অণুগল্প
বিধির লিখন, বনসাই, লাল পিঁপড়ের বন্দিজীবন, লাশ, স্বেচ্ছায় কারাবরণ, চুম্বক, জায়গা ।
বিধির লিখন
মৃতদেহটি এখনো হাসপাতালে পড়ে রয়েছে। লাশ গ্রহণের জন্য ছেলেকে খবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার দেখা নেই।
জুয়েল জামা-কাপড় পড়ছে। দ্রæত যেতে হবে। সুমনা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে পার্কে। আগেই যেতে পারত কিন্তু হঠাৎ করে বাবার মৃত্যু সংবাদটা ফোনে শুনতে পেলো। সিদ্ধান্ত নিতেই এক ঘন্টা দেরি হয়ে গেল। সুমনা হয়তো আজকে বিয়ের ডেট ফাইনাল করবে। এমন শুভক্ষণে বাবার লাশ গ্রহণ করে মরবে নাকি ও?
জুয়েল পার্কে পৌঁছেই সুমনাকে জড়িয়ে ধরে। ঠোঁটে-মুখে চুমু খায়। আহ্লাদের স্বরে বলে, একটু দেরি হয়ে গেল ল²ীটি! বলো কী বলবে?
এমন সময় সুমনার হাঁচি চলে আসে। হাঁচির সর্দিকণা ছিটকে এসে জুয়েলের নাকে-মুখে পড়ে। জুয়েল পকেট থেকে রুমাল বের করে সর্দিকণাটুকু মুছতে মুছতে বলে, শরীর খারাপ করছে নাকি?
হ্যাঁ। শ্বাসকষ্টও হচ্ছে মাঝে মাঝে। সুমনা জোরে জোরে নিঃশ্বাস টেনে বলে।
কবে থেকে।
এই তো সপ্তাহখানেক।
ডাক্তার দেখিয়েছ?
হ্যাঁ।
কী বলেছে?
ঠিক বলতে পারছে না। তাই ভাবছি তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো। চারিদিকে যা অবস্থা। করোনা-টরোনা হলো...
ছি! এমন কথা বলতে নেই। তোমার স্বাভাবিক সর্দিকাশি হয়েছে। জুয়েল সুমনার ঠোঁটে আঙুল রেখে ওকে থামিয়ে দিয়ে কাছে টেনে নেয়।
সুমনা ফিসফিসিয়ে বলে, তাই যেন হয়। চলো এখন। সুমনা জুয়েলের বাহু থেকে মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়।
সুমনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর ডাক্তার ওকে করোনা রোগী বলে সনাক্ত করেন। জুয়েলকে বলেন, আপনিও হয়তো আক্রান্ত হয়েছেন। কাল আপনারও টেস্ট হবে। এখন থেকে আপনারা দুজনই হাসপাতালে থাকবেন।
ডাক্তারের কথা শুনে জুয়েল নির্বাক হয়ে যায়। মনের অজান্তে চোখ দিয়ে অশ্রæ গড়িয়ে পড়তে থাকে। ভাবেÑ নিজেকে সেফ রাখার জন্য জন্মদাতা পিতার লাশ গ্রহণ করলাম না। অথচ...
বনসাই
আশরাফ পিন্টু
এম এ পাস করে দীর্ঘ চার বছর বেকার থাকার পর শরিফ এক রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে দিলো। দলটি বর্তমানে ক্ষমতাসীন। এ দলের এমপি সন্ধান চৌধুরি ওকে চাকুরি দেবে বলে স্বপ্ন দেখিয়েছে।
শরিফ ছাত্রজীবনে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল না। পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকত সবসময়। রেজাল্টও ভালোÑ এমএ-তে ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে। কিন্তু রেজাল্ট ভালো হলে কী হবেÑআজকাল টাকা আর রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া কি চাকুরি হয়? তাই দীর্ঘ চার বছর চাকুরির চেষ্টা করে কোনো ফল না পেয়ে শেষমেষ ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।
সন্ধান চৌধুরি এমপি থেকে মন্ত্রী হবার জন্য বেশ দৌড়-ঝাঁপ করছেন কিন্তু সফল হতে পারেননি এ পর্যন্ত। তার দলে এলাকার অনেক ছেলে-বুড়ো আছে কিন্তু বুদ্ধিমান কেউ নেই। সবাই মা-গোঁসাই ধরনের। খালি মাথা নেড়ে জী জী করা ছাড়া কোনো প্রতিভা দেখা যায় না। সামনে এগোনোর জন্য মেধাবীদের বুদ্ধি-পরামর্শ প্রয়োজন পড়ে। শরিফ মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্তও বটে; এ কারণেই ওর ওপর নজর পড়েছে তার।
দেখতে দেখতে প্রায় দুই বছর পেরিয়ে যায়। সন্ধান চৌধুরি এমপি থেকে মন্ত্রী হয়েছেন। শরিফ একদিন মন্ত্রী সাহেবকে চাকুরির কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্ত্রী সাহেব মৃদু হেসে বলেন, তোমার বুদ্ধি-পরামর্শ আমার বেশ কাজে লেগেছে। তোমাকে এমন চাকুরি দেবো- যেখানে তুমি হবে ডিপার্টমেন্টাল হেড। তোমার আন্ডারে অনেক লোকজন কাজ করবে।
কথাটি শুনে শরিফের মনটা ভরে ওঠে। তৎক্ষণাৎ মন্ত্রী সাহেবকে কদমবুচি করে।
একদিন মন্ত্রী সাহেব শরিফকে একটি নতুন উদ্যানে নিয়ে যান। উদ্যানটি তার বাড়ির পিছনে পরিত্যক্ত জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে। এটি সচরাচর উদ্যানের মতো নয়। চারপাশটা তারের নেট দিয়ে ঘেরা। মাথার উপরেও নেট। চিড়িয়াখানায় পাখিরা যেমন নেটেঘেরা গাছ-গাছালির ভিতরে বসবাস করে এটি দেখতে অনেকটা তেমন।
উদ্যানের গাছের দিকে চোখ পড়তেই শরিফ চমকে ওঠে। এ যে সবই টবে বসানো ক্ষুদ্রাকৃতির গাছ! বিশাল বটগাছকেও টবে লাগানো হয়েছে। এগুলো কেমন করে হলো?
সন্ধান চৌধুরি শরিফকে গাছগুলোর প্রতি অবাকনয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলেন, এগুলো মনে হয় আগে কখনো দেখোনি তুমি? এ সবই হচ্ছে বনসাই উদ্ভিদ। আমি শখ করে বাগানটি গড়ে তুলতে চাচ্ছি। ওই দ্যাখো কত মালী নিযুক্ত করেছি। ওরাই এগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে যোগার করে এনেছে। তুমি হবে আমার এই বনসাই ডিপার্টমেন্টের প্রধান।
শরিফ কর্তব্যরত মালীদের দিকে তাকায়। প্রায় সকলেই ওর পরিচিতÑ শিক্ষিত বেকার; যাদের মন্ত্রীর মিছিলের সর্বাগ্রে দেখা যায়। এখন এখানে
একাগ্রমনে বনসাইয়ের পরিচর্যা করছে।
লাল পিঁপড়ের বন্দিজীবন
আশরাফ পিন্টু
জগু ঘুম থেকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত বারোটা। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে ওয়াশ রুমে ঢোকে। হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক চেঞ্জ করে নাস্তার টেবিলে বসে।
বাইরে থেকে পাঁচটার দিকে রুমে এসে বিছানায় শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়েছিল। রুমে রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই। একা একটি রুমে থাকে ও। ভারী খাবারগুলো বাইরে খেয়ে এসে রুমে এসে মাঝে মধ্যে হালকা নাস্তা করে। নাস্তার মধ্যে চা-বিস্কুট আর দুধে ভেজানো পাউরুটি ওর প্রিয় খাবার। বেশ ক্ষুধা পেয়েছে, শুধু চা-বিস্কুট খেলে হবে না; দুধে ভেজানো পাউরুটি খেলে কিছুটা পেট ভরবে।
দুধে চিনি মেশানোর জন্য টেবিলের কোণে রাখা কাঁচের বোয়ামের দিকে জগুর নজর পড়তেই দেখেÑ বোয়ামের মুখটি হা করে খোলা রয়েছে। চারপাশে কিছু চিনি ছড়িয়ে- ছিটিয়ে রয়েছে; সেগুলোতে কিছু লাল পিঁপড়ে লেগে আছে। বোয়াম থেকে চামচ দিয়ে চিনি বের করতে গিয়ে জগু লক্ষ্য করে ভেতরেও কিছু লাল পিঁপড়ে ঢুকে পড়েছে। জগু চামচ দিয়ে পিঁপড়েমুক্ত কিছু চিনি বের করে পেয়ালার দুধে মেশায়। এরপর কাটা পাউরুটির টুকরোগুলো দুধে ভিজিয়ে খেতে থাকে। খাওয়া শেষে সে ঢাকনা দিয়ে বোয়ামের মুখটি ভালো করে এঁটে দেয়। কিন্তু ভেতরে কিছু পিঁপড়ে থেকেই যায়। জগু কী মনে করে বোয়ামের ভেতরে আটকেপডা পিঁপড়েগুলোকে দেখতে থাকে। একটি-দুটি পিঁপড়ে বার বার বোয়ামের মুখের কাছে এসে ফিরে যাচ্ছে। বাইরে আসার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না কিছুতেই। কিছু পিঁপড়ে অবশ্য চিনি পর লেগেই রয়েছে আর কিছু পিঁপড়ে সীমাবদ্ধ জায়গার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
জগু আর দেরি করে না। রাত দুটোয় অপারেশন। আন্ডারগ্রাউন্ডের বাকী সদস্যরা নেতার বাগান বাড়িতে ওর অপেক্ষায় রয়েছে। গ্যাংলিডার ও। জগু দ্রæত রুম থেকে বাগান বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়।
লাশ
আশরাফ পিন্টু
লাশ নিয়েই সে ব্যস্ত থাকে সব সময়। প্রতিদিন লাশ আসে পাঁচ-সাতটা করে। কখনো বেশি; যখন অ্যাকসিডেন্ট হয়-ফাটা, থেতলে যাওয়া বহু লাশ আসে। কখনো বস্তাবন্দী গলিত দুর্গন্ধময় লাশ। স¤প্রতি করোনায় মারা যাওয়া দুই-একটা লাশও যোগ হচ্ছে।
বুদ্ধ ডোমের প্রতিদিন লাশ নিয়েই কারবার। ডোমগিরি তার পেশা। অন্যান্য পেশাদারের মতোই নিজ দায়িত্ব পালন করে সে। লাশ নিয়ে কোনো রূপ ভাবোদয় হয় না তার। মৃত্যু যেন তার কাছে এক বোতল বাংলা মদ; নেশায় চুর হলে এক রকম, আবার নেশা কেটে গেলে অন্যরকম।
সেদিন সন্ধ্যা অবধি কোনো লাশ আসেনি মর্গে। সারাটা দিন বাংলা খেয়েছে আর ঝিমিয়ে কাটিয়েছে বুদ্ধ ডোম। হঠাৎ রাত ন'টার দিকে একটা লাশ আসে। এক কিশোরীর লাশ। পরনের পাজামায কেমন ছোপ ছোপ লাল রক্তের দাগ। লাশটির মুখ দেখেই সে চমকে ওঠেÑ এ যে তারই মেয়ে বেলারানি! কেমন করে এমন হলো?
মেডিকেল রিপোর্ট থেকে জানা যায়Ñ বেলারানিকে কতিপয় যুবক ধর্ষণের পর হত্যা করেছে।
বুদ্ধ ডোম নিথর হয়ে যায়। নিজেকে লাশ ছাড়াআর কিছু মনে হয় না ।
স্বেচ্ছায় কারাবরণ
আশরাফ পিন্টু
বড়মেয়ে এসে মায়ের কাছে নালিশের সুরে বলল, মা, আমি আর স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াব না; কারাগারে যেতে চাই।
মেয়ের কথা শুনে মা অবাক হলেন। মেয়ের বেশ বয়স হয়েছে, নাতি-নাতনি হয়েছে। তবে ওর সমস্যা কি? বৃদ্ধ মা মেয়ের দিকে øেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কি হয়েছে মা?
মেয়ে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো, আমার স্বকীয়তা নষ্ট হচ্ছে।
মা কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় ছোটছেলে এসে বললো, মা, বড়'পার সাথে আমিও কারাগারে যাবো।
মা বুঝলেন- ছেলেটা আপার খুব ভক্ত; সেজন্যই বুঝি...
কিন্তু তার ভুল ভাঙল যখন বড়ছেলে এবং মেজছেলে এসে বললো, আমরা সকলেই কারাগারে যেতে চাই।
মা এবার বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। কি জবাব দেবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি নাÑ তোমরা সবাই একসঙ্গে কারাগারে যেতে চাচ্ছো কেন?
বড়ছেলে বললো, মা, এ যুগে স্বাধীনভাবে চলাফেরা নিরাপদ নয়। কাগজহীন যুগে অবাধ স্বাধীনতার জন্য আমাদের অহরহ পরিবর্তন ঘটছে। তাই কারাগারে গেলে আমরা এর হাত থেকে রক্ষা পাবো এবং কাল থেকে কালান্তরে বেঁচে থাকতেও পারব।
বড়ছেলে প্রবন্ধের কথাকে মেজছেলে ছোটগল্প, ছোটছেলে অণুগল্প এবং বড়মেয়ে কবিতা সমর্থন জানালো।
সবার কথা শুনে মা সাহিত্য চিন্তা করলেনÑ ওরা ঠিকই বলেছে। ক্ষণস্থায়ী কাগজহীন (সফটওয়্যার) যুগের কবল থেকে রক্ষা করতে হলে ওদের সবাইকে কাগজের কারাগারে বন্দী করতে হবে।
চুম্বক
আশরাফ পিন্টু
ছাড়ো! কী করছো? দাদু দেখে ফেলবেন ।
দাদু-দাদি ও রুমে ঘুমোচ্ছেন।
না, জেগে আছেন। ছাড়ো তো...
গভীর আলিঙ্গনরত শাহিনকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে শিরিন। কিন্তু শাহিন ছাড়ে না। চুম্বকের মতো সেটে থাকে শিরিনের বুকের পর।
শাহিন ও শিরিন নব বিবাহিত দ¤পতি। শাহিনের বাবা-মা আমেরিকায় থাকেন। শাহিনের বিয়ের জন্য দেশে এসেছেন। গতকাল তারা আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন। শাহিনও কদিন শশুর বাড়ি বেরিয়ে বৌকে নিয়ে আমেরিকায় চলে যাবে। বাড়িতে পাহারাদার হিসেবে শুধু বৃদ্ধ দাদা-দাদিমা পড়ে থাকবেন।
অনেক দিন পরে চুম্বকটি ফিরে পেলাম রে দাদু। তোর দাদির খাটের নিচে পড়ে ছিল।
দাদুর কথায় শাহিন ও শিরিন দুজনেই চমকে ওঠে। দাদু হঠাৎ এ রুমে ঢুকবে তা কল্পনাও করেনি ওরা। আলিঙ্গনরত শাহিনকে বুক থেকে সজোরে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয় শিরিন। অনাবৃত শরীরে কাপড় টেনে নিয়ে দ্রæত ওখান থেকে কেটে পড়ে সে।
হ্যাঁ দাদু, হঠাৎ করে চুম্বকের কথা মনে হলো কেন? শাহিন স্বাভাবিক হয়ে দাদুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে।
কলেজে যখন ছাত্র-ছাত্রীদের প্যাকটিকেল করিয়েছি তখনকার চুম্বক এটি। বলতে পারিস প্রথম প্যাকটিকেল ক্লাস শুরু করেছিলাম এই চুম্বক দিয়ে। কী আকর্ষণ ছিল তখন! এখন তেমন আকর্ষণ নেই। দাদু একটি মরিচাপরা লোহার শলাকার গায়ে চুম্বকটি ঠেসে ধরে।
কিন্তু চুম্বকের তো এমন হবার কথা নয়। শাহিন একটু অবাক হয়।
না দাদু, সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই তার ক্ষমতা হারায়।
একেবারেই কি ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে?
বোঝা যাচ্ছে না। এ লোহার দÐটি মরিচাধরা। চকচকে একটি দÐ খুঁজতে হবে।
দাদু, আমি একটু বাইরে বেরুবো। দাদি তো ঘুমোচ্ছেন। বোর লাগলে শিরিনের সাথে গল্প করবেন। শাহিন অজুহাত দেখিয়ে কেটে পড়ে।
শাহিন চলে যাবার পর দাদু একটি চকচকে লোহার শলাকা খুঁজতে থাকেন। শিরিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজগোজ করছিল। দাদুকে লক্ষ্য করে বলে ওঠে, কী খুঁজছেন দাদু?
একটি চকচকে লোহার শলাকা।
কী করবেন?
দেখবো পুরনো চুম্বকটি কোনো কাজ করে কি না।
দাদুর কথা শুনে শিরিন মনে মনে হাসে বুড়ো হলে বুঝি মানুষের বুদ্ধি-সুদ্ধি কমে যায়। প্রকাশ্যে বলে, দাদু, আমার কাছে পাঁচ টাকার কয়েন আছে। কয়েনে কাজ হবে?
হ্যাঁ, হতে পারে।
শিরিন ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি পাঁচ টাকার কয়েন বের করে নিয়ে এসে দাদুর হাতে দেয়। দাদু হাতে নিয়ে চুম্বকটি কয়েনের গায়ে ছোঁয়ানোর আগেই খপ করে ওর সাথে সেটে যায়। দাদু মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলেন, এখনো ঠিক আছে।
এরপর দাদু কয়েনটি শিরিনের হাতে ফেরত দেবার জন্য এগুতেই ওর চোখে চোখ পড়ে যায়। অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে শিরিনকে। এত সুন্দরী তার নাতবৌ! আগে তো ভালো করে লক্ষ্য করে নি। দাদু কয়েনটি হাত বাড়িয়ে শিরিনের দিকে এগিয়ে ধরে। শিরিন মিষ্টি হেসে বলে, থাক দাদু, ফেরত দিতে হবে না।
না, তোমার জিনিস; নাও। আমি আরেকটা খুঁজে নেবো।
থাক না দাদু ।
না। দাদু শিরিনের হাতের মুঠোয় কয়েনটি জোর করে পুরে দিতেই ওর কোমল হাতের ¯পর্শে দাদুর ঝিমিয়েপরা রক্তে কেমন যেন শিহরণ জেগে ওঠে। এত নরম-কোমল হাত! দাদু কয়েনটি হাতে পুরে দেবার কথা ভুলে গিয়ে হাতে হাত ঘষতে থাকেন। শিরিন লজ্জা পেয়ে মুখ অবনত করে।
দাদু হঠাৎ শিরিনকে অবাক করে দিয়ে ওকে জাপটে ধরে চৃুমু খেতে থাকে। চুম্বকের মতোই সেটে থাকে ওর দেহের পর।
আচম্বিতে দাদুর এমন ব্যবহারে শিরিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। ওদিকে দাদুর ফিরিয়ে দেওয়া কয়েনটি হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে ‘টং’ শব্দ করে ওঠে।
জায়গা
আশরাফ পিন্টু
‘বাবা, এটা ড্রয়িং রুম, ওটা কিচেন রুম, এটা তোমার নাতি স্বননের পড়ার রুম আর এটা তোমার রুম।’ সদ্য সমাপ্তকৃত ফ্লাট বাড়িটির রুমগুলো বাবাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিল ছেলে জুবায়ের আহমেদ।
জুবায়ের আহমেদ একজন ইঞ্জিনিয়ার। নিজেই বাড়িটির নকশা করেছে। বাবা জামিল আহমেদ প্রায় দশ বছর আগে চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। চাকুরির শেষের দিকে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে ঢাকা শহরের এই জায়গাটি কিনেছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে বাড়ি করতে পারেননি। ছেলেকে মানুষ করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। সে আশাও পূরণ হয়েছে তার। চাকুরি জীবনের সততার পুরস্কার স্বরূপ তার ছেলের চাকুরি হয়েছে নিজঅফিসে। নিজে ক্লার্কের চাকুরি করায় সারাজীবন ভাড়া বাড়িতে থাকতে হয়েছে তাকে আর ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চাকুরির ১০ বছরের মধ্যেই এমন একটি বাড়ি করে ফেলল! গর্বে বুক ভরে ওঠে জামিল আহমেদের।
জামিল আহমেদ ছেলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে রুমগুলো দেখার পর বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ান। আনেক উঁচু থেকে নিচের দিকে তাকান। বলেন, বাগানের জন্য কোনো খালি জায়িগা রাখিস নি বাবা?
না বাবা। ঢাকা শহরে কেউ ফাঁকা জায়গা রাখে নাকি? যা দাম! জুবায়ের জবাব দেয়।
কিন্তু একটু ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন ছিল রে!
কেনো বাবা?
আমার কবরের জন্য। তোর মা মারা যাবার পর গোরস্থানে কবর দেওয়া হয়েছিল। মাত্র এক বছর হয়েছে কবরের চিহ্নমাত্র নেই; ভেঙে দিয়েছে ওরা। একজন মানুষ সারাজীবন গাধার মতো খেটে এত কিছু করে; মৃত্যুর পর নিজবাড়িতে ঠাঁই তো হয়ই না, এমন কি আজকাল গোরস্থানও বেশিদিন রাখে না। সত্যি মৃতব্যক্তির জন্য জায়গার খুব অভাব। জামিল আহমেদ একটু থেমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মৃত্যুর পর আমি আমার বাড়িতেই থাকতে চাই রে খোকা।
জুবায়ের আহমেদ কি জবাব দিবে ভেবে পায় না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বাবাকে অবাক করে দিয়ে বলে, এ বাড়ি তো তোমার নয়। আমারও নয়। এখানে জায়গা রাখব কীভাবে?

