ইসলামী সমাজ ও সংস্কৃতির আলোচনা প্রসঙ্গে অনেকে নারীর ভূমিকাকে গৌণ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেন। তাদের ধারণা, ইসলামে নারীজাতির মর্যাদা ও অধিকার যথার্থরূপে সংরক্ষিত হয়নি। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অমূলক ধারণা। ইসলাম মহান স্রষ্টা-প্রদত্ত দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা। স্রষ্টার সৃষ্টিতে সকলে সমান। স্রষ্টা কখনও কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন না। এরূপ চিন্তা করাও অসঙ্গত।
ইসলামে নারী-পুরুষে কোন ভেদাভেদ নেই। পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক। নারী ও পুরুষ নিয়েই মানব জাতি। পৃথিবীতে নারী ব্যতীত শুধু পুরুষ অথবা পুরুষ ব্যতীত শুধু নারী জাতির কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। নারী-পুরুষ মিলেই মানবসমাজ। মানুষের সৃষ্টি, মানুষের বংশবিস্তার, মানবজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে পৃথিবীতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমঅংশীদারিত্ব রয়েছে। একজন ব্যতীত অন্যজনের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। মানবসভ্যতা-সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশেও নারী-পুরুষ উভয়ের সমান ও অপরিহার্য ভূমিকা বিদ্যমান। মহান স্রষ্টার অসংখ্য নিদর্শনাবলীর মধ্যে নারী ও পুরুষ অন্যতম প্রধান ও তাৎপর্যময় নিদর্শন। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা রূম, আয়াত : ২১)।
উপরোক্ত আয়াতে মহান ¯্রষ্টা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পুরুষের জীবনে নারী এক মহানিয়ামত। পুরুষের জীবনে শান্তি-স্বস্তি ও পূর্ণতা এনে দেয় নারীর সঙ্গ। অনুরূপভাবে নারীর জীবনেও শান্তি-স্বস্তি ও পূর্ণতা আসে পুরুষের নিবিড় সংস্পর্শে। নারী-পুরুষের পারস্পরিক প্রেম- ভালোবাসা, সহানুভূতি, মমত্ববোধ উভয়ের জীবনে নিয়ে আসে এক অবিমিশ্র শান্তি-স্বস্তি, আনন্দ, নিবিড় সাহচর্য, সম্প্রীতি-সহযোগিতা ও অফুরন্ত প্রাণ-প্রাচুর্য।
নারী ব্যতীত এককভাবে পুরুষের জীবন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ, নিরানন্দ, ব্যর্থ ও অসম্পূর্ণ। মহান স্রষ্টা আদি মানব আদমকে (আ.) সৃষ্টির পর জান্নাতের সীমাহীন সুখ-শান্তি ও প্রাচুর্যের মধ্যে তাঁকে বসবাস করতে দিলেন। কিন্তু জান্নাতের সীমাহীন সুখ-শান্তি ও অফুরন্ত প্রাচুর্যের মধ্যেও তিনি অস্বস্তি বোধ করলেন। মহান ¯্রষ্টা তাঁর মনের অবস্থা উপলব্ধি করে সঙ্গিনী হিসাবে মা হাওয়াকে (আ.) সৃষ্টি করলেন। এ থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, মানবসৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নারী ব্যতীত সম্পূর্ণ অর্থহীন। পারস্পরিক শান্তি-স্বস্তি, মানবজাতির বংশবিস্তার এবং নারী-পুরুষ উভয়ের প্রয়োজনেই উভয়ের সৃষ্টি। মানবসৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখার অপরিহার্য প্রয়োজনে পৃথিবীতে নারী-পুরুষ উভয়ের প্রয়োজন ও গুরুত্ব সমান।
পৃথিবীতে মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির উদ্ভব বিকাশেও নারী ও পুরুষ উভয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে কারও অবদান কম বা বেশী নয়। তবে উভয়ের দৈহিক অবয়ব যেমন ভিন্ন, তেমনি উভয়ের কর্মক্ষেত্রও কিছুটা ভিন্ন। অবশ্য পৃথিবীতে এমন বহু কাজ রয়েছে, যা নারী-পুরুষ উভয়ই করতে সক্ষম। একথাটাকে আবার ঘুরিয়ে বলা যায় এভাবে যে, পুরুষরা যা পারে, মেয়েরাও তা পারে অথবা মেয়েরা যা পারে, পুরুষরাও তা পারে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে সৃষ্টির রহস্য বুঝা দুঃসাধ্য। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সন্তান জন্মদানে নারী ও পুরুষ উভয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা নারীর পক্ষে পালন করা যেমন অসম্ভব, নারীর ভূমিকাও পুরুষের পক্ষে পালন করা তেমনি অসম্ভব। এ কারণেই নারী ও পুরুষ উভয়ের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। কিন্তু একজনের গুরুত্ব অন্যজনের চেয়ে কম বা বেশী নয়। উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দপূর্ণ আচরণ ও অনুরাগসিক্ত পরিমল আনন্দময় পারিবারিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে জীবন ও জগৎ আবহমান কাল থেকে চলছে। মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশেও উভয়ের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূূর্ণ। এজন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন -
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কে সমমানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করে ‘আশরাফুল মখলুকাত’ বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠরূপে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। উভয়ের মর্যাদা, গুরুত্ব ও অধিকার সমান। পার্থক্য শুধু লিঙ্গের ও দৈহিক অবয়বে। কিন্তু মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে এ পার্থক্য কোন বৈষম্য সৃষ্টি করে না। এ পার্থক্য শুধু বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য ও পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টির অপরিহার্য তাগিদে। মহান স্রষ্টার এটা এক অসাধারণ সৃষ্টি-কৌশল। এর প্রতি ইঙ্গিত করেই মহান স্রষ্টা উপরোক্ত আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে, এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
নারীকে শুধু পুরুষের সঙ্গ দেওয়া ও বংশবিস্তারের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়নি। পৃথিবীতে পুরুষের জন্য যেমন নানা ধরনের কর্মায়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে, নারীর জন্যও তা রয়েছে। ইসলামে ইবাদত-বন্দিগি পুরুষের জন্য যেমন নির্ধারিত, নারীর জন্যও তেমনি। ইবাদত-বন্দিগি করে পুরুষ যেরূপ প্রতিফল রয়েছে, নারীর জন্যও অনুরূপ প্রতিফল রয়েছে। এখানে কোন পার্থক্য বা বৈষম্য নেই।
জীবনে ও সমাজে ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য নারীর জন্য ঘর-গৃহ্স্থলির কাজ, পুরুষের জন্য তেমনি ঘরের বাইরের সকল কাজ আঞ্জাম দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। গৃহাভ্যন্তরের কাজ আঞ্জাম দেওয়ার দায়িত্ব সাধারণত নারীর উপর, আর গৃহের বাইরের সকল কাজ আঞ্জাম দেওয়ার দায়িত্ব পুরুষদের উপর ন্যাস্ত রয়েছে। অনেকের ধারণা, বাইরের কাজে ব্যাপৃত না হলে তাকে যথার্থ অর্থে কর্মজীবী বলা যায় না। কিন্তুু যদি সকলেই বাইরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সন্তানপালন, পরিচর্যা, তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা, রান্না-বান্না, গৃহসজ্জা, মেহমান আপ্যায়ন ও গৃহস্থলীর অসংখ্য কাজের আঞ্জাম হবে কীভাবে? অথচ এগুলো ছাড়া জীবন ও সংসার অচল হয়ে পড়বে। সন্তানের দেখাশোনা, পরিচর্যা ও গৃহস্থলির অন্যান্য অসংখ্য কাজ যথাযথরূপে না করলে, সংসার জীবন অচল ও দুঃসহ হয়ে পড়বে। সন্তানরা উচ্ছৃঙ্খল ও বিপদগামী হবে, ঘর-সংসারের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। পুরুষেরা বাইরের কাজ সেরে যখন ঘরে ফেরে তখন নারীরা তাদের সামনে খাবার পরিবেশন করে, পুরুষদের সান্ত¡না দেয়, স্বস্তি দেয়, আনন্দময় সাহচর্য প্রদান করে। এভাবে নারীরা ঘরের সকল কাজ সম্পন্ন করে, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি রাখে, সংসারের সবকিছু সুশৃঙ্খল অবস্থায় রাখার দায়িত্ব পালন করে। ঘরের লোকজনদের দেখাশোনা, সন্তান লালন-পালন ও আত্মীয়-স্বজনদের আদর-আপ্যায়ন ইত্যাদি সকল কাজ নারীরাই সম্পন্ন করে থাকে। অতএব, তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য কম নয়, তাদের গুরুত্বও অসীম।
ঘরের বাইরের কাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, গৃহস্থলীর কাজও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। মূলত পুরুষেরা যত কাজ করে, নারীদের কাজ ভিন্ন ধরনের হলেও তারা পুরুষের চেয়ে অধিক কাজ করে এবং গৃহস্থলীর নানাবিধ কাজে তাদেরকে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে ও কষ্ট করতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। মূলত নারী গৃহভ্যন্তরে এবং পুরুষ গৃহের বাইরে উভয়ে একত্রে মিলেমিশে সংসারের হাল ধরে বলেই জগৎ-সংসার সুচারুরূপে পরিচালিত হয়। মানবজীবনের এটা এক অসাধারণ সৌন্দর্য ও স্থিতিস্থাপনামূলক চিরন্তন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার ব্যত্যয় ঘটলে সমূহ বিপদ। এ বিপদ যে কতটা ভয়াবহ, পাশ্চাত্যের দিকে তাকালে তা সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। অধুনা আমাদের সমাজ, বিশেষত শহুরে একশ্রেণীর আধুনিক প্রগতিবাদীদের জীবনে পাশ্চাত্যের হাওয়া লাগায় পারিবারিক জীবনে নানা সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে ব্যক্তি ও পরিবারে শান্তি-স্বস্তি ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে, সংসারে নানা সমস্যা-সংকট ও অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ এখানে আল-কুরআন থেকে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হলো:
১. আমি মানুষকে তার মা-বাবার সাথে সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে, তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস, ক্রমে সে পূর্ণ শক্তি পায়। (সূরা আহকাফ, আয়াত: ১৫ আংশিক)।
২. তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করে ও কষ্ট সহকারে প্রসব করে। (সূরা লোকমান, আয়াত: ১৪ আংশিক)।
৩. তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩ আংশিক)।
৪. নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। (সূরা বাক্বারা, আয়াত: ২২৮ আংশিক)।
৫. তাদের(স্ত্রীদের) সাথে সুন্দরভাবে জীবনযাপন কর। (সূরা নিসা, আয়াত: ১৯ আংশিক)।
৬. নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। (সূরা নিসা, আয়াত: ১৯ আংশিক)।
৭. তারা (তোমাদের স্ত্রীগণ) তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। (সূরা বাক্বারা, আয়াত: ১৮৭)।
৮. তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়, তার গøানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্তে¡ও সে তাকে রেখে দিবে না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যা করে তা কত নিকৃষ্ট। (সূরা নাহ্ল, আয়াত: ৫৮-৫৯)।
এরপর এ সম্পর্কিত কতিপয় হাদীসের উল্লেখ করা হলো:
১. ‘মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত’।
২. বিদ্যাশিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরয।
৩. আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, একদিন জনৈক সাহাবা রাসূলুল্লাহর (স.) দরবারে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স.) আমার নিকট সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে?’ তিনি বললেন, ‘ তোমার মা।’ একই প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (স.) পরপর তিনবার বলেন, ‘ তোমার মা।’ চতুর্থবার অনুরূপ প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেন, ‘তোমার বাবা।’ (বুখারী মুসলিম)
৪. ‘স্ত্রীর সুপারিশ ব্যতীত স্বামী জান্নাতে যেতে পারবে না।’
৫. “সর্বোত্তম সম্পদ হলো আল্লাহকে স্মরণকারী জিহ্বা, কৃতজ্ঞ অন্তর ও মু’মিনা স্ত্রী যে আল্লাহর পথে স্বামীকে সাহায্য করে।” (তিরমিযী শরীফ)
৬. “ তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।”
৭. “ যে ব্যক্তিকে কন্যা-সন্তান দিয়ে পরীক্ষায় ফেলা হবে, সে যদি তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করে তবে এটাই তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে।” (আবু দাউদ)
৮. “কন্যা-সন্তান লাভের পর সে যদি তাকে জীবন্ত দাফন না করে এবং তার তুলনায় পুত্র-সন্তানকে অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।”
৯. “যে ব্যক্তি দু’জন কন্যা-সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করবে তাদের পূর্ণ বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত কিয়ামতের দিন সে এবং আমি একসাথে থাকব।”
উপরোক্ত আয়াতসমূহও হাদীস শরীফ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম নারীজাতির মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণে অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত বিধান প্রদান করেছে। আপাতদৃষ্টিতে উদ্ধৃত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে কেউ হয়ত ধারণা করতে পারেন যে, নারীজাতির প্রতি ইসলাম হয়ত কিছুটা পক্ষপাতিত্ব করেছে। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে নারীজাতি কিছুটা দুর্বল, এজন্যই তাদের প্রতি কিছুটা ইহসান করা হয়েছে। এটা নারী জাতির প্রতি অনুকম্পা নয়, বরং মমত্ববোধের প্রকাশ।
অতঃপর পৈত্রিক সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানের অংশীদারিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা যায়। ইসলাম পৈত্রিক সম্পত্তিতে ছেলে-সন্তানকে যে পরিমাণ অংশ প্রদান করেছে, কন্যা-সন্তানকে দিয়েছে তার অর্ধেক। কিন্তুু সূ² বিচারে এটা কোন বৈষম্য নয়, বরং এর দ্বারা নারীর অধিকারকে নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিকভাবে তাকে অধিকভাবে লাভবান করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য প্রধান কয়েকটি ধর্ম যেমন খ্রিস্টান ধর্ম, হিন্দুধর্ম প্রভৃতি ধর্মে পৈত্রিক সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানদের কোন উত্তরাধিকারিত্ব নেই। কিন্তু সেসব ধর্মের ব্যাপারে আধুনিক নারীবাদীদের কোন সমালোচনা করতে দেখা যায় না। অথচ ইসলামে কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকারিত্বের স্বীকৃতি থাকা সত্তে¡ও তাদেরকে পুত্র সন্তানের তুলনায় কেন অর্ধেক দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং ইসলাম নারীজাতির প্রতি বৈষম্য করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। মূলত এটা যে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অবিবেচনাপ্রসূত ও উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা প্রচারণা, তাতে সন্দেহ নেই।
ইসলামে উত্তরাধিকার আইনে পৈত্রিক সম্পত্তিতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুত্রসন্তানের জন্য যে পরিমাণ অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, কন্যাসন্তানের জন্য এর অর্ধেক নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে এ পরিমাণ অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত। প্রথমত, কন্যাসন্তানের যথাযথ লালন-পালনের দায়-দায়িত্ব তার পিতা অথবা পিতার অবর্তমানে ভাইদের উপর বর্তায়। দ্বিতীয়ত, কন্যা-সন্তানের বিয়ের ব্যবস্থা করা, বিয়ের খরচাদি ও উপঢৌকনাদি প্রদান (যৌতুক নয়) ইত্যাদি সবকিছু পিতা অথবা ভাইদের উপর বর্তায়। বিয়ের সময় মেয়েরা স্বামীর পক্ষ থেকে দেন-মোহর ও উপঢৌকনাদি যা কিছু পায়, তা এর অতিরিক্ত। তৃতীয়ত, পৈত্রিক সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানের যে অংশ নির্ধারিত রয়েছে, এছাড়া বিয়ের পর স্বামীর সম্পত্তিতেও তার নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ রয়েছে। উপরন্তুু পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে কন্যা-সন্তান যে পরিমাণ অংশ পায়, তা সম্পূর্ণ তার নিজের। নারীর সম্পত্তিতে স্বামী বা অন্য কারও অধিকার নেই। তবে নারী যদি স্বেচ্ছায় তাঁর সম্পত্তি থেকে স্বামী বা অন্য কাউকে কিছু দিতে চায়, তাহলে তা দিতে পারে। এখানে নারীর স্বাধীন মত ও ইচ্ছার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটা তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক।
অন্যদিকে, পুত্র-সন্তান পিতার সম্পত্তি থেকে যে অংশ লাভ করে, তাতে তার নিজের জীবনধারণ, নিজের বিয়ের খরচ, স্ত্রীকে বিয়ের দেন-মোহর প্রদান, স্ত্রী ও সন্তানাদি লালন-পালন ইত্যাদি সকল দায়-দায়িত্ব ও খরচ তাকে নির্বাহ করতে হয়। বিয়ের পরে স্বামীর সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও পুত্রসন্তান যখন বিয়ে করে, তখন সে স্ত্রীর নিকট থেকে কিছু পায় না, বরং স্ত্রীর ভরণপোষণ, নিজ সম্পত্তিতে স্ত্রীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ প্রদান এবং সন্তানাদির ভরণপোষণ, লেখাপড়া ইত্যাদি যাবতীয় খরচ তাকে বহন করতে হয়। অথচ কন্যা-সন্তানকে এ সকল দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয় না। তাই সামগ্রিক বিচারে দেখা যায়, কন্যা-সন্তানের প্রতি বৈষম্য নয়, বরং পুত্র-সন্তানের চেয়ে কন্যাসন্তান অধিক পেয়ে থাকে অথচ পুত্র-সন্তানের ন্যায় তাকে কোন দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয় না। শৈশবে পিতা বা ভাই, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্রদের অভিভাবকত্বে নারীর জীবন নিরাপদ ও স্বস্তিতে অতিবাহিত হয়।
ইসলামের পর্দাপ্রথা সম্পর্কে পাশ্চাত্যপন্থী ও প্রগতিবাদীদের অভিযোগ এই যে, পর্দাপ্রথার কারণে নারীদেরকে সমাজে অবরুদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক অপপ্রচার। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বিদ্যা শিক্ষা অর্জন বাধ্যতামূলক করেছে। নারী ও পুরুষ উভয়ের অন্তর্নিহিত যোগ্যতা ও প্রতিভার (ওহহবৎ ভধপঁষঃরবং) সম্যক বিকাশ ও কাজে লাগানোর কথা বলেছে। ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, রাসূলুল্লাহর (স.) এর যুগে নারীরা পর্দার ভিতরে থেকে জ্ঞানার্জন, কাব্যচর্চা, সঙ্গীতচর্চা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমরাস্ত্র ঘষামাজা, যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষদের রান্না-বান্না, আহতদের সেবা-যতœ, এমনকি প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্রর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন। তবে অতি যুক্তিসঙ্গত কারণে সাধারণভাবে নারী ও পুরুষ উভয়ের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। এ ভিন্নতা প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী এবং এর মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য।
পর্দাপ্রথা অবরোধ নয়। বরং এটা নারীর ইজ্জত-আব্রæ, লজ্জাশীলতা ও সম্ভ্রমের প্রতীক। যে সমাজে নারীরা পর্দাপ্রথা মেনে চলে, সে সমাজে একধরনের শালীনতা, সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও নারীদের প্রতি সম্ভ্রমবোধ বিরাজ করে। অন্যদিকে, যে সমাজে নারীরা বেপর্দায় চলে, সেখানে অশালীন, অশোভন, কুরুচিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে এবং নারীদেরকে নানাভাবে বেআব্রæ, বেইজ্জত ও দুঃসহ লাঞ্ছনা-উৎপীড়ন সহ্য করতে হয়। তাই নারীর ইজ্জত-আব্রæ, সম্ভ্রম-মর্যাদা সুরক্ষার জন্য মহান ¯্রষ্টার পক্ষ থেকে হিজাবকে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, ¯্রষ্টার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এটা একটি ফরয বিধান। তাই এ বিধানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন বা অবহেলা করা অযৌক্তিক।
নারীর পর্দা-প্রথা সম্পর্কে অনেকেই প্রশ্ন তুলে থাকেন। পর্দা প্রথাকে ইসলাম বাধ্যতামূলক করেছে। নারী ও পুরুষ উভয়ের সতর ঢাকা বাধ্যতামূলক। পুরুষ ও নারী উভয়ের পোশাকের ইসলাম-নির্দেশিত সীমারেখাকে ‘সতর’ বলা হয়। সুস্থ, সম্ভ্রমপূর্ণ, শালীন, সুন্দর, সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এটা অপরিহার্য। দৈহিক আকার-বৈশিষ্ট্যের কারণে নারী-পুরুষের ‘সতরে’র (পোশাক) ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও পর্দা পালন উভয়ের জন্যই ফরয। নারী ও পুরুষের সতর একরকম নয়। নারীর মুখাবয়ব ব্যতীত সমগ্র শরীর শালীন ও সুন্দরভাবে আবৃত করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। হিজাব পরিধান বা শালীন পোশাকে নারীর শরীর সম্পূর্ণটা শালীনভাবে আবৃত করা মহান ¯্রষ্টার নির্দেশ। এটা কোন অবরোধ বা নারীকে সমাজ থেকে অন্তরালবর্তী করা নয়। বরং হিজাব বা পর্দা প্রথা নারীর সম্ভ্রম ও মর্যাদার প্রতীক। এভাবে নারীর পোশাক, নারী ও পুরুষের পোশাকে পার্থক্য, উভয়ের জীবনযাপনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলামী সংস্কৃতির এক বিশিষ্ট দিক ফুটে ওঠে। সামাজিক সুস্থতা, শালীনতা, শৃঙ্খলা, পরস্পরের প্রতি সম্ভ্রমবোধ ইসলামী সমাজের এক অনুপম সৌন্দর্য।
সাধারণত মনে করা হয় যে, পর্দা শুধু নারীদের জন্যই প্রযোজ্য। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দাকে বাধ্যতামূলক করেছে। তবে উভয়ের পর্দার ধরন ও প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন। পর্দা সম্পর্কে আল-কুরআন থেকে কয়েকটি আয়াত নিচে উদ্ধৃত হলো:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মু’মিনদের নারীদের বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয় (অর্থাৎ পর্দা করে) এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহযাব, আয়াত : ৫৯)।
এ আয়াতের দ্বারা নারীদের জন্য পর্দা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বেপর্দার কারণে যে অনেক সময় নানারূপ অনাচার, উশৃঙ্খলতা সৃষ্টি হয়, সে সম্পর্কে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। বেপর্দার ফলে সমাজে অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও নারীদের সম্ভ্রমহানী ঘটে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পর্দাপ্রথা সুস্থ, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত। তাই আল-কুরআনে অশ্লীলতা প্রসারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন:
“যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি এবং আল্লাহ্ জানেন, তোমরা জানো না।” (সূরা নূর, আয়াত-১৯)।
উপরোক্ত আয়াতে সমাজে যাতে অশ্লীলতার প্রসার না ঘটে সে জন্য আল্লাহ্তায়ালা কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। কেননা অশ্লীলতার কারণে নৈতিক অধঃপতন ও চারিত্রিক স্খলন ঘটে। ক্রমান্বয়ে তা সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত করে। অশ্লীলতা প্রতিরোধ এবং সামাজিক শালীনতা রক্ষায় নারী-পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। আল্লাহ্ বলেন:
“মু’মিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে, এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।” (সূরা নূর, আয়াত : ৩০)।
এখানে উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত আয়াতে প্রথমে পুরুষকে পর্দা করতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতে মহিলাদের পর্দার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ প্রথমে পুরুষদেরকে এবং পরে নারীকে পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছেন। উভয়ের জন্যই পর্দা করা বাধ্যতামূলক। শুধু নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেয়া হয়নি। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার বিধান সমান গুরুত্বপূর্ণ। নারী-পুরুষ সমাজের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। একটি ছাড়া অন্যটি অচল। সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও উভয়ের দায়িত্ব-কর্তব্য সমান। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ্ বলেন:
“মু’মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে, তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের আভরণ (অলংকার বা আকর্ষণীয় পোশাক) প্রদর্শন না করে, তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় (ওড়না বা চাদর জাতীয় পরিচ্ছদ) দ্বারা আবৃত করে, তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, আপন নারীগণ (সচ্চরিত্রবান মুসলিম নারী), তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন-কামনারহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো নিকট তাদের আভরণ প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মু’মিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা নূর, আয়াত : ৩১)।
লজ্জাস্থানের হেফাজত করা পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই ফরয। পর্দা প্রকৃতপক্ষে লজ্জাশীলতা, শালীনতা ও সম্ভ্রমের প্রতীক। এটা পবিত্রতারও প্রতীক। স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের স. পক্ষ থেকে এটাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেকে পর্দা প্রথাকে প্রগতির অন্তরায় মনে করেন। পর্দা প্রথাকে মুসলিম নারীদের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি প্রতিবন্ধক মনে করেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস থেকে এরূপ অসংখ্য প্রমাণ হাজির করা যায় যে, পর্দা কখনও মুসলিম নারীদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশে অন্তরায় হয়নি। রাসূলুল্লাহর (স.) যুগের প্রখ্যাত সাহাবা নারীদের মধ্যে উম্মুল মুমেনিন খাদিজাতুল কোবরা (রা.), আয়েশা সিদ্দিকা (রা.), হাফসা (রা.), নবীকন্যা ফাতিমা (রা.), বীর নারী খাওলা (রা.) প্রমুখ তাঁদের স্ব স্ব প্রতিভা ও অবদানের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। পরবর্তীকালেও বেগম জোবেদা (খলিফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী), জাহানারা (সম্রাট শাহজাহানের কন্যা), চাঁদ সুলতানা, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মরিয়ম জামিলা (মার্কিন ইহুদী নারী ইসলাম গ্রহণের পর অসংখ্য অমূল্য গ্রন্থ রচনা করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন) প্রমুখ পর্দা প্রথা মেনেই স্ব স্ব অবদানের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। অতএব, পর্দা অমান্যকারী ও এ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও বিরূপ প্রচারণাকারীদের জন্য নিন্মোক্ত আয়াতটি স্মরণযোগ্য:
“আল্লাহ ও রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।”(সূরা আহযাব,আয়াত : ৩৬)
পর্দা প্রথাকে যারা অমান্য করে তারা আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যতা করে এবং এর পরিণতি যে শুভ নয়, আধুনিক সমাজে তার অসংখ্য নজীর রয়েছে। সমাজের বহুবিধ অনাচারের মূল কারণ হলো বেপর্দা, বেহায়াপনা ও নারীর জৌলুসপূর্ণ দেহ-বল্লবীর নির্লজ্জ প্রদর্শনী যা প্রকারান্তরে মানুষকে পাপের পথে ঠেলে দেয়, নারী-পুরুষের সম্পর্কে ফাটল ধরায়, পরিবারে দ্ব›দ্ব-কলহ, পরস্পর সংশয় ও অশান্তি সৃষ্টি করে এবং সমাজে বিশৃংখলা ঘটায়। অথচ পর্দা মানুষকে এ সকল পাপের হাত থেকে রক্ষা করে এবং সুস্থ, শালীন, সভ্য-ভব্য সমাজ গঠনে সাহায্য করে। পর্দা সম্পর্কে আরেকটি আয়াত:
“এবং তোমরা (নারীগণ) স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত থাকবে, হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের অপবিত্রতা থেকে দূরে রাখতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র রাখতে।” (সূরা আহ্যাব, আয়াত : ৩৩)।
এ আয়াতটি নবী পরিবারের মহিলাদের উদ্দেশ্যে নাযিল হলেও মূলত এ নির্দেশ সাধারণভাবে সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এতে নারীদেরকে স্বগৃহে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। তবে এর অর্থ গৃহবন্দী হওয়া নয়, তারা প্রয়োজনে পর্দার সাথে বাইরে যেতে পারবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য জরুরি কাজ আঞ্জাম দিতে পারবে। তবে উপরোক্ত আয়াত দ্বারা নারীর স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্র যে তার নিজ গৃহ, সাংসারিক কাজ-কর্ম, সন্তান লালন-পালন, স্বামী ও পরিবারের অন্যান্যদের দেখাশোনা, পরিচর্যা ইত্যাদি বুঝায়, সেটাই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
তাছাড়া, এখানে আরো একটি বিষয়ের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। সেটা হলো : জাহেলি যুগে এবং তারও পূর্বে নূহ (আ.), ইব্রাহিম (আ.) এর যুগে এবং ঈসার (আ.) আগমনের পূর্বে নারীরা অনেকেই বেপর্দায় চলাফেরা করতো ও তাদের রূপ-সৌন্দর্যের প্রদর্শনী করে বেড়াতো। এখানে নারীদেরকে সেরূপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানেও দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র প্রগতির নামে বিশেষত পাশ্চাত্য জড়বাদী শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা চলাফেরা, বেশভূষা- পোশাক-আশাকের মাধ্যমে নারীদেহের নির্লজ্জ প্রদর্শনী ও পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর দ্বারা সমাজে ব্যভিচার, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও নানারূপ অনৈতিক প্রবণতার প্রসার ঘটেছে। এটাকে যারা প্রগতি বা আধুনিকতা বলেন, মূলত সমাজে অশ্লীলতার প্রসারই তাদের কাম্য।
রাসূলুল্লাহর (স.) যুগে পর্দা সহকারে নারীরা প্রয়োজনে জীবিকার্জন, বাইরের কাজকর্ম করা এমনকি জিহাদেও অংশগ্রহণ করতেন। এ সম্পর্কে একটি হাদিসের উল্লেখ করা যায়:
সাহাবা রুবাই বিন্ত ম’আবিয়া (রা.) বলেন, ‘আমরা মেয়েরা রাসূলূল্লাহ স. এর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করতাম। আমরা সেখানে লোকদের পানি পান করানো, খিদমত ও সেবা-শুশ্রƒষা এবং নিহত ও আহতদের মদীনায় নিয়ে আসার কাজ করতাম। (বুখারী শরীফ)।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট হয় যে, ইসলাম নারী জাতির মর্যাদা ও অধিকার শুধু নিশ্চিত নয়, বরং যথোচিতভাবে সমুন্নত করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আধুনিক প্রগতিবাদীগণ ইসলামের এসব কল্যাণময় ও মানবিক নীতিমালার দিকে দৃষ্টিপাত না করে পাশ্চাত্যের জড়বাদী অমানবিক সভ্যতার প্রভাবে ইসলাম সম্পর্কে নানারূপ বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। মূলত এখানে যুক্তি নয়, আবেগ এবং নারী জাতির কল্যাণ নয়, ইসলামের বিরোধিতাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
এভাবে নারী শুধু মানবজাতির অপরিহার্য অংশই নয়, বরং নারীকে বাদ দিয়ে মানবজাতির কথা কল্পনা করাও অসম্ভব। সেক্ষেত্রে ইসলামী সংস্কৃতিতে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে কোন সংশয় ও প্রশ্ন করার অবকাশ নেই। ইসলামী সংস্কৃতি বিনির্মাণে পুরুষের ভূমিকা আর নারীর ভূমিকা এক, অভিন্ন ও সমান্তরাল। বরং ইসলামী সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ও উৎকৃষ্টতর নমুনার সৃষ্টি করেছে নারী জাতি। উদাহরণত বলা যায়, নারীর পোশাক-আশাক, কর্মায়োজন (সন্তানের জন্মদান, লালন-পালন, রান্না-বান্না, ঘর-কন্না, গৃহসজ্জা, চাল-চলন ইত্যাদি), জীবন পরিবেশ ও স্বামী-সন্তান, পরিবার-পরিজনদের নিয়ে তাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জীবনায়নের ভিত্তিতে যে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জীবনধারা গড়ে উঠে, ইসলামী সংস্কৃতির তা এক বিশিষ্ট রূপ ও পরিচয়।
এটা বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, পর্দার মধ্য থেকে নিজের ইজ্জত-আব্রæ রক্ষা করে নারীদেরকে প্রয়োজনে বহিরাঙ্গণে যে কোন কাজ সমাধা করার অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম নারীদেরকে তাদের স্ব স্ব প্রতিভা ও সকল সুপ্ত সম্ভাবনার (ওহহবৎ ছঁধষরঃু) যথাযথ বিকাশের সুযোগ প্রদান করেছে। ইসলামের ইতিহাসে এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। উম্মুল মুমেনিন খাদিজাতুল কুবরা (রা.) মা আয়েশা (রা.), মা ফাতিমা (রা.), বিবি খাওলা (রা.) প্রমুখ মহিয়সী নারীগণ রাসূলুল্লাহর সা. যুগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা ও মানবিক গুণাবলির পরিচয় দিয়েছেন। এজন্য ইসলামের ইতিহাসে তাঁদের নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
উম্মুল মুমিনীন খাদিজাতুল কুবরা (রা.) দানশীলতা, উদারতা, মহানুভবতা ও জনসেবার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ছিলেন আরবের একজন ধনাঢ্য রমণী। রাসূলুল্লাহর (স.) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ইসলামের খেদমতে ব্যয় করেন। মা আয়েশা (রা.) ছিলেন একজন অসাধারণ হাদিসবেত্তা। তিনি সর্বাধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁকে একজন জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ ফিকাহ্বিদ হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি কবিতাও লিখতেন। নবী-কন্যা অসাধারণ বিদূষী ও প্রতিভাবান মা ফাতিমাও (রা.) কবিতা লিখতেন। নারী জাতির জন্য তিনি ছিলেন এক অনন্য আদর্শ। ঐ যুগে অনেক মুসলিম মহিলা কবিতা লিখতেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং সুর দিয়ে কবিতা শুনাতেন। এরূপ একজন প্রখ্যাত মহিলা হলেন খানসা (রা.)। তিনি ছিলেন সে যুগের একজন প্রখ্যাত মহিলা কবি। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং তাঁর কবিতার প্রশংসা করেছেন এবং তিনি স্বয়ং তাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি শুনতে পছন্দ করতেন।
রাসূলুল্লাহর (স.) যুগে পুরুষদের সাথে নারীরাও যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করতেন। তবে তাদের কাজ ছিল ভিন্ন। তাঁরা সাধারণত যুদ্ধরত সৈনিকদের সমরাস্ত্র সরবরাহ করা, তাদের খাদ্যসামগ্রি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালসামান যোগান দেয়া, যুদ্ধাহতদের সেবাশুশ্রæষা প্রদান এবং যুদ্ধরত পিতা-স্বামী ও ভাইদেরকে বিপুল বিক্রমে শক্রর মুকাবিলা করতে উৎসাহ প্রদান করতেন। তবে প্রয়োজনে তাঁরা অস্ত্রধারণেও দ্বিধা করতেন না। এক্ষেত্রে দু’টি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়।
যুদ্ধের ময়দানে মুসলিম নারীরা আলাদা তাঁবুতে অবস্থান করতেন। কোন এক যুদ্ধকালে শত্রæপক্ষের জনৈক দুষ্কৃতকারী নারীদের তাঁবুর দেয়াল বেয়ে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। মহাবীর খালেদের বোন খাওলা (রা.) তা দেখার সঙ্গে সঙ্গে বীরবিক্রমে তাকে আক্রমণ করে প্রতিহত করেন। ফলে তাঁবুতে অবস্থানকারী মুসলিম নারীগণ শক্রর সম্ভাব্য অনিষ্ট থেকে রক্ষা পায়। এক্ষেত্রে খাওলার (রা.) উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসী ভূমিকা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিকীর্তিত হয়।
দ্বিতীয় আরেকটি দৃষ্টান্ত ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যখন কাফির বাহিনীর হাতে চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়, এমন কি রাসূলুল্লাহ (স.) স্বয়ং কাফিরদের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হন, তাঁর দন্ত মুবারক শহীদ হয় এবং তাঁর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে, তখন তাঁবুতে অবস্থানরত মুসলিম নারীগণ বীরবিক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রে উপনীত হয়ে রাসূলুল্লাহর (স.) চারপাশে সুদৃঢ় ব্যূহ নির্মাণ করেন, উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে কাফেরদের উপর তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং পিছুহটা মুসলিম সৈনিকদেরকেও কাফিরদের মুকাবিলায় ঘুরে দাঁড়াবার আহবান জানান। ফলে মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তিত হয়। এতে রাসূলুল্লাহর (স.) জীবন রক্ষা পায় এবং কাফির বাহিনী পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে কাফিরদের তীরের আঘাতে রাসূলুল্লাহর (স.) শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে অঝোর ধারায় রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। সাহাবা আবু সাঈদ (রা.) -এর বৃদ্ধা মা নিজের মুখ দিয়ে সে রক্ত চুষে নেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে মুসলিম সেনাগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে তাঁবুতে অবস্থানকারী মুসলিম রমণীগণ বীরবিক্রমে এগিয়ে এসে রাসূলুল্লাহকে (স.) চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। এ সময় উম্মে আম্মারাহ না¤œী জনৈকা মুসলিম রমণী সাহসের সাথে তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহর (স.) দেহরক্ষী হিসাবে শত্রæদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। রাসূলুল্লাহকে স. আক্রমণ করতে আসা কাফির সৈন্য ইবনে কুমাইয়ারের মস্তকে তিনি তাঁর তরবারি দিয়ে বারবার আঘাত করতে থাকেন। মুসলিম রমণীদের সাহসিকতা দেখে শত্রæ সৈন্যগণ হতভম্ব হয়ে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এভাবে ইসলামের ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে মুসলিম রমণীদের অসীম সাহসিকতা, অসাধারণ রণনৈপুণ্য ও বিপুল পরাক্রমের নিকট শক্তিশালী বিশাল শক্রবাহিনী পরাভব স্বীকার করে।
ওহুদের যুদ্ধে অনেক মুসলিম মুজাহিদ শহীদ হন। অনেকেই শত্রæর আঘাতে আহত হন। শহীদদের লাশ সংগ্রহ, তাঁদের লাশ সংরক্ষণ ও আহতদের সেবা-শুশ্রæষা প্রদানে মুসলিম রমণীগণ অতুলনীয় সেবাপরায়ণাতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে মা আয়েশা (রা.), উম্মে সলীম, উম্মে আনাস, উম্মে সুলীত, উম্মে আবু সাঈদ (রা.) প্রমুখ মুসলিম রমণীগণ মোশকভর্তি পানি নিয়ে যুদ্ধক্লান্ত পিপাসার্ত সৈনিকদের পানি পান করান, আহত সৈনিকদের ক্ষতস্থানে ঔষধ ও পট্টি বেঁধে দিয়ে এবং হতোদ্যম মুসলিম সৈনিকদেরকে নানাভাবে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে মহাবীর হামজার (রা.) বোন (রাসূলুল্লাহর (সা.) এর আপন ফুফু) সুফিয়া (রা.) স্বয়ং বল্লম হাতে রণক্ষেত্র প্রদক্ষিণ করে মুসলিম সৈন্যদেরকে উৎসাহ প্রদান করেন এবং পশ্চাদপসরণকারী মুসলিম সৈন্যদেরকে পুনরায় রণাঙ্গনে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম নারীদের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের এ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক তেমনি নারী জাতির জন্য তা মহা গৌরবের।
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নারী সকল ক্ষেত্রে পুরুষের পরিপূরক ও সহায়ক শক্তি। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন বলে নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনে উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতাকে অপরিহার্য করে দিয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যথাযথ কর্তব্য পালনের উপর সমাজের স্থিতি, উন্নতি, অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভরশীল। নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মক্ষেত্র নির্দিষ্ট থাকলেও প্রয়োজনে পুরুষ নারীর অঙ্গনে এসে তাকে সাহায্য করবে এবং অনুরূপভাবে নারীরাও বহিরাঙ্গণে প্রয়োজনে পুরুষের পাশে এসে দাঁড়াবে। ইসলাম এভাবে নারী ও পুরুষের সমতাভিত্তিক পারস্পরিক সহযোগিতামূলক উদার নীতির পরিপোষক। নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক। উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতা, হৃদ্যতাপূর্ণ আন্তরিক সহানুভূতি ও প্রয়োজনে সকল ক্ষেত্রে একসাথে পথ চলার নীতিতে ইসলাম বিশ্বাস করে।
ইসলাম বিয়েকে উৎসাহিত ও ব্যভিচারকে হারাম ঘোষণা করেছে। বিয়ের মাধ্যমে নারী-পুরুষের জীবনে পূর্ণতা আসে, সুখ-শান্তি ও স্বস্তি ঘটে। সুন্দরভাবে সংসার জীবন নির্বাহ, সন্তানাদি লালন-পালন, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে এক সৌহার্দপূর্ণ জীবন যাপন সম্ভব। ইসলাম বিয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন দিয়েছে। যেমন- পাত্র-পাত্রী উভয়ের পছন্দ, পাত্র-পাত্রীর যথাযথ উপযুক্ততা বিশেষত দ্বীনদারী ও আমল-আখলাক, বিত্ত- বৈভব ইত্যাদি দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করা। বিয়েতে পাত্রের যোগ্যতানুযায়ী পাত্রীকে দেনমোহর প্রদান, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সর্বসমক্ষে উভয়কে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, পরস্পর সহানুভূতিপূর্ণ জীবন যাপনের অঙ্গীকার করতে হয়। পাত্রকে পাত্রীর ভরণপোষণ, দেখাশোনা ও তার প্রতি সদ্ব্যবহার করার অঙ্গীকার করতে হয়। বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। এ পবিত্র বন্ধনের ফলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ইজ্জত-হুরমত, বিত্ত- বৈভব, সন্তানাদি ইত্যাদি সবকিছুর জিম্মাদার হয়ে যায়। উভয়ের জীবনের সুখ-শান্তি, ভালো-মন্দ, বর্তমান-ভবিষ্যত সবকিছু অবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে উভয়ে উভয়ের কল্যাণকামী হয়, একের অকল্যাণ অন্যের উপরও নিপতিত হয়, তাই পরস্পর পরস্পরের শুভাকাক্সক্ষী হয়। ইসলাম নারী-পুরুষের সম্পর্ক বা দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা, পারস্পরিক আস্থা, নির্ভরতা ও আন্তরিক সম্পর্ক সর্বদা অক্ষুণœ ও সমুন্নত রাখতে চায়। এক্ষেত্রে বিবাহ বন্ধন সমাজের এক মৌলিক ও অপরিহার্য মাধ্যম। এটা পবিত্রতা ও শুদ্ধচারিতার নিদর্শন। এর দ্বারা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শৃঙ্খলা, শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হয়। তাই নারী-পুরুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ দাম্পত্য জীবনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এরফলে যে সাংস্কৃতিক জীবনধারা গড়ে ওঠে, সেটাই ইসলামী সংস্কৃতির এক অনুপম সৌন্দর্য।
ইসলামে ব্যক্তির গুরুত্ব প্রথম ও সর্বাধিক। ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে ¯্রষ্টার নিকট দায়ী। ¯্রষ্টার নিকট প্রত্যেক ব্যক্তিকে জবাবদিহি করতে হবে। প্রত্যেক মানুষই এক একটি স্বতন্ত্র ইউনিট। একজনের জন্য অন্যজন কখনও দোষী সাব্যস্ত হবে না। তাই ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকেই পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল গণ্য করা হয়। ¯্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। ইসলামে কোন মাধ্যম বা মধ্যস্বত্ব নেই। তবে ¯্রষ্টার সাথে সৃষ্টির বা ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে দু’টি জিনিসের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমত, আল্লাহর কিতাব, দ্বিতীয়ত, কিতাবের বাহক নবী বা রাসূল। আল্লাহর সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ দু’টি জিনিসের অপরিহার্য সম্পর্ক বিদ্যমান। আল্লাহর পরিচয়, তাঁর সাথে সম্পর্ক ও বান্দার পরিচয় ও পরিণতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও নবী-রাসূলদের নির্দেশনা ব্যতীত বান্দার পক্ষে সঠিকভাবে কোন কিছু জানা সম্ভব নয়। এছাড়া, ¯্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপনে ইসলাম অন্য কোন মাধ্যম স্বীকার করে না। অবশ্য রাসূলের (স.) অনুগত সাহাবাগণ এবং পরবর্তীতে তাঁদের বিশ্বস্ত অনুসারীগণ যে দিকদর্শন বা আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, সেগুলো ইচ্ছা করলে অনুপ্রেরণা হিসাবে কেউ গ্রহণ করতে পারেন। তবে তা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের (স.) জীবনাদর্শ অনুসরণ করাই প্রত্যেক ঈমানদারের জন্য বাধ্যতামূলক। এভাবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (স.) জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে যাপিত জীবনধারার মধ্যেই ইসলামী সংস্কৃতির শাশ্বত রূপ ও পরিচয় পরিস্ফূট হয়ে ওঠে।
ইসলামে ব্যক্তির পর পরিবারের গুরুত্ব সর্বাধিক। পরিবার ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তি প্রতিভার বিকাশে প্রতিবন্ধক নয়। বরং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও প্রতিভা বিকাশে পরিবার সহায়ক ভূমিকা পালন করে । ব্যক্তির নিরাপত্তা ও গড়ে ওঠার পিছনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত পিতা-মাতা, ভাই- বোন, সন্তানাদি ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের সমন্বয়ে পরিবার গড়ে ওঠে। পরিবার ছোট হতে পারে, বড় হতে পারে। পরিবারে বিভিন্ন বয়স, যোগ্যতা ও অবস্থার লোক থাকে। এরা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে । রোগ, বিপদ-বালামসিবত, অর্থনৈতিক সংকট বা স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি নানাবিধ ভালোÑমন্দ, বিপদাপদ ইত্যাদি বিভিন্ন অবস্থায় পরিবারের লোকজন একে অপরকে সহযোগিতা করে। ফলে কেউ অসহায়বোধ করে না, অবহেলা-উপেক্ষার পাত্র হয় না। সকলেই শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও একধরনের আন্তরিক পরিবেশে ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন-যাপন করে। ঐক্যবদ্ধতা (ঞড়মবঃযবৎহবংং) ও পারিবারিক শৃঙ্খলা ব্যক্তি ও সমষ্টিজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঐক্যবদ্ধতা ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য ইসলাম গুরুজনদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও ছোটদেরকে যথাযথ আদর-¯েœহ, যতœ-আত্মি করার তাগিদ দিয়েছে। পরস্পরের প্রতি সমদৃষ্টি, সদাচার ও ন্যায়নানুগ আচরণ করা পরিবারের সকলের জন্য অপরিহার্য। এভাবে পরিগঠিত পারিবারিক জীবন-যাপন পদ্ধতি যে কোন সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেখা যায়, ইসলাম ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিগঠনে যেসব মৌলিক বিষয়কে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে, তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জীবনধারা ও উদ্ভূত সংস্কৃতিই মূলত ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণময় উপাদান হিসাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
ইসলামী আদর্শের মূল লক্ষ্য মানবজীবনে ঐক্য, সংহতি, শান্তি ও শৃঙ্খলা বিধান। ¯্রষ্টার প্রতি ঐকান্তিক, অবিচল বিশ্বাস থেকে এর উৎপত্তি ঘটে। রাসূলুল্লাহর (স.) অনুপম জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই এ বিশ্বাসের যথার্থ বাস্তবায়ন ঘটে। এ বিশ্বাসের ধারক প্রথমত ব্যক্তি। ব্যক্তির বিশ্বাস ও বিশ্বাস অনুযায়ী আমল ক্রমান্বয়ে পরিবার ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত হয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে এ বিশ্বাসের বিশ্বস্ত প্রতিফলন ও বাস্তবায়নেই ঈপ্সিত শান্তি ও কল্যাণময় লক্ষ্য অর্জিত হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এ লক্ষ্য অর্জনের মূল উপকরণ ¯্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, রাসূলের আনুগত্য ও আখিরাতে জবাবদিহিতামূলক জীবনাচরণ। এরফলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ঐক্য, শান্তি, শৃঙ্খলা ও সংহতি সৃষ্টি হয়। কল্যাণময় মানব সভ্যতা-সংস্কৃতি নির্মাণে ও তার বিস্তার ও সম্ভাবনাকে অবারিত করে তুলতে এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন সমাজে যে অশান্তি-বিশৃঙ্খলা, বিশ্বব্যাপী সভ্যতা-সংস্কৃতিতে যে অবক্ষয়, হতাশা, নৈরাশ্য ও ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলেও রয়েছে অবিশ্বাস ও নাস্তিক্যবাদ বা বস্তুতান্ত্রিকতার প্রভাব।
ইসলাম সমষ্টিবদ্ধ সামাজিক জীবনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। সামাজিক জীবনের শৃঙ্খলা বিধান ও সুষ্ঠু -সুন্দরভাবে তার কল্যাণকামী দিকের বিকাশ ঘটানোর উপযুক্ত নীতিমালা প্রদান করেছে। অনুরূপভাবে, রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, আইন-আদালত-বিচার ও বিভিন্নভাবে মানুষের জীবনকে শান্তি-নিরাপত্তা ও সম্ভাবনার উজ্জ্বল দিগন্তে পৌছে দেওয়ার সুস্পষ্ট নীতিমালা ইসলাম প্রদান করেছে। ইসলামের নীতিমালা অনুযায়ী যখন সবকিছু পরিচালিত হয়, তখন তার ভিত্তিতে অবশ্যই এক অনুপম অত্যুজ্জ্বল অনিন্দ্য সংস্কৃতির বিকাশ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফলে ইসলামী সংস্কৃতির রূপ বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে এবং ইসলামী আদর্শানুগ জীবন-যাপন পদ্ধতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে। আর এক্ষেত্রে শুধু পুরুষ নয়, নারীর ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নারীকে ছাড়া মানবজাতির কথা যেমন কল্পনা করা অসম্ভব, তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশেও নারীর ভূমিকা সমান্তরাল ও একান্ত অপরিহার্য।
উপসংহারে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই। প্রত্যেকের সমমর্যাদা ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার ইসলাম নিশ্চিত করেছে। মনে রাখতে হবে যে, নারী এবং পুরুষ উভয়ের ¯্রষ্টা এক। ¯্রষ্টা কখনও কারও প্রতি বিভেদ- বৈষম্য করেন না, এটা চিন্তা করাও অসঙ্গত। ¯্রষ্টার নিকট সকল সৃষ্টি সমান গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব-কর্তব্য সুচিহ্নিত। আল্লাহ কোনকিছুই অযথা সৃষ্টি করেননি। প্রত্যেক সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বর্ণনা রয়েছে। প্রাসঙ্গিক নয় বলে এখানে সেসব ব্যাখ্যা ও বর্ণনা প্রদান করা থেকে বিরত থাকলাম।
ইসলাম ন্যায়সঙ্গতভাবে নারী-পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত করেছে। তবে উভয়ের দৈহিক অবয়ব ভিন্ন। এ ভিন্নতার অর্থ বৈষম্য নয়। এ ভিন্নতার সুস্পষ্ট অর্থ ও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এ ভিন্নতার কারণেই পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ সুন্দর অপত্য আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, বংশবৃদ্ধি ঘটে, মানবসৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকে, মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে এককভাবে পুরুষের অবদান নিয়ে আলোচনা করা যেমন অর্থহীন, এককভাবে নারীর অবদান নিয়ে আলোচনা করাও তেমনি অযৌক্তিক। উভয়ের সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ অবিমিশ্র অবদানেই সৃষ্টির আদিমলগ্ন থেকে যুগ-যুগান্ত ধরে মানবসভ্যতা-সংস্কৃতির অবিরল ধারা ক্রমবর্ধমানহারে অব্যাহত রয়েছে। এক্ষেত্রে কারও অবদানকে গৌণ বা খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তাই এ ভিন্নতাকে মানব-সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য বলা যায়।
পুরুষ যেমন মানবজাতির অপরিহার্য অংশ, নারীও তাই। উভয়ে মিলেই মানবজাতি। ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্ব সভ্যতা-সংস্কৃতি ও পৃথিবীর ইতিহাসে নারী-পুরুষের অবদান এক ও অবিমিশ্র। ইসলাম এক্ষেত্রে কোনরূপ বিভেদ-বৈষম্য সৃষ্টি করে না। ¯্রষ্টার দৃষ্টিতে সকল সৃষ্টি এক ও অবিভাজ্য। প্রত্যেকের রূপ, অবয়ব, সৃষ্টি- কৌশল, যোগ্যতা, দায়িত্ব ও লক্ষ্য নির্ধারিত ও সুগভীর তাৎপর্যে অভিসিক্ত। এসবের মধ্যে যে ভিন্নতা পরিদৃষ্ট হয়, তা মহান ¯্রষ্টার অপরিসীম ক্ষমতা, মাহাত্ম্য, বৈচিত্র্য ও দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যের অনিন্দ্য প্রকাশ। এ অসাধারণ সৃষ্টি-কৌশল, কুদরত ও দৃষ্টিনন্দন বৈচিত্র্যের মধ্যে জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ ও চক্ষুষ্মান ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত চিন্তার খোরাক। মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির উদ্ভব, বিকাশ ও সার্বিক পূর্ণতা সাধনে এ গুরুত্ব অপরিসীম।ক্স
লেখক : প্রফেসর ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা।

