পারফরম্যান্স : আগামীর নাট্য পরিবেশনা
তাহসিনুর রহমান তালুকদার
থিয়েটার বা নাট্যের শুরু কিভাবে হয়েছিল তা নিয়ে তর্ক আছে। অনেকের মতে, কৃত্য জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে এর জন্ম, কারো মতে গল্প বলা থেকে, অন্যদের মতে আবার অনুকরণ করা থেকে এর সৃষ্টি। এছাড়াও ঝযধসধহরংস (ওঝার চিকিৎসা) থেকে অথবা নৃত্য থেকে এর শুরু- এ ধরনের মতসহ আরো অনেক মত পাওয়া যায় থিয়েটারের
উৎসস্থল নির্ধারণে। অর্থাৎ, একটি একক উৎসস্থল নাট্যের জন্মের অনুঘটক তা বলা যায় না। যদিও আমাদের আজকের আলোচনা নাট্যের শুরু কিভাবে হয়েছিল তা নিয়ে নয়।
নাট্য বা ঞযবধঃৎব প্রকরণ হিসেবে চবৎভড়ৎসরহম অৎঃং-এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে চবৎভড়ৎসরহম তথা ‘চবৎভড়ৎসধহপব’ কি তা আমরা জানার চেষ্টা করবো। কেননা আমাদের আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে, একটি নতুন ধারণা (অন্তত আমাদের দেশে) বা ঈড়হপবঢ়ঃ হিসেবে চবৎভড়ৎসধহপব (পারফরম্যান্স) কে বোঝা এবং তা প্রচলিত নাট্যের পরিবেশনায় কি পরিবর্তন আনছে বা আনতে পারে তা জানার চেষ্টা করা।
‘চবৎভড়ৎসধহপব’ শব্দটিকে আমরা সাধারণ অর্থে না বুঝে একটি পরিভাষা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করব। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বা কোনো কাজ সফল করার ক্ষেত্রে আমরা এ কথা প্রায়ই বলে থাকি যে পারফরম্যান্সটা ভালো বা খারাপ হয়েছে। কিন্তু পরিভাষা হিসেবে চবৎভড়ৎসধহপব এই অর্থ বুঝায় না। এর অর্থ অনেক বিস্তৃত।
একই সাথে কোনো কিছু করা (উড়রহম) এবং দেখানোকে (ঝযড়রিহম) পারফরম্যান্স বলা হয়। অর্থাৎ কোনো স্বত্ত¡া (ইবরহম- এটি একটি কাগজের পোস্টারও হতে পারে!) যখন কোনো কিছু করেও দেখায় সেটাই হচ্ছে পারফরম্যান্স। বাস্তবিক কিছু উদাহরণ দিয়ে আমরা বিষয়টা বুঝতে পারি।
রাস্তার মোড়ে বা ফুটপাথে এক ওষুধ বিক্রেতা ওষুধ বিক্রি করছে, তার চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে দেখছে। এই ওষুধ বিক্রেতা আসলে কি করছে? সে কথা বলার সাথে সাথে হাত পা নাড়ছে, তার গলার স্বর ওঠা নামা করছে, কখনো স্থির থাকছে, কখনো হাঁটছে, কখনো দর্শকের সামনে খুব কাছে চলে আসছে আবার কখনো কথা বলতে বলতে দূরে চলে যাচ্ছে। এই যে ক্রিয়াগুলো ওষুধ বিক্রেতা করছে, তা করছে দর্শকের সামনে। অর্থাৎ সে কিছু ক্রিয়া একই সাথে করছে এবং তা প্রদর্শন করছে (ংযড়রিহম ধহফ ফড়রহম), অর্থাৎ সে ঢ়বৎভড়ৎস করছে। এটি একটি ‘পারফরম্যান্স’।
আরো ভালোভাবে পারফরম্যান্সের উদাহরণ দেয়া যায় বিশ্বকাপ ফুটবলের উদাহরণ দিয়ে। বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের খেলোয়াড়রা প্রথমে স্টেডিয়ামে এসে মাঠটা দেখে নেন। পরে ড্রেসিং রুমে একসাথে জার্সি পরেন, এক সাথে মাঠে আসেন, এরপর জাতীয় সঙ্গীত গান, ফটোসেশন করেন, এরপর খেলা শুরু করেন।
এতোগুলো কাজ তারা করলেন, সব কিছু হয় তারা একে অপরের সামনে প্রদর্শন করলেন, অথবা টিম হিসেবে দর্শকের সামনে প্রদর্শন করলেন। একই সাথে তারা খেললেন ও পারফরম্যান্স করলেন। বলা বাহুল্য তাদের সব ক্রিয়াই দীর্ঘ অভ্যাস ও অনুশীলনের পুনঃপ্রকাশ। কোনো কিছু করা ও দেখানোই হচ্ছে পারফরম্যান্স। এই তত্ত¡ অনুসারে আমরা প্রতেকে প্রতিটি সময়ে পারফরম্যান্স করছি। আমরা বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত, বিশ্রাম থেকে কাজ করা পর্যন্ত- সব সময়ই পারফরম্যান্সের ভেতরে আছি। আমাদের চারপাশে যে প্রাণহীন বস্তু আছে তাও পারফরম্যান্স করছে। যেমন- বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একটি পোস্টারে কয়েকজন ক্রিকেটারের গম্ভীর, দৃঢ়চিত্ত মুখায়ববের ছবি। এর পাশে একটি ভয়াল দর্শন বাঘের ছবি। এই পোস্টারটি এখন একটি পারফরম্যান্স, কারণ ক্রিকেটার ও বাঘের যুগপৎ আক্রমণাত্মক ছবি কোনো ক্যাপশন না থাকার পরও এ ভাব প্রকাশ করছে যে তারা তাদের খেলা দিয়ে অপর দলকে বধ করবে শিকারের ন্যায়, হবে বিজয়ী; এবং এ বিষয়টি আমরা দেখেই বুঝতে পারছি।
কোনো ক্রিয়া করা ও প্রদর্শন থেকে যে পারফরম্যান্স তৈরি হয় তা মূলত অভ্যাসের ফলে সৃষ্টি হয়। শিশুকে তার মা নিজের দাঁত মেজে শিখিয়ে দেন কি করে দাঁত মাজতে হয়। শিশুটি মাকে দেখে দেখে কাজটি করা শেখে। একইভাবে পোশাক পরা, অফিসে যথার্থ আচরণ করা ইত্যাদি সবই আমরা সফলভাবে পারফর্ম করি অভ্যাস করে করে। অনেকটা নাটকের রিহার্সেলের মতো।
তাই পারফরমান্স হচ্ছে জবঢ়বঃরঃরড়হ। পুনঃপুন: অভ্যাসের ফলে সৃষ্ট আচরণ অথবা ক্রিয়া হচ্ছে পারফরম্যান্স। এই পারফরম্যান্স সংঘটিত হচ্ছে খেলাধুলায়, নৃত্যে, আন্দোলন সংগ্রামে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, শিল্প সৃষ্টি প্রক্রিয়া প্রভৃতিতে।
এখন আসা যাক দ্বিতীয় আলোচনায়। বর্তমান সময়ে নাটক মানে শুধু দুই বা ততোধিক চরিত্রের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা নয়। নাট্যক্রিয়া তৈরির জন্য সহায়ক যে উপকরণসমূহ, যেমন- সঙ্গীত (গঁংরপ), আলো, নৃত্য এগুলো এখন আর সহকারী না থেকে নাট্যের প্রধান বিষয় হয়ে উঠছে। এগুলোই এখন ‘নাট্যক্রিয়া’ তৈরি করছে। পুরো একটি নাট্য কোনো সংলাপ ছাড়াই বা নামমাত্র সংলাপে শুধুমাত্র আলো, সঙ্গীত, নৃত্য ও শারীরিক চলনের ব্যবহার এবং এর সঙ্গে আরো কিছু প্রযুক্তির প্রয়োগ করে তৈরি হচ্ছে। অনেকে বলতে পারেন তাহলে তো এ মূকাভিনয়, না এটা মূকাভিনয় নয়। এটা নাট্য। অবশ্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা কষ্টসাধ্য ।
সেক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব প্রযুক্তির সাথে নিজেদের শরীরকে (ইড়ফু গড়াবসবহঃ) কাজে লাগিয়ে সংলাপবিহীন এক অনন্য পারফরম্যান্স অথবা নাট্য তৈরি করা যায়। নাট্যে সংলাপের গতানুগতিক কাঠামো ভেঙ্গে নাটককে আরেকটি নতুন মাত্রা দেয়া যেতে পারে। সারা বিশ্বে এখন এমন হচ্ছে।
যারা নাট্যচর্চা করেন তারা এটা নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে পারেন। হয়তো এই নতুন চিন্তা নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করবে।

