হারানো মানিক (ছোটগল্প) - ফারজানা মাহবুব

OHS
By - Imran Ali Shagor
0

হারানো মানিক (ছোটগল্প)
(ছোটগল্প)

হারানো মানিক

ফারজানা মাহবুব


লম্বা দাড়ি এবং কালো সানগ্লাস পরিহিত লোকটাকে দারোয়ান ঢুকতে দিচ্ছে না। সারাদিন রাস্তার অপজিটে এক দোকানে বসে বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। ভেবেছিলো তার এই গেটআপে মা-বাবা আর সুরভীকে চমকে দিবে। কিন্তু বাড়ির গেটে এসে নিজেই চমকিত হলো। দারোয়ান তাকে চিনে না কারণ পুরোনো দারোয়ান হাসেম চাচা নেই, তার স্থলে নতুন একজন এসেছে। প্রথমে রহমান সাহেবের সাথে দেখা করবে বললে যেতে দিলো না। পরে সে রহমান সাহেবের বড়ছেলে আরমান পরিচয় দিলে উল্টো দারোয়ান পুলিশের ভয় দেখালো।
দারোয়ান পুলিশের ভয় দেখালো কেনো? সেতো এই বাড়িরই সন্তান। এই গলিতে খেলে, আড্ডা দিয়ে বড় হয়েছে সে। কিন্তু কেনো দারোয়ান তাকে ধমকালো। সে তো অভদ্রতা দেখায়নি। প্রথমে নিজে নিজে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে চাইলো, পরে বাবার সাথে দেখা করার কথা বললে দারোয়ান তাকে তাড়িয়ে দিলো। তবে কি এই বাড়িতে সে মৃত? অনেক ভেবে চিন্তে সে তার বন্ধু সাইফের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
আরমানদের বাড়ি বাসাবো বাজারের কাছে আর সাইফদের বাসা খিলগাঁও রেলক্রসিং এলাকায়। দু’জনে একসাথে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। তার কাছে গেলে সে বুঝতে পারবে কি হয়েছে তাকে নিয়ে। এক বুক আশা নিয়ে সে সাইফদের বাড়ির দিকে রওনা দিলো। ভাগ্য ভালো সাইফকে বাসায় পাওয়া গেলো। আরমানকে চিনতে পেরে এতদিন কোথায় ছিলো জানতে চায় সাইফ।

আরমান তার জীবনের করুণ অধ্যায়ের কথা বলতে শুরু করে সাইফকে। একবার বোনকে কোরবানির টাকা দিয়ে আসতে এবং গ্রামের একটা  মসজিদে বাবার দেয়া এক লক্ষ টাকা নিয়ে সে ভোলা যাচ্ছিলো কোকো-৪এ। কয়েকদিন পর ঈদ। সুরভী বারবার নিষেধ করেছে। কারণ ঈদের ২-১ দিন পর ডাক্তার সুরভীর ডেলিভারির ডেট দিয়েছে। সুরভীকে অনেক বুঝিয়ে শুধুমাত্র একদিনের জন্য সে ভোলা গেলো। কিন্তু কে জানতো এই একদিন তার জীবন থেকে অনেকগুলো দিন হারিয়ে দেবে। কোকো-৪এ ডুবে গেলো। শত শত যাত্রীর মধ্যে সেও এক হতভাগ্য যাত্রী। জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে কিছুক্ষণ বাঁচার জন্য যুদ্ধ করেছিলো। বেঁচে আছে- বিষয়টা তার বুঝতে দীর্ঘ ছয় মাস লেগেছে।
সাইফ বলে, বেঁচে যখন ছিলি তখন বাসায় জানালি না কেনো? আমি আর তোর বাবা প্রতিদিন তোর খোঁজে সদরঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তোর কোনো খবর পেলাম না। তারপর এক সময় তোর বাবা আর মাকে নিয়ে তোদের গ্রামের বাড়ি গেলাম কিন্তু সেখানেও তুই নেই। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম। তোর মা আর সুরভীর বুকফাটা কান্নায় তোদের বাড়ির ইট পর্যন্ত কেঁদেছে। একদিন তোর বাবা, মা এবং সুরভী তোর মেয়েকে বুকে আগলে নতুন করে বাঁচতে শুরু করলো। পরিবারের কাছে তুই আজ মৃত। তাইতো দারোয়ান তোকে ঢুকতে দেয়নি।
তো এবার বল, দাড়ি কেনো রেখেছিস এবং সারাক্ষণ চোখে সানগ্লাস কেনো? আরমান বলে- ভাসতে ভাসতে হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে পৌঁছে গেলাম। অজ্ঞান অবস্থায় এক লোক তুলে নিয়ে বাড়িতে সেবাযতœ দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো মতেই জ্ঞান ফেরাতে পারলো না। হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলাম তিন মাস। নাম-পরিচয়হীন একটা লোককে তারা ছয় মাস চিকিৎসা দিলো, আশ্রয় দিলো এটাই অনেক বেশি। প্রায় চার মাস ঐ কমপ্লেক্সের এক ডাক্তারের অকৃত্রিম চেষ্টায় আমার জ্ঞান ফিরে কিন্তু ততদিনে ডান চোখটা হারালাম। চোখ বন্ধ থাকতে কেউ বুঝতেপারেনি। চোখে আঘাত লাগাতে শেষ পর্যন্ত চোখের আলো নিভে গেলো। নতুন চোখ লাগানো ছাড়া হবে না। তাইতো চলতে পারার সাথে সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেই ডাক্তারই যাতায়াত খরচ দিলো। মোবাইল তো পানিতে পড়ে গেছে কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর বাড়ির কারো নম্বরও মনে করতে পারছি না। তাই গত পনেরো দিন সুস্থ থেকেও আমার কথা জানাতে পারিনি। তুই এখন ফোন কর। আমি বাড়ি যাবো আর আমার বাবা, মা, সুরভী এবং সন্তানকে দেখবো। চল, আর দেরী করিস না। আরমানের যেনো দেরী সয় না, বারবার সাইফকে তাড়া দিচ্ছে। সাইফ যেনো এক পাথরের মূর্তি। হঠাৎ করে সাইফের দিকে নজর পড়তে আরমানের বুকটা কেঁপে উঠলো। তবে কি সে মৃত? তার সুরভী কি আর নেই? সুরভী কি চলে গেছে?  প্রশ্নগুলো তাকে বিধ্বস্ত করছে।

দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পর সাইফ বলে- তোর বাবাকে ফোন করে এখানে আসতে বলি। একটা সারপ্রাইজ হোক। কিন্তু আরমান মানতে পারছে না। সে নিজে গিয়ে বাবা, মা ও সুরভীকে সারপ্রাইজড করতে পারে। কিন্তু যেতে বাঁধা কোথায়। এরপরও সাইফ রহমান সাহেবকে ফোন করে দ্রুত তাদের বাসায় আসতে বললো। আর আরমানকে সেভ ও গোসল করে রেডি হওয়ার জন্য তাড়া দিয়ে ভিতরে চলে গেলো।

আরমানের মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় সাইফের খাটে বসেই থাকলো। এদিকে সাইফের জরুরি ফোন পেয়ে রহমান সাহেব আধা ঘণ্টার মধ্যে সাইফের বাসায় এসে পৌঁছলো। পথে চিন্তা করলো কি এমন ব্যাপার যার জন্য সাইফ তাকে এখুনি তাদের বাসায় যেতে বললো! এর কারণ জানতে চাইলে সাক্ষাতে বলবে বলে জানায় সাইফ। কলিং বেল বাজার সাথে সাথে আরমান দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে বাবাকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। রহমান সাহেব প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে আরমানকে চিনতে পেরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। বাবা, তুই বেঁচে আছিস, এতদিন কোথায় ছিলি? তোকে কতো খুঁজেছি। কেনো তুই এতদিন নিখোঁজ ছিলি? তোর শোকে তোর মা অসুস্থ্য। কিন্তু এমন সময় আসলি যখন তোর বলে কিছুই থাকলো না। আমি তোকে কি ফিরিয়ে দেবো? আমি যে তোকে নিঃস্ব করে দিলাম। এসব বলে সমানে চিৎকার করছেন রহমান। সাইফ এসে সামাল দেবার চেষ্টা করলেও পারছে না।
আরমান বুঝতে পারলো সুরভী আর তার নেই, তার পরিবারে সে মৃত। সে কোনো সন্তানের পিতা নয়। কোনো স্ত্রীর স্বামী নয়। সে কার জন্য বাঁচলো? অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললো- বাবা, আমি বাসায় যাবো। মাকে, তোমাকে আর আমার মেয়েকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করবো। সুরভী নেই তো কি হয়েছে? যে মেয়ের স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর একটা বছর যেতে দেয়নি, ছয় মাসের সন্তানকে রেখে নতুন স্বামীর সাথে সংসার করতে চলে যেতে পারে তার জন্য কেঁদে কি হবে! চলো, বাড়ি যাই। আরমানের শেষের কথায় যেনো তিনি চেতনা ফিরে পেলেন। আরমান বাড়ি যেতে চাচ্ছে কিন্তু তিনি কিভাবে তাকে বাড়িতে নিবেন। যে বাড়িতে যাবার পথ তিনি আর তার মা মিলেই তো বন্ধ করে দিয়েছে। রহমান সাহেব বললেন, তুই আর ক’টা দিন এখানে থাক। তোর মাকেসহ এনে তোকে আমি নিয়ে যাবো। আরমান কিছুই মানতে রাজি নয়। সে এক্ষুণি বাড়ি যাবে। আর যদি না যেতে হয় কেনো যাওয়া যাবে না, তা আজকেই বলে যেতে হবে।
রহমান সাহেব যেনো নিথর পাথরের মূর্তি। শেষে আরমানের পিড়াপিড়িতে বলতে বাধ্য হলো সুরভী আমাদের বাড়িতে আছে কিন্তু সে এখন তোর ছোটভাই আহনাফের স্ত্রী। তোর নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মেয়েটা একদিকে অসুস্থ্য অন্যদিকে তার কান্নায় কেউ শান্তিতে থাকতে পারেনি। লঞ্চ দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর তোর মেয়ে হলো। সুরভী অনেকটা ভারসাম্যহীন। যেনো চেতনাহীন এক কলের পুতুল। সংসার, সন্তান কোনো কিছুর প্রতি তার কোনো খেয়াল নেই, সারাদিন শুধু কান্না। জীবনের প্রতি তার মোহ ছিলো না। ডাক্তার বললো, পাহারা দিতে। যে কোনো সময় আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারে। তারা তাকে তার বাবার বাড়িতে নিতে চাইলো। একদিনের জন্যও তোর ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে চাইলো না। সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে আরমানের বাড়িতে থাকবে। তার মরণ হলে এখানেই হবে। তার মেয়ে এই বাড়ির পরিচয়ে বড় হবে, তার এই সিদ্ধান্তের পর তার বাবা, মা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন মিলে পরামর্শ করে তাকে আহনাফের বউ করে রাখার চিন্তা করলাম। কিন্তু তারা দু’জনের কেউ রাজি নয়।

আহনাফ আর সুরভীকে বোঝাতে বোঝাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। শেষে তোর মা আর সুরভীর মা মিলে তাদেরকে ডেকে বললো- তোমরা যদি আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে না নাও তাহলে আমাদের মরামুখ দেখবে। মায়েদের কাছে তারা হেরে গেলো। এইতো গত এক মাস আগে সুরভী আর আহনাফের বিয়ে হয়ে গেলো। এখন তুই বল- আমি কি করবো। এসব কথা বলে তিনি যেনো হাঁফিয়ে উঠলেন এবং ঘর থেকে সোজা বেরহয়ে গেলেন। আরমান সাইফের কাছ থেকে তার বাবার মোবাইল নম্বরটা নিয়ে বাসা থেকে বের হতে চাইলে সাইফ বললো- কোথায় যাবি? আমার এখানে থাক। আরমান দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে- নিজের বাড়িতে তো জায়গা হলো না। দেখি এই জিন্দা লাশের জায়গা কোথাও হয় কিনা।

সাইফের বাসা থেকে বের হয়ে আরমান চিন্তা করলো রাত হচ্ছে, সে এখন কোথায় যাবে? এই দুনিয়াতে কি তার রাত কাটানোর কোনো জায়গা নেই? ভাবতে ভাবতে সে সাইফের বাড়ির সামনে রেল লাইনের পাশে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর সাইফ বাড়ি থেকে  বের হয়ে অসহায় আরমানকে গাছের গোড়ায় ঘুমাতে দেখে তার ভেতরটা কেঁদে উঠলো। আস্তে আস্তে গিয়ে আরমানের পাশে বসে চিন্তা করছে এই এক হতভাগা দুনিয়াতে, যার সবকিছু থেকেও নেই। নিঃস্ব, অসহায় ও দুঃখী একজন মানুষ। বন্ধু হয়েও বন্ধুর জন্য সে কিছুই করতে পারছে না। ভাবতে ভাবতে কখন যে দু’ফোঁটা অশ্রু আরমানের পায়ে পড়লো সে খেয়াল  করেনি। আরমান জেগে উঠলো। সাইফ আরমানকে জড়িয়ে ধরে তার বাসায় নিয়ে শুয়ে দিলো। সাইফ চা নিয়ে এসে দেখে আরমান ঘুমিয়ে পড়েছে। সেও সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। রাতে খাবার টেবিলে শ্বশুর-শাশুড়ি কাউকে না পেয়ে সুরভী কিছুটা চিন্তিত হলো। তাদেরকে ডাকতে গেলে দেখে তার শ্বশুর মাথার উপর হাত দিয়ে অপলক চেয়ে আছে আর শাশুড়ি জায়নামাজে বসে আছে। এই দৃশ্য যেনো সুরভী সহ্য করতে পারছে না। সে নিজেও টেবিলে না গিয়ে মেয়েকে বুকে নিয়ে শুয়ে গেলো। সুরভী বুঝতে পেরেছে যে ক্ষত আরমান সৃষ্টি করেছে তা এই দগদগে ঘা কখনো শুকানোর নয়।

প্রতিনিয়ত সুরভীর মনে হয় সে আহনাফকে ঠকিয়েছে। সে নিজেও বিধ্বস্ত হচ্ছে। আহনাফের স্ত্রী নয় বরং আরমানের স্ত্রী হিসেবে সে এই বাড়িতে ভালো থাকতে পারতো। কেনো শুধু শুধু একটা আইনি সম্পর্ক করতে গেলো। এর থেকে মুক্তির তো কোনো পথ নেই। তার এখনো মনে হয় এই বুঝি আরমান এলো। তার সংসার ঝলমল করে উঠবে কিন্তু পরক্ষণে মনে হয় আরমান ফিরে আসলেও সে তো আর তার নয়। তখনি সে মুষড়ে পড়ে। নিজের সাথে নিজের প্রতারণা যে কতই ভয়ংকর তা সুরভী প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছে। গত দুইদিন ধরে আরমানের কথা তার খুব বেশি মনে পড়ছে। ইচ্ছা হচ্ছে চিৎকার করে কেঁদে বুক হালকা করুক কিন্তু সে যে এই বুড়োবুড়ির স্নেহের জালে বন্দি। তাদের একটুখানি সুখের জন্য সে নিজেকেনিঃশেষ করে দিচ্ছে। আজ রাতে আহনাফ বাড়িতে ফিরবে না। সুরভীকে বলে গিয়েছে সে আজ লাবনীর কাছে থাকবে। থাকবেই তো, লাবনী হলো তার ভালোবাসা এবং বিবাহিতা স্ত্রী। লাবনীর সান্নিধ্যে তো আহনাফ ভালোবাসার পরশ পায়, স্বপ্নের জাল বুনে। সুরভী চায় আহনাফ প্রতিক্ষণ, প্রতি মুহূর্তে লাবনীর কাছে থাক। কারণ তাতেই আহনাফের সুখ বেশি। বাবা-মায়ের চাপে আর সুরভীর অসহায়ত্বের কথা ভেবে সুরভীকে বিয়ে করতে রাজি হলেও কেউ কারো সাথে মিলে উঠতে পারছে না।
 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)