অন্য কোথাও - আবদুল হাই মিনার

OHS
By - Imran Ali Shagor
0


হঠাৎ তার মনে হয়, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, আজ। এখন। 

সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে কুল কুল করে ঘামতে থাকে আরশাদ মাহমুদ। 

মগজের গহন গভীর থেকে কেউ জানান দেয়, যা’ ঘটতে যাচ্ছে তা’ ভয়ঙ্কর। খুব ভয়ঙ্কর! 

মুঠোয় গাড়ি আর গেরাজের চাবি। দুটোই ঘামে ভিজে গেছে। দুর্বলভাবে মাথা ঘোরায় সে জানালার দিকে। 

বাইরে এপ্রিলের ঝরঝরে সকাল। তেরছা হয়ে রোদ ঢুকছে ঘরের ভেতর। গা জুড়িয়ে যাওয়া আরামের বাতাস। গানের একটি কলি মনে করতে চেষ্টা করে সে। পারছে না। গেরাজের কাছাকাছি চলে আসার পর আবার বাইরে খোলামেলা প্রকৃতির দিকে তাকায়। নীল আকাশে দু’তিন ফালি মেঘের টুকরো ভেসে আছে। এত নীল আকাশ! গেটের ধারে সার ধরে দাঁড়ানো দেবদারুর পাতা স্থির থাকলেও ফেন্স-এর দু’দিকে যে চার পাঁচটি শিরীষ অ্যাকেসিয়া, সে’গুলোর ডাল আর পাতা ভোরের মৃদু বাতাসে অস্থির হয়ে ওঠছে। তখন মনে পড়ে যায় গানের কলিগুলো, একটু আগে যেগুলো মনে করতে পারছিল না,  



 বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ।

আনে আমার মনের কোণে সেই চরণের ছন্দ।

স্বপ্ন শেষের বাতায়নে হঠাৎ-আসা ক্ষণে ক্ষণে

আধো-ঘুমের-প্রান্ত-ছোঁয়া বকুলমালার গন্ধ....


শান্ত বৈশাখের সকালটাকে কি কেউ কোনোদিন খেয়াল করেছে? খুশি মনে চারদিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে ও’। জগত সংসারে দিন ও রাত্রিতে কতরকমে যে কত ভাবের খেলা চলছে, সে সবের খোঁজ কে রাখে! বৈশাখের এই অমৃত সকাল সারা জীবন তার মনে দাগ কেটে থাকবে। ‘আধো-ঘুমের-প্রান্ত- ছোঁয়া বকুলমালার গন্ধ...’ ওহ্!     

এতক্ষণ যে ভয়ের অনুভুতি সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল এখন আর তা’ নেই। 

গেরাজের কাছাকাছি চলে এসেছে। গেটের তালায় আলতো স্পর্শ বুলিয়ে পকেট থেকে চাবি বে’র করেই আবার ঘামতে শুরু করে আরশাদ মাহমুদ। ভয়ের শিরশিরে অনুভূতি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। গেরাজের ভেতরেই কি সেই ভয়ের উৎস? দুর্বলভাবে ঘাড় ফিরিয়ে কলাপ্সেব্ল গেট দিয়ে ভেতরে তাকায়। নিরীহ গাড়িদুটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চাবি তালায় লাগানোর সময়ই বুঝে ফেলে এই তালা আজ সে খুলতে পারবে না। 

সারা জীবনভর চেষ্টা করে গেলেও সম্ভব হবে না। বোকার মতো কিছুক্ষণ গেটের কাছে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে পরে মরিয়া হয়ে চাবি ঘোরায়। 

হয় না।  

হাত কাঁপছে। আরেকবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি? কেউ কি তাকে ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে। 

তার শুভাকাক্সক্ষী অদৃশ্য কেউ? 

উঁহু। 

ঘরে ফিরে গিয়ে আরেক কাপ চা খাওয়া যায়। 

আরশাদ মাহমুদ ঘুরে দাঁড়িয়ে তার ডুপ্লেক্স বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়। কয়েক পা চলার পরই আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। কেউ বাধা দিচ্ছে। অবচেতন মনের ভেতর ঢুকে পড়েছে কেউ। জানান দিচ্ছে, যেও না। সেখানে বিপদ। বিরাট বিপদ! 

বাড়ির গেট খোলে রাস্তায় নেমে আসে সে। রীতিমত কাঁপছে। ঠাÐা আঠালো ঘামে শীতল গা। 

কোথায় যাওয়া যায়? 

বাসা থেকে বেরিয়েছিল অফিসে যাবে বলে। একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছিল। এখন আর যেতে ইচ্ছে করছে না। গাড়ি নিয়ে আসা হয়নি।  কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। পথের ধারের শিরীষ জারুলের ডালে বাতাস বইছে। গা ছাড়া ভাব নিয়ে মিশন রোড ধরে হেঁটে হেঁটে সোজা চলে আসে মেন্দিবাগে। 

ঘুমের শহর আস্তে আস্তে জাগছে। মানুষজনের চলাফেরা শুরু হয়েছে মাত্র। বাজওয়ার পাশে হেরিটেজ টাওয়ারে তার অফিস। সেখানটা পেছন ফেলে এসেছে কখন। মেন্দিবাগের শেষ সীমানায় এসে দূরের কালো পীচের সড়ক দিয়ে দৃষ্টি অনেক দূর ছড়িয়ে দেয়। কোথায় গিয়ে মিশেছে এটি? 

একটি কালো ক্লুগার স্যাৎ করে পাশ কেটে চলে গেল। 

ড্রাইভিং সিটে নজরুলকে দেখতে পাচ্ছে। ডান হাত স্টিয়ারিং হুইলে। বাঁ হাত দিয়ে উস্কোখুস্কো চুল পাট করতে করতে দ্রুত চলেছে। নজরুলের অফিস তো এদিকে নয়। তা’হলে এত সকালে কোথায় চলেছে! 

নদীর তীর ধরে বাঁয়ে ছোট্ট সুন্দও পথ। শান্ত আর বেশ নিরিবিলি। আরশাদ মাহমুদ ও’দিকে পা বাড়ায়। দুয়েকজন পরিচিত লোকের দেখা মিলছে। না দেখার ভান করে কাটিয়ে দেয়। কথা বলতে গেলেই বিপদ। হাজারো প্রশ্ন আর খেজুরে-আলাপের যন্ত্রণায় মরতে হবে। তারচেয়ে চুপেচাপে হেঁটে চলে যাওয়া ভালো। নদী থেকে আরামের বাতাস এসে গায়ে আছড়ে পড়ছে। বিন্না বনে র্শর্শ শব্দ। দুপুর হওয়ার আগেই শঙ্খচিল নীল আকাশে পাখা মেলেছে। তার চলার পথের দু’দিকে ভাটফুল ফোটে রয়েছে। বাতাসের দোলায় নড়ছে ও’গুলো। ঘামে ভেজা আঠালো গা’ শুকিয়েছে অনেক আগে। কিন্তু বুকের ভেতর গভীরভাবে বাসা-বেঁধে-থাকা সেই হিমশীতল আতঙ্ক এখনও তাড়িয়ে ফিরছে।

দৌঁড়াও আরশাদ মাহমুদ, জোরে, আরও জোরে। পালাতে হবে তোমাকে। মগজের কোন জায়গা থেকে কেউ বলে ওঠে।

পারছি না। অসহায়ভাবে বিড়বিড় করে।

পারতে হবে। উপায় নেই। এই পথ, নদী, এ’ নিসর্গ, লোকালয়, এ’গুলো থেকে অনেক দূরে-  কে? কে? কথা বলে! 

দুর্বলভাবে মাথা হেলায় ও। ইকড় বাজালি বনের ফাক ফোঁকর দিয়ে পথ চলে গেছে আরও গভীরে। আরশাদ মাহমুদ ওইদিকে মাথা গলিয়ে দেয়। কপালে আর নাকে, ঘাড়ের পেছনে, শিরদাঁড়ার নলির বাইরের চামড়ায় চিকন ধারায় চিন্চিনে ঘাম আবার দেখা দিয়েছে। কারো নিঃশ্বাস যেন ঘাড়ের কাছে গরম ছাড়ছে। গরম না। ঠাÐা হিমশীতল। বরফের মতো।  দৌঁড়াতে চেষ্টা করতেই হোঁচট খায়। উঠে দাঁড়িয়ে এবার ঊর্ধ্বশাসে ছুটতে থাকে। একটা ছাই রঙা নিশান গাড়ি আসছে পেছন পেছন। ওটাতেই কি সেই অমোঘ নিয়তি! পিস্তল কিরিচ চপারের খেলা? 

প্রায় দৌঁড়োনোর মতো ছুটতে থাকে আরশাদ মাহমুদ। 

কতদূর এসেছে জানে না। 

 গোদারা দিয়ে নদী পার হয়েছে একদল অচেনা লোকের সাথে। 

জালালপুরের কাছাকাছি আসতেই সম্বিৎ  ফেরে। 

শরীর অসাড় হয়ে আসছে। জুতো আর মোজার ভেতরে পায়ের বুড়ো কানি আঙ্গুলে স্পষ্ট অনুভব করছে বড় বড় ফোঁসকার যন্ত্রণা। একটা জারুলের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে ভাবতে চেষ্টা করে, কী হয়েছে তার? সে কি ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে! পাগল হয়ে যাচ্ছে? সবি স্বপ্ন অথবা হেলুসিনেশন! 

জুতোমোজা খুলে ফেলে। আবার ঠাÐা বাতাস বইতে শুরু করেছে। রোদ তেতে ওঠলেও বাতাসের স্পর্শে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। নদীর টল্টলে স্বচ্ছ জলে দু’টি নৌকা ভেসে চলেছে। সাদা পালে বাতাস লেগেছে। সাবলীল গতিতে র্তর্ত করে এগিয়ে চলেছে ও’দুটো। ইঞ্জিন-নৌকার আগ্রাসী যুগে পালের নাওয়ের দৃশ্য আজকাল কল্পনা করা কঠিন। মুগ্ধ চোখে আরশাদ মাহমুদ সেদিকে তাকিয়ে থাকে। সড়কের দু’দিকে জারুল শিসুগাছের ঠাÐা ছায়া। বিন্না আর ঘাসবনের ওপারে ধানের ক্ষেত। একটা সোদা গন্ধ এসে লাগছে নাকে। আরও দূরে দৃষ্টি ছড়ালে নীলাভ ছায়া-ছায়া গাঁয়ের রেখা ভেসে ওঠে চোখে। ভালো লাগছে। ভয়ের অনুভূতি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে মন থেকে। 

দুটো থুই আর বুলবুলি এসে বসেছে জারুলের ডালে। সেখানে নেচে নেচে কিচিরমিচর করছে। নিঃসঙ্গ বুলবুলি ছোট্ট ডালে বসে একমনে গান গেয়ে চলেছে। শিরীষ আর শিসুগাছের পাতা বাতাসে দোল খাচ্ছে।

গাছের গুড়ির হেলান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গভীর মমতায় চারদিকে তাকায় আরশাদ মাহমুদ। নীল আকাশ থেকে সোনা গলে পড়ছে। আশির্ব্বাদ ঝরাচ্ছে সকলখানে। শান্ত নিরিবিলি গাঁয়ের এই পীচ সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হয় পৃথিবী এত সুন্দর! কালো বিটুমিনের পীচের সড়ক পূব দিকে ঘুরে কোথায় যে হারিয়ে গেছে কে জানে! বাঁ’দিকের সড়ক দিয়ে হাঁটা লাগালে আবার সেই গোদারা, মেন্দিবাগ, বাজওয়ার আকাশছোঁয়া টাওয়ার, নয়াসড়ক, শাহী-ঈদগাহ্, তারপর স্বপ্নের মতো ডুপ্লেক্স, নিজের বাসায় পোঁছে যাবে। 

ভয় আর আতঙ্ক কখন দূর হয়ে গেছে। শুধু বোধের অতীত কী এক শূণ্যতায় বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। বিষণœ দৃষ্টিতে পেছনের পথের দিকে তাকায়। সে কি ফিরে যাবে এই পথে? কে যেন বলেছিল, ফেলে-আসা পথ দিয়ে ফিরে যাওয়ার মতো বিড়ম্বনা আর নেই। 

পাতলা এলোমেলো চুলে আঙ্গুল চালিয়ে সেগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে সমুখে বিস্তৃত পথের দিকে পা’ বাড়ায় আরশাদ মাহমুদ। 

পেছনে পড়ে থাকে ঘরে ফেরার পথ।

বুঝে ফেলেছে সে, আজ সকালেই তার মৃত্যু হয়েছে।                   

        

                                                ----  

           


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)