ল্যাভেন্ডার ফুলে মশা তাড়াবো
নাসীমুল বারী
[ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী নারী যোদ্ধা হানাদি হালাওয়ানিকে উৎসর্গিত]
পাথরে তৈরি বাড়ি।
উষ্ণ আবহাওয়ার আরবীয় ভ‚মি শেখ জারাহ এলাকার বাড়ি এটি। ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুসালেমে অবস্থিত এই শেখ জারাহ এলাকা।
এই বাড়ির আদি বাসিন্দা সামিরা দাজানি আর আদেল বুদেইরি। বাড়ির সামনে চমৎকার একটি বাগান। ফুটে আছে তাতে বাগানবিলাস আর ল্যাভেন্ডার। একপাশে গাঢ় গোলাপি ফুলের বাগানবিলাস ছাদ পর্যন্ত বেড়ে ওঠেছে। ওটারই সামনে এক টুকরো অংশে ল্যাভেন্ডার বাগান। লালচে-বেগুনি রঙের ল্যাভেন্ডার ফুল একটি দÐের মাথায় থোকায় থোকায় ফুটে আছে। চমৎকার সুঘ্রাণে মানুষকে খুবই আকৃষ্ট করে; কিন্তু দূরে বহুদূরে ঠেলে দেয় মশাসহ উড়ন্ত পোকামাকড়কে। বাড়ির সুরভিত সৌন্দর্য বৃদ্ধি আর মশা-মাছির উপদ্রবে নিরাপত্তার প্রাকৃতিক এক উপাদান এই ল্যাভেন্ডার ফুল।
বিকেলের উষ্ণ-শীতল আবহাওয়ার চমৎকার অনুভবে সামিরা ও আদেল দুই জনেই হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতেই সামিরা বলে, আর কদিন পর এখানে আসবে ওই দখলদার মশাগুলো। ইস্ এই ল্যাভেন্ডার ফুলগুলো আসল মশার মতো যদি ইহুদিগুলারে তাড়াতে পারতো. . .!
কথাটা আটকে যায়। তাকায় স্বামী আদেলের দিকে। আদেলের চেহারায় আনন্দ নেই। এই বৈকালিক সময়ের ক্ষুদ্র মরুদ্যানের সুখ-ভালোবাসা নেই। তার দিকে তাকিয়েই আবার বলে, আমরা কি দ্বিতীয়বার শরণার্থী হবো?
- অবশ্যই। এটাই ওই দখলদারদের একমাত্র কাজ। তোমাকে আমাকে উৎখাত করে আমাদের মাতৃভ‚মি কেড়ে নেওয়াই ওদের সভ্যতা! ওদের নিরাপত্তা!
সামিরা এবার দৃঢ়কণ্ঠে বলে, আমাদের এখন জুডেনরাইন আন্দোলন করতে হবে।
- ‘জু-ডে-ন-রা-ই-ন- - -’!
মাটিতে একটা সজোরে লাথি মেরে আনমনে কথাটা বলল আদেল বুদেইরি। পাশে থাকা প্রিয় স্ত্রী সামিরা দাজানি আরও দৃঢ়তা নিয়ে বলে হ্যাঁ, আমাদের জুডেনরাইন আন্দোলন শুরু করতে হবে।
এই শেখ জারাহ এলাকার ১৪টি বাড়িতে ৩০০ ফিলিস্তিনি পরিবার বসবাস করে। এখন এগুলো ভেঙে ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য আদালত রায় দিয়েছে। ইসরাইলের আদালত- মানে একপেশে আদালত। এই আদালতের ন্যায় বিচার মানে শুধুই ইসরাইলি ইহুদির পক্ষ নেওয়া। এমন পক্ষপাতিত্বকে বিশ্ব আবার সভ্যতার সনদও দিচ্ছে।
১৯৪৮ এ সেই কথিত বিশ্বসভ্যতা যখন এখানে এসে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে ইহুদিদেরকে বসায়, তখন সামিরা ও আদেলের পূর্বপুরুষরা পশ্চিম জেরুসালেম থেকে বাস্তুহারিয়ে শরণার্থী হয়েছিল প্রথমবারের মতো। ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে এই আদি ফিলিস্তিনি ভ‚মিতেই বসতি গড়ে তোলে। এখন আবার এখান থেকেও!
আদেল-সামিরাদের বাড়ির সামনেই রাস্তা। এ রাস্তার দুই প্রান্তে পুলিশ চেকপোস্ট। ইহুদিরা এ রাস্তায় অবাধে চলাফেরা করতে পারে। ফিলিস্তানিরা তা পারে না। তাদের অনেক বাঁধা। নিজ ভ‚মিতেই এমন- কষ্টটা তাই অনেক বেশি।
শেখ জারাহতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। নিকটবর্তী আল-আকসা মসজিদেও। এই মসজিদে আল আকসা ‘হারাম আল শরীফ’ বা ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ নামেও পরিচিত। মসজিদটির কাছেই একটা জাইতুন গাছ। কেউ কেউ এ গছের নিচে, কেউবা বারান্দায় বসে আছে। কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছে। কারো কোনো ভয় বা তাড়া নেই। এখানে এসে সবাই যেন আধ্যাত্মিক আবেগে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। হাজার হাজার বছরের পুরোনো এ মসজিদ মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল। এ মসজিদ থেকেই আল্লাহর রাসূল শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম মেরাজের জন্য রাতে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। গমনের আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম পূর্ববর্তী নবীগণ ও ফেরেস্তোদের সাথে নিয়ে ইমাম হিসেবে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। আল আকসা এলাকাটা তাই অতি সাধারণ হলেও ঐতিহ্যবাহী আর পবিত্রতম। এমন পবিত্র আর গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে আজ মুসলমানরাই যেতে পারে না। এই পবিত্র ভ‚মির আদিবাসী ফিলিস্তানীরাই পরবাসী এখন।
বাসার সামনে হাঁটছে আর ভাবছে আদেল-সামিরা দুজনেই। আর কদিন পর শরণার্থী হয়ে যাবে। পরবাসী হয়ে যাবে। না, এভাবে তো ওদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রত্যয়ী দৃষ্টিতে আদেলের দিকে তাকিয়ে বলে, আমাদের জুডেনরাইন আন্দোলন করতেই হবে।
এবার মেজাজটা কঠিন করে আদেল বলে, জুডেনরাইন আন্দোলন করবা ভালো, সভ্যতা কি তোমাকে ছেড়ে দেবে? বিশ্বসভ্যতার অসভ্য কাজগুলো দেখো না? আমাদেরকে ভ‚মি থেকে উচ্ছেদ করে আমাদেরকেই সন্ত্রাসী বানাচ্ছে। চারদিক থেকে অবরোধ করে খাবার আনতে দিচ্ছে না। ঔষধ আনতে দিচ্ছে না। মানবতা আমাদের বিপন্ন। তারপরও তারা সভ্য! তারা নির্দোষ! আমরা ফিলিস্তিনিরা সন্ত্রাসী। আর এখন তোমাকে তো তারা সন্ত্রাসী বানাবেই। এই দেখো না আমার অবস্থা। কতবার আমাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি কেন ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রাম করি; কত না নির্যাতন করেছে। তুমি সবই জানো। এখন তো উচ্ছেদই করে দেবে আমাদেরকে। ভ‚মিই হারাব আমরা। আগে তো নিজের থাকার অধিকার ঠিক রাখো। নিজ শহরকে বাঁচাও। তাই বলেছি- জুডেনফ্রেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
- তুমি এতো সংকীর্ণ কেন?
- কী!
ভীষণ চমকে জিজ্ঞেস করে আদেল।
- এই যে বললে জুডেনরাইন বাদ দিয়ে জুডেনফ্রেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
- হ্যাঁ, বলেছি তো। জানালাম তো কেন করতে হবে। এতে সংকীর্ণতা কী?
জুডেনরাইন আর জুডেনফ্রেই- দুটোই ইহুদি বিতাড়নের আন্দোলন ধারা। জুডেনফ্রেই মানেই স্থানীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীকে একটি শহর থেকে সরিয়ে দেওয়া। আর পুরো দেশ থেকে ইহুদি সরিয়ে ইহুদিমুক্ত করাই হলো- জুডেনরাইন। আদেল আপাতত জুডেনফ্রেই আন্দোলনের পক্ষে। কিন্তু সামিরা!
ইহুদি জনগোষ্ঠীকে শুধু একটি শহর থেকে নয়; আদি মাতৃভ‚মি পুরো ফিলিস্তিন দখল করে বসে থাকা ইহুদিদের মুক্ত করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী সামিরা। তাই সে জুডেনরাইন আন্দোলন করবে, জুডেনফ্রেই নয়।
একটু ঘুরে আদেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সামিরা তাই বলে- সংকীর্ণতা নেই মানে? পুরো মাতৃভ‚মি বাদ দিয়ে এই একটি শহকে মুক্ত করাই তো সংকীর্ণতা।
- তাহলে?
একটু শান্তকণ্ঠে জানতে চায় আদেল।
- আমাদের আদি মাতৃভ‚মি পুরো ফিলিস্তিনে দখল করে বসে থাকা ইহুদিদের মুক্ত করবো । এ জন্য যে কোনো কষ্টকেই আমি কষ্ট মনে করবো না। আমি লড়াই করবো আর শুধু হাসবো। বুঝলে মিস্টার?
তাকায় প্রিয়তমা স্ত্রী সামিরার দিকে। সামিরা এবার ওর দু কাঁধে হাত রেখে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে বলে- জুডেনরাইনের জন্য আমি হানাদি হালাওয়ানির দলে যোগ দেব।
- তুমি!
- হাঁ! আমি হানাদি হালাওয়ানির মুরাবিতাত দলে নাম লেখাব। আমাদের এই বাগানের ল্যাভেন্ডার যেমন মশা তাড়ায়; আমিও ফিলিস্তান থেকে ইহুদি তাড়াব। তুমি তো এমন আন্দোলনে আছো। এবার আমি মুরাবিতাতে যোগ দেব। দুজনেই ওদের তাড়াতে লেগে যাব দুই দিক থেকে।
পবিত্র আল-আকসাকে রক্ষার জন্য ফিলিস্তিনি নারীদের সংগঠন ‘মুরাবিতাত’। এর নেতৃত্বে আছেন হানাদি হালাওয়ানি। ইসরায়েলি পুলিশের খাতায় সবচেয়ে ভয়ংকর ফিলিস্তানি হিসেবে পরিচিত হানাদি হালাওয়ানি একজন নির্ভীক মুক্তিকামী ফিলিস্তানি নারীযোদ্ধা।
সামিরার এমন কথায় আরো চমকে আদেল তাকায় স্ত্রী সামিরার দিকে। চোখ বড়ো করে বলে, সত্যি নারীর যেমন সন্তানের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থাকে; তোমারও তেমন। সন্তানের মতোই পুরো ফিলিস্তানকে তুমি তোমার মাতৃত্ব দিয়ে ভালোবাসো। মাতৃত্বের মতোই নির্ভীক থেকে একে উদ্ধার করতে নেমে পড়েছ।
তোমাকে সালাম শত শত।

