। তৎকালীন সরকারের পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেশের প্রত্যেক থানা পরবর্তীতে উপজেলা পর্যায়ে একটি করে ভালোমানের স্কুল বাছাই করা হয়েছিল পাইলট স্কুল হিসেবে। গোপালপুর উপজেলার সদরে উপস্থিত স্কুলটিও ছিল তারমধ্যে অন্যতম। মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে ড. কাজী দীন মুহম্মদের একটি সমৃদ্ধ প্রবন্ধ ছিল, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর। পাঠ্য বইয়ে থাকলেও প্রবন্ধটি সিলেবাসভুক্ত ছিল না। আমার সিলেবাস ধরে ধরে পড়ার অভ্যাস ছিল না। পরীক্ষার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কণ্ঠস্থ করাও ছিল রীতিমতো বিরক্তিকর। কিন্তু পড়ার অভ্যাস ছিল তীব্র থেকে তীব্রতর। সেই অভ্যাসবশেই পড়েছিলাম সেই প্রবন্ধটি, খুব মজাও পেয়েছিলাম। অনেক অজানা বিষয় জানাই শুধু হয়নি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণও বেড়ে গিয়েছিল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যে আমাদের বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের অতি আদরের  যতেœর ধন তা ড. দীন মুহম্মদ স্যারের নিকট থেকেই প্রথম জানতে পারলাম। প্রত্যেক ভাষার সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে চিনতে হলে তার কালাম পবিত্র কোরআনভাবে বুঝতে সবার আগে নিজের ভাষা শুদ্ধভাবে লিখতে হবে সেই প্রেরণার প্রথম মশাল তিনিই জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন আমার কিশোর অন্তরে।
‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়ে আছে এর ভাষ্য-

অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ।

ভাষায়াং মানবঃ শ্রæত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ’

অর্থাৎ আঠারোটি পুরাণ আর রামের জীবনচরিত দেশীয় ভাষায় শুনলে রৌরব নামক নরকে যেতে হবে।

এ কথা প্রথম ড. কাজী দীন মুহম্মদের প্রবন্ধ পড়েই জানতে পারি। তারপর আরো অধ্যয়ন ও গবেষণার পর জানলাম। শুধু তিনি নন, অনেক নিরপেক্ষ হিন্দু গবেষক স্বীকার করেছেন, এদেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য হারিয়ে যেত মুসলমানরা  বাংলা বিজয় না করলে। যেমন: সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন, আর্যদের পদানত এই ভ‚খÐের তৎকালীন অধিবাসীরা তাদের মুখের ভাষা ভুলে যেতে বাধ্য হতেছিলো। অবস্থা এতটাই কঠিন ছিলো যে, নরকে শাস্তির জন্য বাঙালিদের রৌরবে যাওয়া লাগত না। এ দেশই তাদের জন্য হয়ে উঠেছিল নরক। পাল রাজাদের রাজসভায় আদর পেতেন সংস্কৃতের পÐিত ও কবিরা। এ দেশে প্রধান পÐিত তখন হলায়ূধ। লক্ষণ সেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী ছিলেন পুরোষতম, পশুপতি, ঈষাণ প্রমুখ। তাঁরা বাংলা ভাষাকে করতেন ঘৃণা, এর বিরুদ্ধে দেখাতেন পাÐিত্য। এ দেশে প্রধান কবি তখন ধোয়া, শরণ,  গোবরধন, উমাপতি প্রমুখ। তাঁরা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতেন না। লিখতেন সংস্কৃতে। কবিতার ছত্রে ছত্রে থাকত বাংলার প্রতি বিদ্বেষ ও তাচ্ছিল্য। হিন্দু গণস্তরে এর প্রভাব পড়ে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য ছড়িয়ে পড়ে তৃণমূলে।

এবার মূল আলোচনায় আসি। স্যারের সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করি, ঢাকা আসার পর। সাংবাদিকতা ও সাথে সাথে সাহিত্যচর্চা এবং একটি জাতীয় পত্রিকার ফিচার ও সাহিত্য পাতার সাহিত্য পালন করার কারণেই ড. কাজী দীন মুহম্মদ স্যারের সাথে ঘনিষ্ঠতা দিন দিন বাড়তে থাকে। মাঝে মাঝেই ডাক পড়তো তার কলাবাগানের বাসায়। সহজ সরল শিশুসুলভ হাসি হেসে বরণ করে নিতেন। তারপরও বলতেন, ‘কি খাবেন খিচুরি না হালিম? কলাবাগান এসেছেন কলা ও চা বিস্কুটও আছে।’ অনেক অনুরোধ করেও ‘তুমি’ বলাতে পারিনি। বিশেষ করে জনসন্মুখে তিনি কখনো ‘তুমি’ বলতেন না। তিনি বলতেন, আপনার বয়স কম হলেও পদবিতে প্রবীণ ‘সাহিত্য সম্পাদক’। আমার লেখাও সম্পাদনা করার দায়িত্ব কিন্তু আপনার। তার এমন বিনয়ে অস্বস্তি বোধ করলেও কোন উপায় ছিলো না। সরাসারি নাম ধরে কখনো ডাকতেন না, বলতেন, ‘হারুন সাহেব’। প্রসঙ্গ ক্রমে মনে পড়লো আমার আরেকজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কথা, তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমদ। যত বার তাঁর কাছে গিয়েছি, কখনো সরাসরি নাম ধরে ডাকতে শুনিনি, তিনি অবশ্য তুমি বলেই সম্বোধন করতেন, কিন্তু নামের সামনে ‘বাবা’ নয় তো বাবাজি যোগ করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই দুই মহান শিক্ষককে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। আমীন।

ড. কাজী দীন মুহম্মদ স্যারের কথা লিখতে গিয়ে বারবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি। স্মৃতির ক্যানভাসে অনেক কথাই ভেসে ওঠছে। কোনটা রেখে কোনটা বলবো। তাঁর কর্মময় মহৎ জীবনের আলোচনা করা কোন একটি বিশেষ প্রবন্ধ নিবন্ধ কিংবা লেখায় শেষ করা সম্ভব নয়। আমার স্মৃতির ক্যানভাসের ছবিগুলো যতটুকু পারি মেলে ধরার পর তাঁর জীবনালেখ্যর এক ঝলক তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।

ড. কাজী দীন মুহম্মদ শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পÐিত ছিলেন না, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। বিশেষ করে ইসলামী জীবন দর্শন, ইতিহাস, মানব জাতির উত্থান পতন, বাঙালি মুসলমান ও নি¤œ বর্ণের মানুষদের ওপর বর্ণবাদী আর্য দুঃশাসন সম্পর্কে ছিল আর অগাধ জ্ঞান। তিনি ইন্তেকালের আগে দেশে ১/১১-এর জরুরি সরকার ক্ষমতা দখল করে। এই জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন দেশের ইতিহাসের যে দিক বদল হচ্ছে তার লক্ষণ শুভ নয়। তিনি তার এই অনুভ‚তি ব্যক্ত করতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে দেখা করার ইচ্ছে করলেন। তাঁর আগমনের কথা শুনে মগবাজারে একটি মিলনায়তনে মতবিনিয়ময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে দেশের আরো অনেক বরণ্যে ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। যাদের অনেকেই দুঃশাসনের যাতাকলে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন। সেই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তাঁর মুখে দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তায় কালো মেঘ দেখা গেলো। বক্তব্য দেয়ার সময় মেঘ কেটে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছিলো, তিনি বলছিলেন, ‘এই দুঃসময়, দুশাসন আমাদের কর্মের ফল। আমরা এই জাতির সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের সন্তানরা আমাদের সোনালি ইতিহাস জানে না, তারা এও জানে না আমাদের পূর্বপুরুষরা কত অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে আমাদের জন্য বর্ণবাদী আর্যদের আগ্রাসনমুক্ত এই দেশ অর্জন করেছেন। তাই তারা ভ্রান্তির বেড়াজালে আবারো জড়িয়ে পড়ছে। পথহারা হয়ে বিপথে চলতে শুরু করেছে। আমাদের জ্ঞানের বাতিঘর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মনন গঠনের প্রতীক বাংলা একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন সব জায়গাতেই আজ ফসলের চেয়ে আগাছার চাষ হচ্ছে বেশি। আজ যারা তরুণ তোমাদের এগিয়ে আসতে হবে। আগাছার বদলে ফুল, ফল, ফসলের চাষ করতে হবে। তোমরা সাহস করে এগিয়ে যাও অন্ধকার দূর হবেই। তোমরা যদি হীনবল হও এই দেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে না। আমাদের আগামী দিনের বংশধররা আর আমাদের থাকবে না। তাই ইতিহাসের সত্যিটাকে তুলে ধরতে হবে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবব্ধ থাকতে হবে।’

এই আলোচনা শেষে একদিন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাঁকে বললাম, ‘স্যার, আপনার কি মনে হয় এমন কোন কাজ বাকী আছে যা এখনো করতে পারেননি।’ তিনি স্বভাবসুলভ হাসি হেসে বললেন, আছে, তবে এখন যে বয়স পারবো বলেও মনে হচ্ছে না। জানতে চাইলাম, ‘কি সেই কাজ?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস লেখার খুব ইচ্ছে জাগে মাঝে মাঝে, কিন্তু ..’

আমি বললাম, ‘স্যার শুরু করুন’

তিনি কোন কথা বললেন না। শুধু একটু মুচকি হাসলেন। তিনি হয়তো বুঝে ছিলেন, পৃথিবীতে আর বেশি দিন থাকবেন না। এই অতি অল্প সময়ে এত বড় কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না।’ কিন্তু অবুঝ বালকের মতো আমি অনুরোধ করছি, আমাকে তিনি এই সত্যিটা বলে হতাশ করতে চাননি হয় তো।

তিনি ছিলেন খুব উদার মনের মানুষ। তাঁর সহৃদয় উদারতায় অনেক অসহায় মানুষ আজ বিত্তশালী হয়েছে, ‘স্যারের ভাষায়, ‘এখন আমাকেই গিলে খাওয়ার অবস্থা’। এ কথা বলেই তিনি হাসতেন। তার বাসার আশপাশে তিনি কয়েকজনকে বিনা ভাড়ায় ছোট ছোট দোকানের অনুমতি দিয়েছিলেন। তাদের কয়েকজন এমনি প্রসিদ্ধ হয়েছেন, যে সবাই এক নামে  পরিচিত, তাও শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে। নাম উল্লেখ করলে অপমানবোধ করতে পারেন, তাই উল্লেখ করা হলো না।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ এবং সম্পাদনা প্যানেলের ড. কাজী দীন মুহম্মদ একজন অন্যতম সম্পাদক ছিলেন। এই কাজ করতে তারা সবাই মিলে কত সতর্কতার অবলম্বন করেছেন, সে কথা আলাপচারিতার সময় বলেছেন, ‘কোন বিষয়ে ভিন্ন মত দেখা দিলে, আলোচনার পর সবাই একমত হওয়ার পরই চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন।’ তিনি বাংলা বানান রীতির একটি নিজস্ব ধারা অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। এখন যেভাবে বাংলা একাডেমি বিদেশি শব্দের বানান রীতি থেকে ‘ঈ-কার’ ‘শ’ ইত্যাদি বিদায় করেছে, তিনি এই মতের পক্ষে ছিলেন না। বিশেষ করে আরবী শব্দের উচ্চারণ ঠিক রাখতে তিনি প্রয়োজনে ‘ঈ-কার’ ‘শ’ ইত্যাদি ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। ড. কাজী দীন মুহম্মদ ১৯৬৭ সালের ১৪ ফেব্রæয়ারি থেকে নিয়ে ১৯৬৯ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময় সভাপতি ও মহাপরিচালকের পদ ছিল না। পরিচালকই ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান।  

ড. কাজী দীন মুহম্মদের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ ফেব্রæয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার রূপসী গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কাজী আলীম উদ্দিন আহমদ এবং দাদার নাম কাজী গোলাম হোসেন। রূপসী বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে তিনি বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৫ সালে তিনি হুগলী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই.এ. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। এর পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বি.এ. অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান এবং ১৯৪৯ সালে বাংলা বিভাগ থেকে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন।

উল্লেখ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান ছিলেন একজন ইংরেজ  তিনি ড. কাজী দীন মুহম্মদকে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য এবং অর্থনীতি বিভাগের প্রধান তাঁকে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তাঁর মতো মেধাবী ছাত্রদের জন্য ‘বাংলা ভাষা ও সহিত্য’ নয়। ইংরেজি অথবা অর্থনীতির মতো বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিলে তিনি ভালো করবেন। এতে তাঁর ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে। কিন্তু তিনি জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অনুপ্রেরণায় বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে ‘দি ফোনোলজি অব দি ভার্বাল পিস ইন কলোকুয়াল বেঙ্গলি’ অভিসন্দর্ভ রচনা করে ভাষাতত্তে¡ পি-এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণা তত্ত¡াবধায়ক ছিলেন প্রফেসর মিসেস ই.এম. হুইটলি। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্তে¡ ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের পর তিনি দ্বিতীয় বাঙালি, যিনি পি-এইচ.ডি. লাভ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষা ছুটি নিয়ে তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য লন্ডন যাত্রা করেন এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে পি-এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালের জুন মাসে লন্ডন থেকে ফিরে তিনি বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে কর্মরত থাকেন। ১৯৬২ সালে তিনি রিডার পদে উন্নীত হন এবং জানুয়ারি ১৯৬৪ পর্যন্ত ঐ পদে কর্মরত থাকেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে উন্নয়ন অফিসার পদে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় রিডার পদে বাংলা বিভাগে ফিরে আসেন। এরপর ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমীর পরিচালক নিযুক্ত হন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত ঐ পদে কর্মরত থাকেন। এরপর বাংলা বিভাগে ফিরে এসে রিডার পদে তিনি ১৯৭৮ পর্যন্ত কাজ করে ১ অক্টোবর ১৯৭৮ তারিখে বাংলা বিভাগে তিনি প্রফেসর নিযুক্ত হন। ১২.১২.১৯৭৮ তারিখে তিনি বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং ১১.১২.১৯৮১ পর্যন্ত ঐ দায়িত্ব পালন করেন। প্রফেসর হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন ৩০.৬.১৯৮৭ তারিখে। ১.৭.১৯৮৭ তারিখে তিনি প্রফেসর পদে পুনর্নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পাঁচ বছর পুনর্নিয়োগের পর ১.৭.১৯৯২ থেকে তিনি বিভাগে সংখ্যাতিরিক্ত প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেষবারের মতো অবসর নেন। ঐ বছরই অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে তিনি ঢাকায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদের বহু গ্রন্থের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা কমপক্ষে ২৫টি- (১) সাহিত্য সম্ভার, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা; (২) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খÐ, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা ১৯৬৮; (৩) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ২য় খÐ, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা ১৯৬৮; (৪) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খÐ, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা ১৯৬৮; (৫) মানব মর্যাদা, সিরাজউদ্দিন হোসেন সহযোগে সম্পাদনা, ফ্রাঙ্কলিন পাবলিশার্স ঢাকা ১৯৬৮; (৬) সাহিত্য শিল্প, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা ১৯৬৮; (৭) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, চতুর্থ খÐ, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা ১৯৬৯; (৮) মানব জীবন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮০; (৯) সূফীবাদের গোড়ার কথা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮০; (১০) জীবন সৌন্দর্য, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮১; (১১) সেকালের সাহিত্য, ঢাকা ১৯৬৯; (১২) সংস্কৃতি ও আদর্শ, ঢাকা ১৯৭৩; (১৩) ভাষাতত্ত¡, ঢাকা ১৯৭১; (১৪) দি ভার্বাল স্ট্রাকচার ইন কলোকুয়াল বেঙ্গলি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৫; (১৫) বর্ণমালা, ঢাকা, ১৯৭৪; (১৬) লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও প্রবাদ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৬৮; (১৭) মানব মর্যাদা, ঢাকা, ১৯৫৮; (১৮) সূফীবাদ ও আমাদের সমাজ, ঢাকা, ১৯৬৯; (১৯) প্রতিবর্ণায়ন নির্দেশিকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮২; (২০) প্রভাত (কবিতা), ঢাকা, ১৯৭৫; (২১) সুখের লাগিয়া, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, ঢাকা ১৯৮৯; (২২) বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব, ঢাকা ১৯৯০; (২৩) আমি তো দিয়েছি তোমাকে কাউসার, হযরত মুহম্মদ (স)-এর জীবনের নানা দিক, ঢাকা, ১৯৯১; (২৪) নাস্তিকতা ও আস্তিকতা, ঢাকা, ১৯৯১; (২৫) একালের সাহিত্য, ঢাকা, ১৯৬৯। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ তালিকা থেকে তাঁর সাহিত্য চর্চার ও গবেষণাকর্মের পরিধি সম্পর্কে ধারণা করা যাবে।

তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণা পরিষদের সদস্য হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি বাংলা একাডেমীর নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ডের পাঠ্যক্রম কমিটির সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও তৎকালীন দেশের সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লার সদস্য ছিলেন। জ্ঞানী ও পÐিত ড. কাজী দীন মুহম্মদ পুরস্কার ও সম্মাননা হিসেবে ১. বাংলাদেশ দায়েমী কমপ্লেক্স পুরস্কার [১৯৮৯], ২. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার [১৯৯০], ৩. উরংঃরহমঁরংযবফ ষবধফবৎংযরঢ় ধধিৎফ, অসবৎরপধহ নরড়মৎধঢ়যরপধষ রহংঃরঃঁঃব ঢ়ঁনষরংযবফ রহ ৭ঃয বফরঃরড়হ ড়ভ নরড়মৎধঢ়যরপধষ বহপুপষড়ঢ়বফরধ. ৪. চধহফরঃ রং ধিৎ পযধহফৎধ ারফুধংধমৎ মড়ষফ ঢ়ষধয়ঁব [২০০২] ঃযব অংরধঃরপ ংড়পরবঃু, ঈধষপঁঃঃধ, ওহফরধ. ৫. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রকল্প স্বর্ণপদক [২০০৩], ৬. কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার [২০০৪], ৭. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম ব্যাচের পক্ষ থেকে গুণীজন সম্মাননা লাভ করেন। নিরলস সাহিত্যকর্মী হিসেবে সারাজীবন সাধনা-নিমগ্ন এই জ্ঞান তাপস শুধু সাহিত্য নয়, একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে সুপরিচিত ও সমাদৃত।

রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১১ সালের ২৮ অক্টোবর এই মনীষী ইন্তেকাল করেন। পরদিন ২৯ অক্টোবর সোনারগাওয়ের রূপসীতে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক।

 


 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)