শিক্ষা সেমিনার প্রবন্ধ সংকলন

OHS
By - Imran Ali Shagor
0

শিক্ষা সেমিনার প্রবন্ধ সংকলন




শিক্ষার আদর্শ

অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান


শিক্ষার একটি আদর্শগত ভিত্তি আছে। সেই আদর্শগত ভিত্তি মূলত ধর্মের ভিত্তি। আমরা জানি যে ধর্ম মানুষকে অনুশাসন দেয়, ধর্ম মানুষকে নির্ভরতা দেয়, ধর্ম মানুষকে আদর্শ সম্পর্কে সচেতন অর্থাৎ মানুষ যে পৃথিবীতে জীবন যাপন করবে সেই জীবন যাপনের অধিকার তার অর্জন করতে হবে। এই অধিকার সে অর্জন করে বিজয়ের সাহায্যে, বিশ্বাসের সাহায্যে এবং অন্তগূঢ় চৈতন্যের সাহায্যে। যদি আমাদের বিশ্বাস না থাকে এবং অন্তগূঢ় কোন চৈতন্য না থাকে তাহলে শিক্ষা শুধু সাধারণ অবস্থায় পর্যবসিত হবে এবং সে শিক্ষার দ্বারা একটি জাতি কখনও উপকৃত হবে না। মনে রাখতে হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা, মানুষকে পৃথিবীর জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা, মানুষকে তার জাতি এবং মানুষকে পৃথিবীর সঞ্চয় সম্পর্কে সাবধান করা। এটা না হলে শিক্ষার আদর্শ হয় না অথচ ধর্ম এই আদর্শগুলো আমাদের শিক্ষা দেয়। অথচ পাশ্চাত্যের যে শিক্ষা আমাদের দেশে এসেছে সে শিক্ষার মধ্যে ধর্মের এই ভিত্তি নেই। আমরা ইংল্যান্ডে লক্ষ্য করি, ইংল্যান্ডের চার্চ প্রশাসনের অধীনে যে সমস্ত স্কুল আছে তাদের একটা ধর্মীয় ভিত্তি আছে শিক্ষার কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে এই ধর্মীয় ভিত্তি তারা স্বীকার করেননি। যার ফলে জ্ঞান লাভটা শুধুমাত্র জ্ঞান লাভেই পর্যবসিত হয়েছে। জ্ঞানলাভের প্রয়োজনটা কী তা কিন্তু ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। জ্ঞানের একটা প্রয়োজন হচ্ছে মানুষ যথার্থ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা, জ্ঞানের একটা প্রয়োজন হচ্ছে মানুষকে পূর্ণাবয়ব মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা। জ্ঞানের একটা লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। আমরা জানি ধর্ম আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। তার মধ্যে প্রধান শিক্ষা হচ্ছে মানবতাবোধের শিক্ষা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, মানুষ মানুষে হৃদ্যতা, মানুষে মানুষে সম্প্রীতি এগুলো ধর্মের মাধ্যমেই আমরা শিক্ষা লাভ করে থাকি। এটা না হয়ে শিক্ষাটা যদি হয় শুধুমাত্র প্রয়োজনের জন্য, অর্থাৎ জীবন ক্ষেত্রে কর্মের উপযোগী হওয়ার জন্যই যদি শিক্ষা হয় তাহলে মানুষ এই মেটেরিয়াল পৃথিবী যেটা, এই যে রূঢ় বাস্তবজগৎ সেই জগতের প্রয়োজনের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত রাখবে। নিজের স্বার্থের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখবে। সকল মানুষের জন্য সে কল্যাণকামী হবে না। এই যে, স্বার্থপরতা সেটা এক প্রকার স্বার্থপরতার শিক্ষা দেয় কিন্তু ধর্ম স্বার্থপরতা শিক্ষা দেয় না। ধর্ম স্বার্থবিমুক্ত শিক্ষা দেয়। সেই কারণে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্রিটিশ আমলের কাঠামোকে ঠিক রেখে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা গঠন করা হয়েছিল এবং পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোকে অবিকল রেখে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সুতরাং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মূলত কোন পরিবর্তন আসেনি। দেশের প্রয়োজন ও ধর্মের প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অনেকে মনে করতে পারেন যে, শিক্ষার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা যদি বিচ্ছিন্নভাবে প্রবেশ করে তাহলে ধর্মীয় শিক্ষাটি একটি ভিন্ন উপকরণ হিসাবে লোকেরা গ্রহণ করবে। যেমন একজন ইতিহাস পড়ছে আবার সে ভূগোলও পড়ছে আবার সে-ই-ইংরজি পড়ছে আবার সে অংক করছে। এই ভূগোলের সঙ্গে ইতিহাসের অথবা ইতিহাসের সঙ্গে অংকের এগুলোর কোন সম্পর্ক নাই। পরস্পর কোন সম্পর্ক নাই। এগুলো প্রতিটি বিদ্যাই যেন স্বয়ং সম্পূর্ণ। তেমনি ধর্মীয় শিক্ষা যদি এর সঙ্গে যুক্ত হয় সেটাও একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন শিক্ষা হিসাবে এর সঙ্গে যুক্ত হবে। বিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হয়ে ধর্মীয় শিক্ষাটাও পূর্ণাঙ্গ হবে না এবং অন্য শিক্ষাটাও পূর্ণাঙ্গ হবে না।




 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মের ভূমিকা

মুহাম্মদ কুতুব

অনুবাদ : মোহাম্মদ আবদুল মান্নান

পৃষ্ঠা - ৩৯, ৫১, ৫২


গোটা মানবজাতিকে একটি স্ববয়ংসম্পূর্ণ সুস্থ ব্যবস্থার অধীনে গড়ে তোলা ইসলামী শিক্ষার লক্ষ্য।

ইসলামী বিদ্যায় যে দৃষ্টিকোণ ও পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, তার জন্ম ইসলামী বিশ্বাসের পরিবেশে এ পদ্ধতিটি অন্যান্য ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে অন্যান্য ইতিহাসে যেসব বিষয়ে উল্লেখ ও লালন করা হয়, এখানে সেসব কিছুকে একেবারে উপেক্ষা করা হয় না। ইসলামী ইতিহাস বিদ্যার মৌল ও সার কথা হলো, শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করার জন্যই এই পৃথিবীতে মানুষের জন্ম। “আমি জ্বিন ও মানুষকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি, কেবলমাত্র এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার বন্দেগি করবে।” (সূরা আয যারিয়াহ আয়াত ৫৬) 'বল আমার সালাত, আমার সব ইবাদত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছু সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য।' (সূরা আনআম-১৬২৯)



পশ্চিমা ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ বুদ্ধিজীবীরা এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে অত্যন্ত সংকীর্ণ, সীমিত ও গণ্ডিবদ্ধ বলে শুরুতেই ধরে নিতে পারেন। আল্লাহর ইবাদতের ধারণাটি পরবর্তী যুগের মুসলমানদের কাছে সংকীর্ণ হতে হতে বর্তমানে নিছক কতক অনুষ্ঠানে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ইসলামে ইবাদাতের ধারণাটি এর কম নয়। মানুষের জীবনের সকল কিছু তার বিশ্বাস, কর্ম, চিন্তা, অনভূতি ও আচরণ, সকল দিক ও বিভাগ নিয়েই হচ্ছে ইবাদাত । সূরা আল আনয়ামে এ দিকটির ওপরই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সেখানে বলা হয়েছে : আমার সালাত, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার | জীবন ও মৃত্যু সবকিছু সারা জাহানের রব আল্লাহরই জন্য। মানুষের পরিপূর্ণ, সমগ্র জীবন, এমনকি তার মৃত্যুও, সারা জাহানের একমাত্র প্রভু আল্লাহর জন্য। আল্লাহর ইবাদাত সম্পর্কে ইসলামের ধারণা মানুষের সকল কর্ম, চিন্তা ও অনুভবের মধ্যে ন্যস্ত। সেখানে শর্ত মাত্র একটি। তাহলো, মানুষকে তার দেহ ও আত্মা, হৃদয় ও মন দিয়ে আল্লাহর কাছে এবং আল্লাহর সকল নির্দেশের কাছে পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ইসলামের ইতিহাস প্রণয়নের পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি তাই ইতিহাস রচনার অন্যান্য পদ্ধতির বিষয়সমূহকেও উপেক্ষা করে না। এতে সকল কিছুই সংরক্ষণ ও বিবেচনা করা হয়। সামান্যতম একটি ঘটনাও এখানে দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। আল্লাহর দেয়া মাপকাঠিতে ইসলাম সবকিছুই যাচাই ও পরিমাপ করে নেয়। পৃথিবীতে মানব অস্তিত্বের যে মূল লক্ষ্য, আল্লাহ ইবাদাত বন্দেগি করার সে একমাত্র লক্ষ্য মানুষের সকল চিন্তা, অনুভূতি, কর্ম নিয়োজিত রয়েছে কি? “ তোমাদের পূর্বেও বহু জীবনপদ্ধতির অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল, সেসব যুগ অতীত হয়েছে, পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে দেখ, আল্লাহর (আদেশ ও বিধান) অমান্যকারীদের পরিণতি কী হয়েছে? (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৩৭) অতঃপর আমাদের পরিণতি কী হবে?





বাংলাদেশে শিক্ষার সঙ্কট ও সমাধান

আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

পৃষ্ঠা - ৫৮


শিক্ষা একটি সামগ্রিক বিষয়

মিসরীয় দার্শনিক professor muhammad qutub the concept of islamic education প্রবন্ধে বলেছেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলামের কাজ হচ্ছে পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে লালন করা গড়ে তোলা, এমন একটি লালন কর্মসূচি যা মানুষের দেহ, তার বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা তার বস্তুগত আত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের একটিকেও পরিত্যাগ করে না। আর কোন একটির প্রতি অবহেলাও প্রদর্শন করে না।

Education does not necessarily mean mere acquisition of degrees and diplomas it emphasises the needs for acquisition of knowledge to live a worthy life. অর্থাৎ শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্মানজনক জীবনযাপনের জ্ঞান অর্জন ।

তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এই শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমাগতভাবে ধর্মহীন ধর্মবিদ্বেষ বা নিদেনপক্ষে অন্য ধর্মের প্রতি আগ্রহের জন্ম দিচ্ছে। উচ্ছ শিক্ষার নামে বিদেশগামী তরুণ তরুণীরা যতটা ধর্ম বিদ্বেষী হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে পরধর্ম আগ্রহী। কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে ভয়ঙ্কর পুনর্জাগরণ এবং ইউরোপ আমেরিকায় সাংঘাতিক ক্রসেড প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় ভোগ বিত্ত ও খ্যাতির পেছনে ধাবমান তরুণ তরুণীগন সস্তা ও সহজ পথ বেছে নিচ্ছে । উপরোক্ত আলোচনায় প্রতিভাত হলো যে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের জাতির উপযোগী লোক তৈরিতে ব্যর্থ । শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হেদায়াত তথা আল্লাহকে পাবার সঠিক পথের অনুসন্ধান লাভ, ইমাম গাজ্জালীর এ বক্তব্যকে সত্য বলে ধরে নিলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিতীয় সংকট হচ্ছে এটি ক্রমাগতভাবে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই ব্যবস্থায় শিক্ষা ও ডিগ্রি প্রাপ্ত মানুষ এক ধরনের অহংবোধ ও আত্ম প্রসাদে তৃপ্ত হতে থাকে যা তাকে স্রষ্টার প্রতি বিনয়ী হতে দেয় না । বরং এ ব্যাপারে উদাসীন করে তোলে। ইহ ও পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে অস্পষ্টতা কিংবা কেবল জগৎমুখিতা সৃষ্টির ফলে এ শিক্ষায় শিক্ষিত লোক নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূন্য থাক দূরের বাদ্য শুনে লাভ কি |

মাজখানে তার বেজায় ফাঁক- জাতীয় জীবনে দর্শন অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বাসগত এ অবস্থান নিয়ে কেউই জাতি গঠন কাঙ্ক্ষখিত ভূমিকা রাখতে পারে না।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার তৃতীয় সংকট হচ্ছে এটি ধর্ম ও বিজ্ঞানকে পরস্পরের দুশমন হিসেবে পেশ করে। হাজার হাজার বিকৃতির পথ পাড়ি দিয়ে খ্রিষ্টধর্ম বিজ্ঞানবিরোধী যা নেতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় চার্চ ও বিজ্ঞানের যে দ্বন্দ্ব হয় তাকে কেন্দ্র করে ইসলামের মত বিজ্ঞানময় জীবন বিধানকেও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞানের শত্রু রূপে উপস্থাপন করে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়ে বুঝার কোনই সুযোগ নেই যে রসায়নশাস্ত্রের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান এলজেবরার জনক আল জাবির চিকিৎসা শাস্ত্রের পথিকৃৎ, ইবনে সিনা কিংবা আধুনিক সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের এসব শাখায় অতুলনীয় অবদান রাখতে সক্ষম হন। শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি শ্রেয় কিংবা জ্ঞানীর এক ঘন্টা জ্ঞান সাধনা মূর্খের সারারাত্রি নফল এবাদতের চেয়ে কল্যাণকর ইসলামে নবীর এসব অত্যুজ্জ্বল বাণীর সাথে পরিচিত সুযোগ প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। বরং আছে বিদ্বেষ বিষোদগার ও বিকার । ইসলাম বর্বর যুগের আইন এটি বিজ্ঞান ও প্রগতির অন্তরায় সমাজ ও সভ্যতার পথে প্রতিবন্ধক এই হচ্ছে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য।


এই শিক্ষা ব্যবস্থায় চতুর্থ সংকট মানুষ ও সৃষ্টি জগতের সঠিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত রাখা। মানুষ প্রথম থেকেই যে আশরাফুল মাখলুকাত বা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে দুনিয়াতে এসেছে শিক্ষা না দিয়ে এই ব্যবস্থায় শেখানো হয় মানুষ একটি বিবর্তনের ফল, অন্য কোন প্রাণী হিসেবে তার পূর্ব পুরুষ দুনিয়াতে এসেছিল এক সময় তার লেজ ছিল পরবর্তীতে আস্তে আস্তে সে মানুষে পরিণত হয়েছে। এই যদি হয় মানুষের ইতিহাস তখন স্বাভাবিকভাবেই দয়া-মায়া প্রেম-ভালবাসা স্নেহ-মমতা মানবিকতা ও উন্নত গুণাবলি সিক্ত মানুষের ব্যক্তিও সামষ্টিক জীবনের ভিত্তি হয়ে পড়ে খুবই দুর্বল। মানব সৃষ্টি সম্পূর্ণ বিষয়টিই হয়ে পড়ে অর্থহীন। অনুরূপভাবে ইহ; পারলৌকিক জীবনের গুরুত্ব মানব জীবনের জবাবদিহিতামূলক অবস্থান স্রষ্টার কাছে ফিরে যাবার চিন্তা ইত্যাদি সম্পর্কে কোন ধারণাই এই শিক্ষাব্যবস্থায় দেয় না বরং জীবনের সৃষ্টি স্থিতি ও ধ্বংস সবকিছুকে ইহলৌকিক জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে মানব সৃষ্টির মাহাত্মকে খাটো করে দেয় । এমত বস্থায় মানুষের মধ্যে উদার চিন্তা কর্মফলের মাঝে বেচে থাকার বাসনা ও মানবিকতার বিকাশ ব্যাহত হয় ।


সঙ্কট উত্তরণের একমাত্র পথ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা

জীবন বিধান হিসাবে ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিধান। মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কেই ইসলামের নিজস্ব বক্তব্য রয়েছে। ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের উদ্ভূত সকল সমস্যার সমাধান ইসলামে রয়েছে । জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার ব্যাপারেই ইসলামের বক্তব্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি তত্ত্বীয় ও ফলিত বিজ্ঞান দর্শন সাহিত্য সবকিছুর ব্যাপারেই ইসলামের বক্তব্য রয়েছে। নবী করীম (সা) এর জামানা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের মুসলমানগণ জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

আজ যদি প্রশ্ন করা হয় ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কী ? এর সরল সহজ জবাব হবে যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসাবে শিক্ষাব্যবস্থা থাকে তাই ইসলামী শিক্ষা। এই শিক্ষার উদ্দেশ্য ইসলামী রাষ্ট্রের সকল দিক ও বিভাগ পরিচালনা করার মত যোগ্যতাসম্পন্ন একদল লোক তৈরি যাদের মন মগজ চরিত্র হবে পূর্ণরূপে মুসলিম। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে অন্যান্য সকল মতবাদের চাইতে ইসলামকেই ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনে প্রয়োগযোগ্য উন্নত ও ব্যবস্থা কোরআন হাদিসকে প্রাধান্য দেয় এবং এরই আলোকে পাঠদান করে।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে যোগ্য ও দক্ষ বিজ্ঞানী দার্শনিক শাসক বিচারক অর্থনীতিবিদ সেনাপতি রাষ্ট্রপতি চিকিৎসক প্রকৌশলী সাহিত্যিক ইত্যাদি তৈরি করতে ব্যস্ত সেক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হল এসব যোগ্যতার পাশাপাশি লোকগুলোকে ভাল মুসলমানে পরিণত করা। আর কেবল তাহলে এইসব লোক অর্জিত জ্ঞান ও অধীত বিষয়কে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এদের কাছে দেখা দেবে অসহায় ক্ষুধাকাতর ও স্নেহবঞ্চিত লক্ষ্য শিশুর মুখে হাসি ফোটানোর বিষয়টি। এই যে মানবতা এই মানবতাই ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।



স্রষ্টার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস জগৎ সৃষ্টির স্রষ্টা প্রদত্ত ইতিহাস ও ব্যাখ্যা ইহলোক ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যে সুষম সমন্বয় বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও অগ্রগতির সাথে সমান্তরাল অগ্রযাত্রা এই ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার সোনালি ফসল ।



দ্বীন ও দুনিয়ার মাঝে পার্থক্য নেই

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা একজন মানুষকে পার্থিব কাজের জন্য বেশ ভাল মানের জ্ঞান প্রদান করলেও আখেরাতের ব্যাপারে উদাসীন করে দেয়। এর মূল শিক্ষাই হচ্ছে জীবনকে অখণ্ডভাবে না দেখে বিভাজিত রূপে দেখা। দুনিয়া ও দ্বীন-এ দু'ভাগে জীবনকে ভাগ করে দেয়া। কিন্তু ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম কথাই হলো- ‘দুনিয়া আখেরাতের কর্মক্ষেত্র'। এই দুনিয়ার কাজ কর্মের পরিণতিতে মানুষ আখেরাতের পুরস্কার বা তিরস্কার লাভ করবে।

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে দুনিয়ার সমগ্র সৃষ্টির যথাযথ ব্যবহার, প্রয়োগ ও কল্যাণ সম্পর্কে অবহিত করে থাকে। প্রতিটি বিষয়ের মধ্যে দিয়ে মানুষকে তথাকথিত | কল্যাণকর জীবনযাত্রা, দুনিয়া বিমুখ সন্ন্যাসব্রত পরিহার করে দুনিয়ার কর্ম ব্যস্ততার মাধ্যমে আখেরাতমুখী জীবনযাপনের শিক্ষায় অভ্যস্ত করতে হবে।




আমাদের শিক্ষাসঙ্কট উত্তরণের উপায়

আব্দুল কাদের মোল্লা

পৃষ্ঠা - ৭২


যে মানুষ গড়ার হাতিয়ার হলো শিক্ষাব্যবস্থা। অতি পুরাতন একটি বাক্য আমাদের মহারথীরা প্রায়ই বলেন, “শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড” । সত্যিকার অর্থে শিক্ষা শুধু মানুষ গড়ার হাতিয়ার নয়, জাতি গঠন বা নির্মাণের অপরিহার্য হাতিয়ারও বটে। একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া একটি জাতি নির্মাণ কখনও সম্ভব নয় ।

মহাকবি মিলটনের সংজ্ঞাটি শিক্ষার ব্যাপারে ব্যাপক অর্থবোধক। তার মতে Educa- tion is the harmonious development of body, mind and soul. দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতির নামই শিক্ষা।




ইসলামের দৃষ্টিতে

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ড. এম. এ. সালেহ

139


শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কোন কিছু বলতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে পৃথিবীতে মানবজাতির আগমনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী ছিল। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না। পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে মানব সৃষ্টির পরিকল্পনা, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা করা সম্ভব। মানুষ সৃষ্টির পরিকল্পনা করে মানুষের মর্যাদা সম্বন্ধে মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের কাছে তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পৃথিবীতে মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করার কথা ব্যক্ত করে মহান আল্লাহ বললেন, (হে রাসূল) স্মরণ করুন সে সময়কে যখন আপনার প্রভু ফেরেশতাদেরকে (পরামর্শচ্ছলে) বললেন : আমি অবশ্যই জমিনে আমার প্রতিনিধি তৈরি করতে যাচ্ছি। ফেরেশতারা উত্তরে বললেন : আপনি সেখানে কি এমন কাউকে প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠাতে চাচ্ছেন, যে সেখানে কেবল ফেতনা ফাসাদ আর খুনাখুনিই করবে। আমরাইতো আপনার প্রশংসার সাথে গুণকীর্তন করছি আর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি (প্রভু) তাদের জবাবে বললেন : নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জান না।' (আল কোরআন ২: ৩০-৩১)


মানুষের সৃষ্টি ও তার মর্যাদা সম্বন্ধে যে খবর মহান আল্লাহর এই বাণী হতে প্রকাশিত হয়েছে সেই বিষয়ে একটু চিন্তা করা আবশ্যক। উপরোক্ত আয়াতে লক্ষ্য করা যায় যে, মহান আল্লাহ মানুষকে মানুষ না বলে তাঁর 'প্রতিনিধি' বলে উল্লেখ করেছেন । প্রতিনিধি শব্দটির মর্মার্থ বহুমাত্রিক এবং এর তাৎপর্য অসীম। মানুষকে প্রতিনিধি বানিয়ে মহান আল্লাহ মানুষকে যেমন মর্যাদার চরম শিখরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি তার ওপর অর্পণ করেছেন অপরিসীম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব নেহাত মানুষের খেয়াল খুশি অনুসারে সম্পাদন করা যাবে না। এটাই স্বাভাবিক যে, মানুষ পৃথিবীতে প্রতিনিধি হিসাবে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ ও হেদায়েত অনুসারেই জীবনের সকল কর্মকাণ্ডও পৃথিবীর সকল সমস্যা সমাধানে বাধ্য থাকবে। এই দায়িত্ব ও কর্তব্য যে কত গুরুতর দুরূহ তা পবিত্র কোরআনের নিচের আয়াত থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি।

আমরা সমস্ত আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতসমূহকে এই গুরু দায়িত্ব বহন করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু এরা কেউই এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজি হয় নাই। বরং তারা এতে অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু মানুষ এই গুরু দায়িত্ব বহন করতে রাজি হয়েছিল।' (আল কোরআন ৩৩:৭২)





আমাদের শিক্ষা কিছু ভাবনা

ড. কাজী দীন মুহাম্মদ

143


শিক্ষা : জীবন যাপন প্রণালির পদ্ধতি শিক্ষা। বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে বিভিন্ন আহার্য, বিভিন্ন বাতাবরণ ও বিভিন্ন প্রকৃতিতে তার জীবন যাপনোপযোগী রসদ সংগ্রহ করে বাঁচার ও বাঁচানোর যে পদ্ধতি, তার সম্যক শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা । শিক্ষাই মানুষকে ভাল মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্যের মধ্যে তারতম্য বোধ এনেদেয় । এ বোধকে শাণিত শক্ত সমর্থ করে, এ বোধের ধারা-পদ্ধতি অনুসরণই মানব জীবনের লক্ষ্য। অকল্যাণ থেকে কল্যাণে মনুষ্য জীবনের তথা বিশ্বজীবনের পদ্ধ নির্দেশক যে শিক্ষা তারই পরিশীলনী মানবজীবনের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। পরহিতে স্বার্থত্যাগ ও আত্মোৎসর্গই শিক্ষার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য।

কর্মহীন শিক্ষা যেমন অবাস্তব, ধর্মহীন শিক্ষা তেমনিই অমার্জনীয়। কর্ম শিক্ষা মানুষকে বাঁচাতে শিখায়। কিন্তু ধর্মশিক্ষা মানুষকে যোগ্য নাগরিক রূপে বাঁচতে ও চিন্তা করতে শেখায়। কাজেই উভয় পদ্ধতির সমন্বয়ে যে শিক্ষা সে আদর্শ শিক্ষাই সমাজের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে সমর্থ। মহান আল্লাহ মানুষকে বিবেকসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তাকে মানবিকতার সমস্ত গুণ ও পাশবিকতার সবগুণের সমন্বিত আধাররূপে সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টি করে ইচ্ছা করেছেন যেন মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা রক্ষা করে এবং পশুত্বের দমন করে। মানুষের মধ্যে যে মানবতা দিয়েছেন তার পরিচর্যা করে, পশুত্বের ধ্বংস সাধন করে, প্রকৃত মানব নামের উপযুক্ত হওয়ার চেষ্টা ও সাধনারই সংগ্রাম এ জীবন। এ জীবনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করে তুলতে হলে চাই সত্য-মিথ্যার, সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য সৃষ্টির জ্ঞান। আর যথোপযুক্ত শিক্ষার বা সাধনার পরিশীলনীতেই এ জ্ঞান বিধৃত।



মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে হলে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে হয়। একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল এ সমাজ মানব বুদ্ধির ও মানব সংস্কৃতির এক অমোঘ নিয়মে পরিচালিত। আল্লাহর বিধান মেনে চলতে হলে, প্রকৃতির কোথাও কোন ব্যাঘাত না ঘটিয়ে প্রতিটি কাজ যথাযথভাবে পরিচালিত হলেই ব্যষ্টি ও সমষ্টির জীবন হয় সহজ সরল ও সুন্দর। এ সুন্দরই পরম সত্য। আর সত্যই সুন্দর। অসত্যই অসুন্দর। এবং অসুন্দর ও অসত্যই মানবতাবিরোধী তথা জীবনবিরোধী। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের অশান্তি-অন্ধকার দূরীকরণের জন্য সুস্থ সমাজ চেতনা ও মানবতা বোধের জাগৃতি ও উদ্বোধনের জন্য, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এক বিশাল দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকায় অংশগ্রহণ করতে হয়। আর সে অংশগ্রহণে বিশৃঙ্খলা থাকলে জীবন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে পারে না। মানুষকে জীবনে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি নানা ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয় । আর এ দায়িত্ব| পালনের মহড়ার অনুশীলন শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেশীর প্রতি মানুষের কর্তব্য| এতিম দুঃখীর প্রতি তার দায়িত্ব, এবং মনিব-ভৃত্য, ছোট-বড়, আপন-পর, সবার সঙ্গে তার জীবন-যাপনে কর্তব্য পালন সম্বন্ধে সম্যক শিক্ষা না পেলে, জীবন যাপন প্রণালি শিক্ষার মাধ্যমে অনুশীলিত ও পরিচ্ছন্ন না হলে, সে জীবন পশুবৃত্তি পরিচর্যায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।


প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে তার চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। চরিত্রই মানুষের অমূল্য সম্পদ। এ চরিত্র একবার পরিমার্জিত ও সংস্কৃত হয়ে গেলে জীবনযাপন হয় সহজাত সুষ্ঠু সুন্দর। দেশ, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তির সেবা থেকে আরম্ভ করে বিশ্বনিয়ন্তার প্রীতি লাভের স্তর পর্যন্ত নানাভাবে নানা কর্মের ভেতর দিয়ে পরিচ্ছন্ন মনের ও সংস্কৃত মানসের বিকাশ সম্ভবপর হয়ে ওঠে। মানব প্রবৃত্তি শিক্ষার আলোকে উজ্জ্বল না হলে জ্ঞানহীন অন্ধকার জীবন যাপনই হয়ে পড়ে অবশ্যম্ভাবী। আর সে জীবনই মানবতা বিরোধী জীবন।

কেবল ইহকালের এ জীবন যাপনই নয়, পরকালের চিন্তায় নিয়োজিত সত্যসুন্দর জীবনযাপনের জন্যও এ দুনিয়াই কর্মক্ষেত্র। বলা হয়েছে: ‘আদদুনিয়া মাজরাআতুল আখিরা' এ দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। এখানকার কর্মের মাধ্যমেই পরকালের পথের সম্বল সঞ্চয় সম্ভব। আর এ কর্ম পদ্ধতি শিক্ষার মাধ্যমে পরিশীলিত না হলে জীবন ব্যর্থ হয়ে পড়তে বাধ্য।

শিক্ষা মানুষকে এ দুনিয়ায় হালাল রুজি অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত করবে এবং সমাজ ও দেশের কল্যাণ কামনায় নিয়োজিত করবে। আর ঈমান ও আকিদার পরিচ্ছন্নতা সাধন করে বান্দার ও আল্লাহর হক আদায়ে সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করবে।

সে জন্যই ইলম বা জ্ঞান অনুসন্ধান অবশ্য পালনীয় কর্ম বা ফরয করে দেয়া হয়েছে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জীবনপদ্ধতি ইসলামে ইলমের বিপরীতধর্ম বা স্বভাবকে বলা হয়েছে, যুলুমাত বা অন্ধকার আর ইলমকে বলা হয়েছে, 'নূর' বা আলো।তাই সবাইকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে ইলম বা জ্ঞান হাসিল করার জন্য। এ বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য সম্বন্ধে চিন্তা করার জন্য, সত্য উদঘাটন করার জন্য, গবেষণা করার জন্য, বারবার বলা হয়েছে। জ্ঞান লাভ না করলে নিজেকেই চেনা যায় না, বিশ্বকে তথা তার প্রতিপালক স্রষ্টাকে কি করে জানা যাবে? মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু- যে নিজেকে চিনেছে, সে-ই তার প্রতিপালককে চিনেছে। জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ না করলে তাকে জানা কখনও সম্ভবপর হয় না।

জ্ঞান অর্জন যেমন ফরয, তেমনি জ্ঞান দান করা, ইলম বিতরণ করাও সওয়াবের কাজ। নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান দান করবে। হযরত আলী (রা) বলেছেন: ফাকুম বিইলমি ওয়ালা তাবগি লাহু, বাদালান, ফান্নাসু মাওতা ওয়া আহলিল ইলমি আহইয়াউ- জ্ঞান ধারণ কর এবং তা বিতরণের বিনিময়ে কোন মূল্য কামনা করো না। কেননা মানুষ মরে যায়, কিন্তু জ্ঞানের অধিকারীরা চিরজীবী। মানুষকে শিক্ষা দেয়া বড় তাবলিগ। বিপদে আপদে সদুপদেশ দান পরম নেক কাজ।

সাধক পুরুষ মহাকবি শেখ শা'দী ধন সম্পদ দান সম্বন্ধে বলেছেন : আজই †Zvgvi ab ভাণ্ডারের কুঞ্চিকা অপরের হাতে দিতে কুণ্ঠিত হয়ো না, কেননা কালই সে ধন ভাণ্ডারের কুঞ্চিকা তোমার হাতে নাও থাকতে পারে। ধন দান সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে, জ্ঞান বা ইলম বিতরণ সম্বন্ধেও সেই কথাই প্রযোজ্য । কবি সত্যি বলেছেন :


জ্ঞান-পরিচ্ছদ আর ধর্ম-অলঙ্কার,

করে মাত্র মানুষের মহত্ত্ব বিস্তার।

এই ধন কেহ নাহি নিতে পারে কেড়ে,

যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে।


Plain living and high thinking শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। একথা আগেই বলা হয়েছে যে, সে শিক্ষাই উত্তম, যে শিক্ষা মানুষকে এই পার্থিব জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার কৌশল শিখায় এবং সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনেও সহায়ক হয়। কেবলমাত্র পার্থিব রুজি রোজগারের উপায় আয়ত্ত করায় জীবন একদেশদর্শী হয়ে পড়ে। কেবল নৈতিক শিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষা যেমন জীবনকে করে ফেলতে পারে পঙ্গু তেমনি কেবল জীবিকা অর্জনের শিক্ষাও নিয়ে যায় পঙ্গুত্বের কাছাকাছি। ধর্মীয় ও জাগতিক উভয়বিদ শিক্ষার সমন্বয় জীবনকে করে তুলতে পারে সার্থক। সে জীবনই সংসারের পাপ-পঙ্কিল ধরার ধুলায় বাস করেও চলার পথ করে তোলে সুন্দর মসৃণ। পরকালেও তার সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।

কোন এক ইংরেজ মনীষী বলেছেন যে, শিক্ষার্থীকে কেবল রুজির পন্থা শিখালে, তাতে যদি নৈতিক শিক্ষার সম্মিলন না ঘটে, তবে সে শিক্ষায় মানুষ সুশিক্ষিত হয় না। কুশিক্ষিত হয়। If you give them three 'Rs' ie Reading, writting and arithmatic, and do not give them the fourth 'R'i.e Religion, they are sure to become the fifth 'R'ie. Rascal- শিক্ষার্থীদের কেবলমাত্র পঠন, লিখন ও অংক কষা শিখালে এবং ধর্ম না শিখালে তারা 'দুষ্ট' হতে বাধ্য। কাজেই যে শিক্ষা নীতিবিগর্হিত সে শিক্ষা কারো কাম্য নয়।

এই উপদেশটি আজকের দিনে আমাদের দেশে বেশি প্রযোজ্য। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় Fourth R Religion তার জীবনে কোনই প্রভাব বিস্তায় করতে পারছে না। সুতরাং মানব শিশুকে মানুষ করে তুলতে হলে তার শিক্ষা ব্যবস্থায় Fourth R (Religion) এর প্রয়োজনীয়তা অবশ্য স্বীকার্য।

একথা আগেই বলা হয়েছে যে, ভাল ও মন্দ, আলো ও আঁধার, সুন্দর ও অসুন্দর, হিত ও অহিত ন্যায় ও অন্যায় হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করার জ্ঞান অর্জনই প্রকৃত ইলম হাসিলের প্রশিক্ষণের প্রধান ও প্রথম উদ্দেশ্য। যাতে মানুষ শাশ্বত জীবনের অমরত্বের বিশ্বাস নিয়ে, কর্মে প্রযুক্ত হয়ে সৃষ্টির সেবায় নিবেদিতপ্রাণ ‘মুসলিম' হতে, পারে এবং ইহকালের কর্মপ্রেরণায়, পরজীবনের হিদায়াতের সন্ধান পায়, তার প্রশিক্ষণই প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা অর্জন মাত্র নয়। শিক্ষা আমাদের জ্ঞানকে করে পরিচ্ছন্ন, বুদ্ধিকে শাণিত, দৃষ্টিকে করে প্রসারিত আর জীবনকে করে তোলে সংস্কৃত ও সুন্দর। মানুষের সংস্কৃতির ধারা প্রবাহ গতিশীল এবং স্থান কাল পাত্র উপযোগী করার যে শিক্ষা দে শিক্ষাই আদর্শ শিক্ষা ।

জনৈক ইংরেজ মনীষী বলেছেন: Education does no necessarily mean mere equisition of Degrees and Diplomas, It emphasises the need for acquisition of knowledge to live a worthy life. A balanced acquisition of techniques to fight against odds in order to pave the paths of peace for mankind and to fight for survival before and after death is recomended for the gradual cultural development and smooth running of human civiliza- tion.

মানুষের বাঁচার জন্য ও অপরকে বাঁচতে দেয়ার জন্যই শিক্ষার দরকার। কেবল তাই নয়, শিক্ষার দরকার জীবন যাপনে সেবায় নিয়োজিত হওয়ার এবং মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির গতিধারা রক্ষার জন্যও। কেবল কিছু ডিগ্রি ডিপ্লোমা বা সনদ জোগাড় করাই যে শিক্ষার উদ্দেশ্য তা জীবন বোধে সর্বত্র সমৃদ্ধ নয়। তাই তা পরিত্যাজ্য।

এ সম্বন্ধে সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে শিক্ষা সম্বন্ধে TS Eliot বলেছেন: The purpose of education has been defined as the making people happier. That the educated person is happier than the undu- cated is by no means self-evident. Those who are conscious of their lack of education are discontented, if they cherish ambi- tions to excel in occupation for which they are not qualified, they are sometimes discontented, simply because they have been given to understand that more education would have made them happier. Many of us feel some grievances against our elders, our schools or our universities for not having done better by us. This can be way of extrenuating our own short- comings and excusing our failure. To be trained, taught of instructed above the level of over abilites and strength may be disastrous: for education is a strain and can impose greater burdens upon a mind than that mind can bear. Too much education. like too little education, can produce unhappiness.2


॥২॥


মানুষকে দুটো কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে : ইবাদত ও খিলাফত। মানুষ স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ করবে। আর সে যে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ আল্লাহর খলিফা:

তার পরিচর্যা করবে । আর জ্ঞান ব্যতীত এ দু'টোর কোনটিই সম্ভব নয় । কিন্তু সে জ্ঞান মানুষের গ্রহণ ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে; কম হলেও চলবে না, অতিরিক্ত হলেও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: জ্ঞানের প্রধান অংশ হচ্ছে মানবপ্রেম। পাপী পুণ্যবান নির্বিশেষে মানব সমাজের মঙ্গল সাধনই হলো জীবনের আদর্শ। তিনি আরো বরেছেন: জ্ঞানীর কালি শহীদের রক্তের চাইতেও মূল্যবান। জ্ঞান ক্ষুরধার। জ্ঞান মুজাহিদের তরবারির চাইতেও ধারাল শাণিত। অজ্ঞান-তমসা দূর করে আলোর বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করতে জ্ঞানের তুলনীয় কিছুই নাই । জ্ঞানের দ্বারাই এ দুনিয়ার দ্বন্দ্ব ফ্যাসাদ হিংসা বিদ্বেষ কলহ বিদূরিত করা যায়, মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীর বন্ধন সৃষ্টি করা যায় ।

জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞানহীনতা দুর্বলতা ও মৃত্যু। জ্ঞানের মতো ঐশ্বর্য নেই। বলা হয়েছে : সকল ধনের সার বিদ্যা মহাধন। জ্ঞানের সাহায্যেই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। জ্ঞানই শত্রুকে মিত্র করতে, দুশমনকে দোসত করতে সাহায্য করে। জ্ঞান জীবন যাপন পদ্ধতি তথা ধর্ম বোঝার সহায়ক । জ্ঞানহীন লোক কোনদিন শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা লাভ করতে পারে না। জ্ঞান আলো, অজ্ঞানতা অন্ধকার। আল্লাহতায়ালা আল-কোরআনে বলেছেন : আঁধার আর আলো কি সমান? তোমরা কী চিন্তা করো না? যে নির্বোধ মূক ও বধির অর্থাৎ যে শোনে না, দেখে না, বলে না এবং বোঝে না, আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তি নিরেট পশুর মতো। জ্ঞান মানুষের ভেতর ও বাহির স্বচ্ছ ও নির্মল করে তোলে, মন ও মস্তিষ্কের মোক্ষণ সাধন করে। বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তির প্রসারণ ও নিয়ন্ত্রণ এ জ্ঞানেরই অধীনে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : যাকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাকে প্রভূত কল্যাণ দেয়া হয়েছে তাকে প্রভূত কল্যাণ দেয়া হয়েছে। জ্ঞানেই কল্যাণ জ্ঞানেই মুক্তি। তাই জ্ঞান লাভ করার অধিকার সকলেরই। আর সে অধিকারের সদ্ব্যবহারই আমাদের জীবনকে করে তোলে সুন্দর ও সুসমঞ্জস। জ্ঞানানুশীলনকে সারারাত ইবাদতের চাইতেও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। হযরত (সা) বলেছেন, যে জ্ঞানের অনুসন্ধান করে তার আগের সব পাপ মাফ হয়ে যায়। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি বিদ্যার্জন করতে করতে অর্থাৎ ছাত্রাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে নিষ্পাপ। কেউ বিদ্যা অর্জনের জন্য বের হলে, ফিরে না আসা পর্যন্ত সে আল্লাহর পথেই থাকে। যে শিক্ষা সত্যিকার মনুষ্যত্ব বিকাশের পথে হয় সহায়ক, সবার প্রতি কর্তব্যবোধে করে উজ্জীবিত, স্রষ্টার প্রতি করে বিনীত, সেই শিক্ষাই কাম্য। শাস্ত্র বলে বিদ্যা দদাতি বিনয়ং- বিদ্যা বিনয় জননী। বিদ্যাই মানুষকে মনুষ্যত্ব বোধে উজ্জীবিত করে পশুত্বের পর্যায়ে থেকে আলাদা করে। সেজন্যই বিদ্যা অর্জনে যত্নবান হওয়ার তাগিদ সকল ধর্মেই দেয়া হয়েছে। বিনয়, নম্রতা, মানুষের মহত্ত্ব বাড়ায়, জীবনকে সুন্দর করার জন্য মানুষ সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের জীবজগতের সম্পর্ক, তার পরিপার্শ্বস্থ জড়-অজড় জগতের সবকিছুর সম্পর্ক এবং এদের যথাযথ প্রাপ্য ও দেয় হক সবকিছুরই জ্ঞান শিক্ষা ব্যবস্থায় সন্নিবিষ্ট থাকবে। মানুষ সত্যাসত্য, ন্যায়-অন্যায়, ভালমন্দ, সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য জেনে জীবনকে করে তুলবে পরিচ্ছন্ন নির্মল। জীবন থেকে মিথ্যা, অন্যায় ও অসুন্দর দূর করে সত্য ন্যায় ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুন্দর, সহজ, সরল জীবন, বিনয়, নম্রতা ও মহত্ত্বে উজ্জীবিত আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ এবং মানব কল্যাণে নিয়োজিত জীবনই সত্যিকার জীবন। আর যে শিক্ষায় এসবের সমন্বয় ঘটে সে শিক্ষাই সবার উপযোগী। যে সব গুণের অনুশীলনীর মাধ্যমে মানুষ প্রকৃত মনুষ্য পদবাচ্য হতে পারে, আল্লাহর গুণে বিভূষিত হতে পারে, আল্লাহর প্রকৃত খলিফা বা প্রতিনিধি হতে পারে, সে সব গুণের সমাবেশেই জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। আর এই সুন্দর জীবনের সব গুণ শিক্ষা ব্যবস্থায় না থাকলে সে শিক্ষা কখনও সার্থক হতে পারে না আর ইসলাম এই বিশ্বজনীন শিক্ষারই পরিপোষক ও প্রচারক ।

ইসলামের স্বর্ণযুগে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে কোন পার্থক্য চিহ্নিত হয়নি। সব রকমের শিক্ষাকেই ধর্মীয় অঙ্গনে স্থান দেয়া হয়। এ সম্পর্কে সাম্প্রতিক কালে জনৈক ইউরোপীয় লেখকের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। এতে বলা হয়েছে: ইসলামের এক গৌরবময় কীর্তি হচ্ছে, ইসলাম কুরআন, হাদীস ও মুসলিম বিধান -শাস্ত্র ফিকাহর অধ্যয়ন ও অনুশীলনের অনুরূপ অন্যসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনাকেও সমান আসন ও মর্যাদা দান করেছে এবং মসজিদে তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।



মসজিদে কুরআন, হাদীস ও ফিকাহর ওপর আলোচনার সঙ্গে একই ভাবে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, ভেষজবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপরও আলোচনা করা হতো। কেননা, স্বর্ণযুগে মসজিদই ছিল ইসলামের বিশ্ববিদ্যালয়। দেশ, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের প্রতিক্ষেত্র ও প্রতি প্রান্ত থেকে লব্ধ সাধনা ও সে যুগের সমস্ত জ্ঞানধারাকে সেদিন মসজিদের অঙ্গনে সাদরে বরণ করা হতো। এই আশ্চর্য বৈচিত্র্যময় সম্মিলন আর সর্বজ্ঞানের চরম চরম উৎকর্ষই প্রাচীন মুসলিম মনীষীদের চিন্তাধারায় এক অনুপম বৈশিষ্ট্য দান করেছে- যা তাঁদের প্রতিটি পাঠকের মনেই রেখাপাত করে। এ হচ্ছে বিদগ্ধ মনের এক শান্ত স্থির মহিমময় রূপ|

\ 3 \

কোন নরনারীর জীবনে চলার পথে আলোক সঞ্চারের পক্ষে একজন জ্ঞানহীন ব্যক্তি হচ্ছে একটি তৈলবিহীন প্রদীপের মতো, তাই এই যুক্তি জ্ঞানের চরম উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে সর্বজনীন শিক্ষার নির্দেশে বিধৃত হয়েছে। মহানবী (সা:) বলেছেন: “জ্ঞানা নুশীলন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য অবশ্য কর্তব্য বা ফরয।”



এভাবে দেড়হাজার বছর আগের নর ও নারীর উভয়ের জন্যই সর্বজনীন শিক্ষা ইসলামের পবিত্র সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে পাশ্চাত্য সভ্যতা একে সাদরে বরণ করে নেয়। এ কথাও বলা হয়েছে : “জ্ঞানই শক্তি।” নিম্নোক্ত নির্ভরযোগ্য হাদীসটি থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়, জ্ঞানানুশীলনের ওপরই কেবলমাত্র গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি- জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞান বিস্তারের ওপর সমান গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে : “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাছ থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নেবেন না, প্রকৃতপক্ষে তিনি পৃথিবী থেকে জ্ঞান সাধকদের উঠিয়ে নিয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রে শূন্যতা সৃষ্টি করবেন। এর ফলে এমন অবস্থার উদ্ভব হবে যে, কোথাও কোন খাঁটি ব্যক্তি বা আলেম অবশিষ্ট থাকবে না। তখন মানুষ তাদের নেতা বা পথপ্রদর্শক হিসেবে মূর্খদের বরণ করবে এবং তাদের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করবে (নানা বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চাইবে) এবং তারা (সেই মূর্খ নেতাগণ) কোন রূপ জ্ঞান ব্যতিরেকেই ফতোয়া দান করবে। (এর ফলে) তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হবে এবং অপরকেও পথ ভ্রষ্ট করবে| Ó

\ 4 \

আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশ আমলের শিক্ষাব্যবস্থারই ঈষৎ পরিবর্তিত রূপমাত্র। এ পদ্ধতি যে নিছক অকাজের তা বলছি না। কিন্তু এটি যে একমাত্র মোক্ষম পদ্ধতি- এ ভ্রান্ত ধারণাই আমাদের ক্রমাগত ধ্বংসে দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের যেভাবে শিক্ষাদেব, সেভাবেই তারা গড়ে উঠবে এবং সেভাবেই তাদের বুদ্ধির বিকাশ ঘটবে। তাই আজকের শিক্ষাপদ্ধতি যদি আমরা ঢেলে সাজাতে না পারি তাহলে জাতির উন্নতি নেই। আমাদের দেশের দুরবস্থা আজ চরমে পৌঁছেছে। সে দুরবস্থা পরিমাপের চেষ্টার লক্ষণ কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সেই মানুষও নেই। সকলেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। জাতির এ ভয়ানক গ্যাংগ্রিনের অবস্থাটা তুলে ধরতেও সবাই ভয় পাচ্ছে। কিন্তু এ দুর্দশার কারণ কী? আমাদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে কি কোন মহাপুরুষের জন্ম হয়নি, কোন বিরাট ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেনি? তবে আজ এ অবস্থা কেন? এর আসল কারণ কি এ নয় যে, আমাদের শিক্ষার মূলেই গলদ রয়েছে? যে শিক্ষা আমরা দেই, তাতে প্রকৃত মানুষ তৈরি হতে পারে কিনা, এ কথাটা আমরা ভেবে দেখেছি কি? বাইবেলে যে বলা হয়েছে : Domen gather grapes of thoms, or figs of thistles? - কাঁটার বোঝা থেকে কি আঙ্গুর পাওয়া যায়, না ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুল্ম থেকে ডুমুর পাওয়া যায়?- এ কথাটি আমাদের জন্য আজ সর্বতোভাবে প্রযোজ্য।



শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন : মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার বিকাশ সাধনাই শিক্ষা।



শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সংযমের অনুশীলনী করা। আত্মশক্তির বোধন ও নিয়ন্ত্রণ শিক্ষা করা এবং যাবতীয় প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রেণে রাখার শিক্ষণই সারা জীবনের কর্মপন্থা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। কলসের তলায় যদি একটি মাত্র ফুটো থাকে, তাহলে পানি যতই ভর্তি করি না কেন, তা বেরিয়ে যাবে। একটি মাত্র ইন্দ্রিয়ের অনিয়ন্ত্রণের কারণে যাবতীয় তপস্যা ও কৃচ্ছ্র সাধনা বরবাদ হয়ে যায়। জীবন নৌকা যদি আসক্তি রজ্জুতে বাঁধা থাকে তবে সারা জীব দাঁড় বেয়েও এগুনো যাবে না; দেখা যাবে যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি। যাবতীয় শ্রম বিফল হয়েছে।

চিত্ত বিশুদ্ধ করার শিক্ষণই অনুশীলন করতে হবে। হৃদয় হৃদের পানিতে যদি বাহ্য সংসারের তুফানে ঢেউ জাগে তবে তাতে আপন চেহারার সুষ্ঠু প্রতিবিম্ব দেখা যায় না। উর্মি ভেঙ্গে খণ্ডিত প্রতিচ্ছায়া সামগ্রিকতায় প্রতিভাত হয় না। আবার কেবল পানি স্থির থাকলেই চলবে না, স্বচ্ছ ও নির্মল হতে হবে। পাপ পঙ্কিলতা থেকে ধুয়ে মুছে নিজেকে পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে করতে হবে, তবেই তো তার ছবি পুরোপুরি দেখতে পাব। বাইরের বিশ্বের আলোড়ন ও আবিলতা-ধূলিময়লা-এ দুই উপাদান দূর করে নিজেকে শান্ত সমাহিত ও পাকসাফ করে সাধনায় নিয়োজিত হতে হবে।




শহীদ আবদুল মালেকের কলম থেকে

পৃষ্ঠা - ১৬৫

আল্লাহর মনোনীত এই পথই হচ্ছে ইসলাম। অনেকে ইসলাম বলতে বুঝেন মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কহীন ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সাধনার ব্যাপার। তাদের মতে ইসলাম একটা আধ্যাত্মবাদ বা পরোলোকতত্ত্ব। কিন্তু একথা আদৌ সত্য নয়। কোরআনের অধিকাংশ অধ্যায়ই মানুষের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক ও সমস্যা নিয়েই আলোচনা করেছে এবং এই পৃথিবীর জীবন পথের একটা  সুষ্ঠু ইঙ্গিত দিয়েছে। অতএব ইসলাম একটি ধর্মমাত্র নয়, নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণ জীবনব্যবস্থা।

জীবন তখনই আর্দশতার র্পযায়ে পৌঁছ,ে যখন সে হয় বলষ্ঠি নতৈকিতার অধকিারী, কঠনি সত্যরে উপাসক। একটা জীবনকে আর্দশরূপে গড়ে তুলতে হলে প্রথমে চাই তার 'সুন্দর, নষ্কিলঙ্ক চরত্রি। কনেনা যে জীবন হবে বশ্বি মানবরে আর্দশ, যাকে লক্ষ্য করে চলবে অগণতি মানুষ, সে জীবন যদি হয় চরত্রিহীন, উচ্ছৃঙ্খল, অসংযমী, স্বচ্ছোচারী, তবে বশ্বি-সমাজ ভঙ্েেগ চুরমার হয়ে যাবে তখন তখনই; আর এরূপ জীবন কখনোই বশ্বি মানবরে আর্দশ হতে পারে না।



সুখ, শান্তি ও শিক্ষা

ড. আহসান হাবীব ইমরোজ

পৃষ্ঠা - ১৭৯


Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন Edex, এবং Ducer-duc, শব্দগুলি থেকে । এগুলির শাব্দিক অর্থ হলো, যথাক্রমে বের করা, পথপ্রদর্শন করা। আরেকটু ব্যাপক অর্থে তথ্য সংগ্ৰহ করে দেয়া এবং সুপ্তপ্রতিভা বিকশিত করে দেয়া । OXFORD ADVANCED LEARNER'S DICTIONARY তে Education শব্দের অর্থ করা হয়েছে "Knowl edge. Abilities and the development of character and mental powers that result from such training : Intellectual. moral, physical etc. Education.


সক্রেটিসের মতে : মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার ।

প্লেটো বলেছেন : শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছুই প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত ।

এরিস্টটলের মতে : শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা। জন লকের মতে : শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন প্রতিপালনের নীতিমালা আয়ত্তকরণ।

কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতির উদ্ভাবক ফ্রোবেলের মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য পবিত্র জীবনের উপলব্ধি ।

জন ডিউই বলেছেন : শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্ম উপলব্ধি ।

সাহিত্যিক হালি শিক্ষাকে ভেবেছেন ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে ভেবেছেন পরশ পাথর হিসেবে যা মানুষের মনে জ্বালে আশার আগুন।

অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ শিক্ষাকে দেখেছেন এমন একটা শক্তিরূপে যা মানুষের অন্তরে নিহিত র‍্যাসানালিটিকে জাগিয়ে তোলে এবং এ্যানিম্যালিটিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ইকবালের মত ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে শিক্ষা হলো সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মানুষের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলা।

মূলত : শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ ব্যঞ্জনা ফুটে উঠেছে প্যারাডাইস লস্টের বিখ্যাত কবি মিল্টনের বক্তব্যে; তিনি বলেন " Education is The Harmonious development of body, mind and soul. অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে দেহ, মন এবং আত্মার সমন্বিত উন্নয়নের নাম।





Bmjv‡g bvix wkÿv

cÖ‡dmi W. Aveyj Kvjvg cvUIqvix

c„ôv - 195


ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্য

1. ইসলামী শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো : খেলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্য লোক তৈরি করা। মানুষ আল্লাহর খলিফা। খেলাফতের এ দায়িত্ব পালনের জন্যে যে ধরনের যোগ্যতা দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন সে জ্ঞান অর্জনই হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য।

২. আল্লাহর খাঁটি বান্দা তৈরি করা : আল্লাহর মানুষদের তার বন্দেগি করার জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর খাঁটি বান্দাহ তৈরি করা।

৩. আল্লাহর পরিচিতি লাভ : আল্লাহর সঠিক পরিচয় লাভ করাই হবে এর উদ্দেশ্য।

৪. রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য লোক সৃষ্টি শিক্ষার মাধ্যমে এমন একদল লোক তৈরি করতে হবে যারা একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম এবং সে রাষ্ট্র পরিচালনায় খোদাভীরুতা, আমানতদারি ও সততা এবং যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারে।

৫. আখেরাতের জবাবদিহিতা : সর্বোপরি ইসলামী শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এমন একদল যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা যারা মানবজাতিকে মানুষের গোলামি থেকে যুক্ত করে আল্লাহপাকের খাঁটি বান্দায় পরিণত করতে পারে|

 

রাসূল (সা) এর যুগে নারী শিক্ষা

মহানবী (সা) ভাল করেই জানতেন একটি আদর্শ সমাজ গঠন করতে হলে নারী-পুরুষ সকলকে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে, তাই তিনি নারী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তালাবুল ইলমি ফারিদাতুন আলা কুল্লি মুসলিমিন বলে নর-নারী সবাইকে বুঝিয়েছেন

 

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যাক্তি কন্যা সন্তানের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে, তাকে উত্তমভাবে লালন পালন করে ঐ কন্যা সে ব্যক্তির জাহান্নামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে (বুখারী ও মুসলিম)। (১০) যে ব্যক্তির অধীনে কোন দাসী থাকে, সে যদি তাকে উত্তমরূপে লেখাপড়া ও শিষ্টাচার শিখিয়ে স্বাধীন করে দেয়, এবং বিবাহ করে সে ব্যক্তি দু'টি প্রতিদান পাবে (বুখারী) ((১১)

এ হাদীসে শুধু নিজ কন্যাসন্তান নয় বরং দাসীদেরকেও সচ্চরিত্র ও সুশিক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

ইবনে হুরায়েজ (রা) বর্ণনা করেন, কোন এক ঈদুল ফিতেরের দিনে রাসূল (সা) সালাত আদায় শেষে খুতবা দিলেন। খুতবা শেষে তিনি মহিলাদের কাছে গেলেন এবং তাদেরকে কিছু প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন। (১২)

সমাবেশ খুব বড় ছিল বলে মহিলারা প্রথম ভাষণ শুনতে পায়নি যে কারণে তিনি তাদের কাছে পুনরায় গিয়ে উপদেশ দিলেন। আর এটা ছিল শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের বৈধ অধিকার।

 

শিক্ষায় অধিকতর সুযোগ লাভের জন্য রাসূল (সা) এর নিকট মেয়েদের দাবি

আবু সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে বলল হে আল্লাহ রাসূল: আপনার হাদীস পুরুষরা নিয়ে গেল । অন্য বর্ণনায় আপনার খিদমতে আমাদের তুলনায় পুরুষদের প্রাধান্য অধিক। সুতরাং আপনি আমাদেরকে আল্লাহর প্রদত্ত ইলম থেকে কিছু শিক্ষাদানের জন্য একটা দিন নির্ধারণ করে দিন। যে দিন আমরা সবাই আপনার খিদমতে হাজির হবো, জবাবে রাসূলল্লাহ (সা) বললেন, অমুক দিন অমুক স্থানে তোমরা সমবেত হবে। তারা সমবেত হলে রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে উপস্থিত হয়ে আল্লাহপ্রদত্ত ইলম থেকে তাদেরকে কিছু শিক্ষাদান করলেন। এরপর বললেন, তোমাদের মধ্যে যার তিনটি সন্তান হবে জাহান্নাম তার জন্য হারাম হবে। এক মহিলা বললেন হে আল্লাহ রাসূল (সা) যদি দুটি হয়? তখন রাসূল (সা) বললেন দুই (বুখারী। (১৩)

হাফেজ ইবনে হাজার (রা) বলেন, এ হাদীসে মহিলা সাহাবীদের দ্বীনি ইলম অর্জনের অধীর আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়।

নিঃসন্দেহে সত্য যে এটা ছিল নারী সমাজের অধীর আগ্রহ। মসজিদে নববীতে রাসূল (সা) মুখনিসৃত বাণী শ্রবণ করাই যথেষ্ট মনে করলেন না বরং এ জন্য বিশেষভাবে আবেদন পেশ করলেন এবং রাসূল (সা) তাদের এ দাবি পূরণ করলেন।

 

নারী শিক্ষার ক্ষেত্র ও সীমা

মূল শিক্ষা দীক্ষার দিক দিয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অবশ্য শিক্ষার ক্ষেত্র ও প্রকারে পার্থক্য থাকা আবশ্যক। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো উহার দ্বারা তাকে উৎকৃষ্ট স্ত্রী, উৎকৃষ্ট মাতা, গৃহিণীরূপে গড়ে তোলা। তার প্রকৃত কর্ম ক্ষেত্র গৃহ, সেহেতু তাকে এমন শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন যা এ ক্ষেত্রে তাকে অধিকতর যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারে। উপরন্তু তার জন্য ঐ সকল জ্ঞান- বিজ্ঞান শিক্ষা করা প্রয়োজন যা তাকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তুলতে সক্ষম। তার চরিত্র গঠন ও সামাজিক জীবন যাপনের যাবতীয় বিধি বিধান জানার সুযোগ পায় এ ধরনের শিক্ষা প্রত্যেক নারীর জন্য অপরিহার্য।

অতঃপর যদি কোন নারী অসাধারণ প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার অধিকারিনী হয় এবং এ সকল শিক্ষা দীক্ষার পর ও অন্যান্য জ্ঞান বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে চায়, তা হলে ইসলাম তার পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, কিন্তু শর্ত হলো সে যেন শরিয়তের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে।

আসলে নারীর সৃষ্টি উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাকে আদর্শ মা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এ প্রাকৃতিক সত্যের ওপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন। কারণ আল্লাহর সৃষ্টির একটা মহৎ উদ্দেশ্য থাকে; মানবজাতির কল্যাণই সে সৃষ্টির উদ্দেশ্য। এ জন্যে আমরা যদি নারীকে তার প্রকৃত দাবি মোতাবেক আসল শিক্ষা না দেই, তা হলে অন্য শিক্ষার মাধ্যমে সে একজন আদর্শ নারী, আদর্শ মা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। অথচ আদর্শ মা হওয়ার মধ্যেই নারীর মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে।

 

 

 

 

eZ©gvb Ae¯’vq

K…wl wkÿvi BmjvgxKiY

cÖ‡dmi ZvRyj Bmjvg

c„ôv - 216

 

শিক্ষার উদ্দেশ্য

শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নানাবিধ দর্শন, চিন্তাভাবনা রয়েছে। স্যার পাসী নান বলেছেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হল মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিত্বের স্বাধীন লালন ও বিকাশ। অপর এক দল চিন্তাবিদের মত হলো “শিক্ষা কোন একটি বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হতে। হবে। “অবশ্য বার্ট্রারন্ত রাসেল তাঁর 'সমাজব্যবস্থা শিক্ষা' গ্রন্থে শিক্ষার নেতিবাচক দর্শন পর্যায়ে বলেছেন যে, বর্তমান যুগে শিক্ষার তিনটি বিভিন্ন দর্শন রয়েছে। প্রথম দর্শনটি অনুসারে উন্নতির সুযোগ সুবিধা লাভও সে পথের প্রতিবন্ধকতা দূর করাই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় মতাদর্শীরা বলেন : সমাজের ব্যক্তিদের সংস্কৃতিবান করে তাদের সব যোগ্যতা ও প্রতিভাকে চূড়ান্ত মানে উন্নীত করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য। আর তৃতীয় মতাদর্শীদের মত হলো : শিক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনাকে পরিহার করে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে চিন্তা ও বিবেচনা করা কর্তব্য”। তবে এ সমস্ত মতবাদের পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে একটি বিষয়ে অন্তত সবাই একমত। আর তা হলো শিক্ষার মাধ্যমে চাকরি নির্ভরতার পরিবর্তে আত্মনির্ভরতা সৃষ্টি। দেশে যে সম্পদ রয়েছে তা সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগানো ও জাতীয় সম্পদকে অধিকতর উৎপাদনমুখী করা । আর এ উদ্দেশ্যক ফলপ্রসূ করতে হলে শিক্ষার-ব্যবস্থার দুটো দিক থাকা অপরিহার্য। (১) নৈতিক চরিত্র গঠন ও (২) বাঁচার অধিকার।

 

 

 

 

 

GKwU Av`k© Bmjvgx wkÿve¨e¯’vi

iæc‡iLvi Av‡jv‡K Avgv‡`i gv`ªvmv

wkÿve¨e¯’vi ms¯‹vi cÖ¯Ívebv

cÖ‡dmi AveyeKi iwdK Avng`

c„ôv - 273

 

১.৫ একটি শিক্ষাব্যবস্থায় আদর্শিক দিকের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে আল্লামা ইকবাল আরও বলেন : একজন ব্যক্তির জীবন নির্ভর করছে আত্মা ও দেহের সম্পর্কের ওপর, একটি জাতির জীবন নির্ভর করছে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর। আত্মার জীবনপ্রবাহ বন্ধ হলে, ব্যক্তিদেহ হয়ে পড়ে মৃত। জাতি মৃত্যুবরণ করে যদি তার আদর্শ হয় পদদলিত। (২)

বলাবাহুল্য, ধর্মনিরপেক্ষ ও আদর্শবিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা নতুন প্রজন্মের আত্মা ও অন্তরে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মনের চাহিদা ও দেহের প্রয়োজন পূরণ নিয়েই সে ব্যস্ত। আত্মা চাহিদার প্রতি আদর্শিক প্রয়োজনের প্রতি তা চরমভাবে উদাসীন। যে শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মার পুষ্টি ও আদর্শিক প্রয়োজনের দিক বিবেচিত হয় না তা জাতির জন্য মারাত্মক।

আল্লামা ইকবালের ভাষায়-

জ্ঞান যদি নিয়োজিত হয় তোমার দেহের সমৃদ্ধির জন্য

জ্ঞান যদি হয় তোমার আত্মার মুক্তির জন্য নিবেদিত

তবে এ জ্ঞান হচ্ছে এক বিষধর সর্প।

তবে এ জ্ঞান হবে তোমার পরম বন্ধু, তোমার গর্ব। (৩)

 

 

 

একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

 

চরিত্র হবে ২.১ একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই শুধু আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা বলে বিবেচিত হতে হতে পারে। যখন ঐ ব্যবস্থায় শিক্ষা লাভ করে একজন শিক্ষার্থীর ঈমান হবে সুদৃঢ়, সুন্দর, জীব ও জগৎ সম্পর্কে তার ধারণা হবে স্বচ্ছ, তার ব্যক্তিসত্তার বিকাশের পথ হবে উন্মুক্ত, সমাজের প্রতি দায়দায়ীত্বের অনুভূতি হতে তীব্র। পরকালে আপন দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জবাবদিহীতার ভয় থাকবে অন্তরে সদা জাগ্রত। আপন সত্বা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে থাকবে সচেতন এবং সর্বোপরি নিজের অর্জিত জ্ঞান ও লব্ধ অভিজ্ঞতার ফসল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার অনুপেরনায় হবে সর্বদা বিচলিত। যে শিক্ষাব্যবস্থায় এর এক বা একাধিক দিক ক্ষুন্ন হবে, তা তত অপূর্ণাঙ্গ ও অকল্যাণ কর বিবেচিত হতে বাধ্য।

 

(ক) লক্ষ্যের সুস্পষ্টতা : একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত তাহলো ‘লক্ষ্যের সুস্পষ্টতা'। এ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোন আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চাই, কোন চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ করার ইচ্ছে এবং দেশ ও জাতির জন্য কোন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নাগরিক তৈরি করার প্রয়োজন সেসব বিষয়কে সামনে রেখে তার অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বস্তুত শিক্ষা হচ্ছে লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার মাধ্যম। একটি আদর্শ শিক্ষার লক্ষ্য হতে হবে একটি জাতির মৌলিক আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং তাদের স্বকীয় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ, কেননা আদর্শ দ্বারাই তো জীবন হয় ঐশ্বর্যপূর্ণ । আদর্শ বিবর্জিত কোন জ্ঞান বা বুদ্ধিমত্তা কোন জাতির জন্য প্রকৃত সুফল বয়ে আনতে পারে না। লক্ষ্যস্থলের স্পষ্টতা ছাড়া কোন কাফেলা সঠিক গন্তব্যে পৌছতে পারে না। যেসব প্রত্যয় এবং আদর্শের জন্য একটি জাতি কোন মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় সেগুলোকেই শিক্ষাব্যবস্থায় অনুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে একটি জাতির ধর্ম সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও উন্নয়নই হওয়া চাই শিক্ষার প্রধানতম উদ্দেশ্য। আল্লামা ইকবাল দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, “জ্ঞান বলতে আমি হান্দ্রয়ানুভূতি ভিত্তিক জ্ঞানকেই বুঝি । জ্ঞান প্রদান করে শক্তি, আর এ শক্তি দ্বীনের অধীন হওয়া চাই। কারণ তা যদি দ্বীনের অধীন না হয় তবে তা হবে নির্ভেজাল পৈশাচিক ।' (৫)

 

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জ্ঞানের "ইসলামীকরণ" (Isamization of knowledge) তথা মানব সৃষ্ট ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে প্রত্যাদিষ্ট বা অহিলব্ধ জ্ঞানের সাথে সংযুক্ত করা। এভাবে জ্ঞান হতে হবে বৃহত্তর মানবকল্যাণে নিয়োজিত ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে পরিচালিত।

আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটিতে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে :

 

আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, ফেরেস্তাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (৬) এ আয়াতের আলোকে জ্ঞানীদের হতে হবে সত্যের সাক্ষ্যদাতা।

 

এ লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে তখন যদি শিক্ষাব্যবস্থাটি সার্বিকভাবে ইসলামী আদর্শের আলোকে সাজানো হয়। নতুন বই রচনা ও সঙ্কলনের সময়েও এ দৃষ্টিকোণটি অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। সমাজ বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়াবার সময় ছাত্রদের কাছে ইসলামী দৃষ্টিকোণটিও ভালভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং শিক্ষার প্রতিটি স্তরেও তার মনে আদর্শিক চেতনা সৃষ্টির বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিতে হবে। বলাবাহুল্য এটাই হবে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য।

\২.২ (খ) আত্মসচেতনতা সৃষ্টি : একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যপুস্তক এমনভাবে প্রণীত হতে হবে যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিসত্তার পরিচয় লাভ করে ও সৃষ্টিকূলে নিজের অবস্থান এবং আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে লাভ করে সর্বোচ্চ ধারণা।

 

ব্যক্তিসত্তার পরিচয় লাভের অর্থ একথা বিশ্বাস করা যে, মানুষ আল্লাহর দাস। তাই তার কোন আচার আচরণ বা ক্রিয়া কর্ম এমন হতে পারবে না যা আল্লাহর প্রতি দাসত্বের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। তাকে এ বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে যে মানুষ দুনিয়ার বুকে আলাহর খলিফা। এজন্য তাবৎ সৃষ্টিকুলকে আল্লাহ মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন। তাই মানুষের উচিত সৃষ্টিকুলের সকল উপায় উপকরণকে যেন এমন পদ্ধতিতে ও এমন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় যার মাধ্যমে সে আল্লাহ খিলাফতের দায়িত্ব পালনে সক্ষম। খিলাফতের একটি প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে শিষ্টের লালন দুষ্টের দমন। আরও একটি বিশেষ দায়িত্ব হলো সমস্ত শক্তি, সামর্থ্য ও জ্ঞানকে মানব কল্যাণে নিয়োজিত করা

 

২.২ (গ) জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি

 

একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের তাদের আত্মপরিচয়ের সাথে জাতীয় পরিচয় ও বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান সম্পর্কিত ধারণা দেয়া। অন্তত মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে এ বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের জন্য এক বা একাধিক বই অধ্যয়নের সুযোগ থাকা দরকার।

 

2.2 (ঘ) সমাজ পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কিত জ্ঞান সমৃদ্ধি ব্যক্তিসত্তার পরিচয় এবং জাতীয় ঐতিহ্যের জ্ঞান দানের পাশাপাশি একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজ ও cvwicvwk^©KZv m¤úwK©Z Ávb jv‡fi e¨e¯’v _vKvI বাঞ্ছনীয়। কারণ ইসলামের অন্যতম শিক্ষা হলো মানুষের মনে সামাজি জাগ্রত করা। ইসলাম সমাজ ও রাষ্ট্রের আওতায় ব্যক্তি মানুষগুলোকে সংগঠিত করে এবং ব্যক্তিকে সামাজিক কল্যাণে অংশগ্রহণের অনুভূতি জাগ্রত করে। যেহেতু ইসলাম মাতা-পিতা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যেকের পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। চিহ্নিত করেছে, তাই শিক্ষাব্যবস্থায় এসব দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞাত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতদুদ্দেশ্য পূরণের জন্য ইসলামী দৃষ্টিকোণে রচিত সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যবই সিলেবাসভুক্ত থাকতে হবে।

 

২.২ (ঙ) চরিত্র গঠন

 

একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে এই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। বিশেষ করে শিশু চরিত্র গঠনে চূড়ান্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়। আর তা হবে পাঠ্যপুস্তককে আদর্শিক ছাঁচে ঢালাই ও শিক্ষার্থীদের যথাযথ তারবিয়তের মাধ্যমে। পবিত্র আল কুরআনের ভাষায় আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে প্রেরণের মাধ্যমে মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়েছেন। এ উপলক্ষে নবীর প্রধান প্রধান কাজের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি তাদের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করেন। (৭) অর্থাৎ উত্তম তারবিয়তের মাধ্যমে তাদেরকে সকল চারিত্রিক কলুষতা থেকে মুক্ত করেন ।

 

শিক্ষা যতক্ষণ না উত্তম চরিত্র গঠনে ব্রতী হবে, একে ততক্ষণ পর্যন্ত তা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল করতে সক্ষম হবে না। Prof. Lester Smith. বলেন, “সমাজ সদৃশ ধারণার সাথে চরিত্র গঠনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। (৮)

ইমাম গাজ্জালি বলেন, শিক্ষা পদ্ধতি তরুণ মনকে মধু জ্ঞানপূর্ণ করতেই চাইবে না একে অবশ্য শিশু নৈতিক চরিত্র সৃষ্টি এবং তার মন সামাজিক জীবনের নৈতিক মূল্যবোধের ধারণা দিতে হবে। (৯)

 

শিক্ষার সর্বস্তরে ছাত্রদের আল কুরআনের শিক্ষা ও রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনাদর্শ শেখাতে হবে। এর জন্য চাই পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ স্তর পর্যন্ত কুরআন ও হাদীসের নির্দিষ্ট অংশ পাঠ্যভুক্তকরণের ব্যবস্থা। তদুপরি শিক্ষা নিকেতনগুলোর সামগ্রিক পরিবেশ চরিত্র গঠনের উপযোগী হতে হবে। এ দুটি বিষয়ের কোন একটি ক্ষুন্ন হলে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার অভীষ্ট লক্ষ্য আদর্শ মুমিন তৈরি করা সম্ভব নয়।

২.২ (ছ) সমন্বিত জ্ঞান দানের ব্যবস্থাকরণ

 

একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো ইহা শিক্ষার্থীদের জন্য খণ্ডিত জ্ঞান দানের ব্যবস্থা করার পরিবর্তে সমন্বিত জ্ঞান দানের ব্যবস্থা করে, তথা বিশ্বের দৃশ্যমান বিষয়সমূহের বিভিন্নতার মাঝে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত উপলব্ধির সন্ধান দান করে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের পণ্ডিত ব্যক্তিদের মতে সর্ববিধ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বের একটি সুসংগত নকশা এবং একটি সমন্বিত জীবন পদ্ধতি প্রদান ।

(10)

 

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ। এ শিক্ষাব্যবস্থায় তাই এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যেন একজন শিক্ষার্থী জ্ঞানের ব্যাপক পরিপ্রেক্ষিত লাভ করতে পারে এবং বিশিষ্টকরণের (Specialization) স্তরে প্রবেশ করার আগে জীবন ও জীবনের সমস্যাবলির প্রতি সুসংসহত দৃষ্টিকোণ অর্জন করতে পারে। ইসলাম জ্ঞানকে সমন্বিত ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও সামগ্রিক বলেই বিবেচনা করে। আল কুরআনই সমন্বিত জ্ঞানের উৎকৃষ্ট নমুনা। সেখানে রয়েছে আকিদা বিশ্বাসগত শিক্ষা, আদর্শিক দিকনির্দেশনা ইতিহাস বিশ্লেষণ, মনস্তত্ত্ব সৃষ্টি রহস্য, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তথ্যাবলি, সৌরজগৎ সম্পর্কিত বিবরণ ও পরকালে বিশ্বাসের যৌক্তিকতা এবং আখেরাতের বিস্তারিত ধারণা।

 

 

wkÿve¨e¯’vi ev¯ÍeZv I Avgv‡`i cÖZ¨vkv

byiæj Bmjvg eyjeyj

c„ôv - 303

 

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

 

প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব “কনসেপ্ট অব ইসলামিক এডুকেশন” প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলামের কাজ হলো পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে লালন করা, গড়ে তোলা এমন একটি লালন কর্মসূচি যা মানবদেহ, তার বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা তার বস্তুগত আত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের একটিও পরিত্যাগ করে না । আর কোন একটির প্রতি অবহেলাও প্রদর্শন করে না'। তাহলে আমরা এক বাক্যে বলতে পারি শিক্ষার লক্ষ্য মানসিক উৎকর্ষ সাধন ।

 

আলবার্ট সিজার Teaching of Reference for life গ্রন্থে শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা রাখতে গিয়ে বলেছেন যে, Three kinds of progress are significant. These are progess in knowledge and tenhnology, progress in socialization of man and progress in sprituality. The last one is the most important. ভাষায়, আধ্যাত্মিকতার বিকাশ‍ই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে আমরা সামগ্রিকভাবে বলতে পারি যে শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের আত্মার বিকাশ, আধ্যাত্মিকতার বিকাশ, মানসিক বিকাশ।

 

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে Declaration of Human এ বলা হয়েছে "Edu- cation shall promote understanding, tolerance and friendship among all nations." অতএব এ কথা আমাদের কাছে পরিষ্কার একজন মানুষকে দৈহিক, মানসিক আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিক থেকে পরিপূর্ণরূপে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলায় শিক্ষার লক্ষ্য ।

 

 

শিক্ষাব্যবস্থায়

প্রচলিত ইসলামী মূল্যবোধ

একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ লোকমান

c„ôv - 323

 

প্রস্তাবনা

শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত ও ইসলামী মূল্যবোধ: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ-বাংলাদেশ প্রসঙ্গ” শীর্ষক উপস্থাপনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ অথচ অতীব জটিল । কেননা সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত তথা যে কোন সমাজ ব্যবস্থার মূল্য ভিত্তিই হচ্ছে সে সমাজে অনুসৃত শিক্ষাব্যবস্থা। অপরদিকে মানবমণ্ডলীর অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে সু-প্রতিষ্ঠিত ও সু-সমন্বিত সমাজব্যবস্থা। আর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয় সমাজব্যবস্থার কাঠামো। মানব জীবনের বিশেষ করে কোন জাতির ভাগ্য নির্ণীত হয় শিক্ষাব্যবস্থার আলোকে অপরদিকে সঠিক মানবীয় মূল্যবোধের প্রেক্ষিতেই প্রণীত হয় কল্যাণময়ী শিক্ষাব্যবস্থা এবং যার মাধ্যমেই সম্ভব জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা, ব্যক্তি ও সমাজের চরিত্র গঠন করা, সমাজ জীবনের সকল দিক ও বিভাগে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের উপযোগী ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করা, সমাজের বসবাসরত মানব গোষ্ঠীর স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সমৃদ্ধির ফল্গুধারা অব্যাহত রাখা ।

 

প্রকৃত প্রস্তাবে মূল্যবোধই শিক্ষাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের ভিত্তির • পূর্বশর্ত। মূল্যবোধহীন শিক্ষাব্যবস্থা সঠিক উদ্দেশ্য বর্জিত শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে বাধ্য । তাই শিক্ষাব্যবস্থায় থাকবে একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধ। কেননা শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম। এ জ্ঞান স্বতন্ত্রভাবে ও যৌথভাবে বৈষয়িক বা আমি হতে পারে। অবশ্য সে জ্ঞান অর্জনের আবশ্যকতা বা অনাবশ্যকতা নির্ণীত হবে একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর জীবনের মূল্যবোধ থেকে। কোনো দেশের অধিবাসীগণ যদি ধর্মীয় চেতনা বিবর্জিত বা ধর্মে অবিশ্বাসী হয় তা হলে তাদের জীবনের মূল্যবোধ নির্ধারিত হবে বৈষয়িক উন্নতির মাপকাঠিতে এবং এ দৃষ্টিভঙ্গিতেই সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রণীত হবে। অপরদিকে, সে দেশে অধিবাসীগণ যদি কোন ধর্মীয় চেতনাসম্পন্ন হয় বা ধর্মে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী হয় তা হলে এর শিক্ষাব্যবস্থায় সে মূল্যবোধেরই প্রতিফলন ঘটবে।

এমতাবস্থায় যে সমাজের মানুষ আধুনিক জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করে ধর্মীয় চেতনামুক্ত হয়ে নিজেকে আত্মাবিহীন জড় পদার্থ মনে করে, সে সমাজের মানুষের শিক্ষাব্যবস্থায় বস্তুগত প্রয়োজন এবং বৈষয়িক উৎকর্ষের মূল্যবোধই প্রধানতস্থান পায়। এবং ফলশ্রুতিতে সে সমাজের মানুষগুলো নৈতিকতার বন্ধনমুক্ত জীবনব্যবস্থার অনুসারী হয় পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এর প্রকৃত প্রমাণ। অপরদিকে যে সমাজের মানুষ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণা করে ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেকে আত্মপ্রধান হিসেবে চিনবার সুযোগ পেয়েছে, সে সমাজের মানুষের শিক্ষাব্যবস্থা শুধুমাত্র বস্তুগত প্রয়োজন ও বৈষয়িক উন্নতির মূল্যবোধেই আপ্লুত হয় না। বরং সে সমাজ এমন এক শাশ্বত ও কল্যাণময়ী জীবনব্যবস্থার ধারক-বাহক হয় যা মানুষের অন্তর্নিহিত স্থায়ী, বিশ্বাস ও ভাবধারা তথা মানুষের মৌলিক জীবন দর্শনের বা মূল্যবোধের সঙ্গে মিশে যায়। ইসলামী সমাজব্যবস্থা এর জ্বলন্ত প্রমাণ, সেখানে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে যেখানে মানুষ তার সঠিক পরিচয়, মর্যাদা, উৎস, অবস্থায় ও তিরোধান সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত হয়ে ইহলৌকিক বা জাগতিক উৎকর্ষ সাধন, নৈতিকতার বিকাশ ও পরিণতি নিশ্চিত করতে কার্যকরীভাবে সক্ষম হয়। এহেন অবস্থায়, শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধ এবং ইসলামী মূল্যবোধের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন অপরিহার্য যাতে করে মানব সমাজের জন্য শাশ্বত ও কল্যাণকর শিক্ষাব্যবস্থা কোনটি তা চিহ্নিত করা যায়। এ জন্যে প্রয়োজন শিক্ষার প্রকৃত ধারণা এর সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, দৃষ্টিকোণ, প্রচলিত ও ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যবোধ এর আলোকে বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ইত্যাদি পর্যালোচনা। উল্লিখিত উদ্দেশ্যাবলি সামনে রেখে শিক্ষার প্রচলিত ও ইসলামী মূল্যবোধ সম্পর্ক একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার একটি রূপরেখা ও বাস্তবায়ন পন্থার সুপারিশমালা উপস্থাপন করার প্রয়াসই হচ্ছে অত্র প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার আদায়ের জন্য মানুষ হিসেবে সকল প্রকার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য চাই সঠিক যোগ্যতা। এ যোগ্যতা অর্জনের জন্য দৈহি, মানসিক ও নৈতিক দিক দিয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও গুণাবলি তথা ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ শক্তি প্রতিভার উন্মেষ ও বিকাশ সাধনের নিরলস প্রচেষ্টা শৈশবকাল থেকে চলে তাই। John Milton এর ভাষায় Education is a continueus process through which mental, physical and moral training is provided top new generation who also acquire their ideals and culture throuth it" অর্থাৎ 'শিক্ষা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের জন্য মানসিক, শারীরিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যাপক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তারা তাদের জীবনের মিশন ও জীবন ধারণের কলাকৌশল অর্জন করে থাকে।

অপরদিকে শিক্ষা সম্পর্কে প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব "Concept of Islamic Educa tion" প্রবন্ধে বলেন, “শিক্ষা হচ্ছে পরিপূর্ণ মানব সত্তাকে লালন করা, গড়ে তোলা । এ এমন একটি লালন কর্মসূচি যা মানুষের দেহ, তার বুদ্ধিবৃত্তি ও আত্মা, তার আত্মিক জীবন ও পার্থিব জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের কোন একটিকেও পরিত্যাগ করে না।” পুঁজিবাদী শিক্ষায় মানুষকে নৈতিক বন্ধনমুক্ত করে অতিমাত্রায় বস্তুগত উন্নতির দিকে ঠেলে দেয়। সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা মানুষকে আত্মাপ্রধান হবার সুযোগ না দিয়ে দেহ বা পেটসর্বস্ব বানিয়ে স্রষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোভাব সৃষ্টি করে ব্যক্তির স্বতন্ত্র মর্যাদাকে ধ্বংস করে, ইসলামী শিক্ষা মানুষকে তার আত্মা ও দেহের এক সুন্দর সামঞ্জস্যময় অবস্থা সৃষ্টি করে এ পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধকে নৈতিকতার সীমার মধ্যে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার ও ভোগ করার যোগ্যতা দান করে।

 

 

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

মানুষ হল আত্মাসর্বস্ব নৈতিক জীব। আর মানুষের জন্যই প্রয়োজন শিক্ষার। কিন্তু শিক্ষার সংজ্ঞা ও অপরিহার্যতা সম্পর্কে সকল যুগের মানব সমাজ সম্পূর্ণ একমত পোষণ করলেও মতভেদ দেখা দিয়েছে শুধু শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণের ব্যাপারে। কেননা মানবজীবনের বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিধায় এ মতভেদ জন্মলাভ করে। মানব জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মানুষের অন্তর্নিহিত স্থায়ী চিন্তা, বিশ্বাস, ভাবধারা ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের ফলতি যা মানুষের মৌলিক জীবন দর্শনের সাথে মিশে যায় যাতে মানুষ তার সঠিক পরিচয়, তার মর্যাদা, তার উৎস, তার অবস্থান ও তিরোধান দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীর সাথে তার সম্পর্ক, মহাম- হিম সৃষ্টিকর্তার সাথে তার সম্পর্ক, তার জীবনের শেষ পরিণতি ইত্যাদি খুঁজে পায়। যে সমাজের মানুষ নিজেকে আত্মাবিহীন এক জড় পদার্থ মনে করে, হাত-পা-চোখ-নাক বিশিষ্ট শরীরটাকেই প্রকৃত মানুষ মনে করে, যে সমাজের মানুষ নিজেকে নৈতিকতার বন্ধনযুক্ত মনে করে, সে সমাজের শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য থাকে সমাজের লোকদের শুধু বস্তুগত প্রয়োজন ও বৈষয়িক উন্নতি ও উৎকর্ষ লাভ করা। আধুনিক পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষতা ও খোদাবিমুখ বলে তার পক্ষে মানুষকে আত্মপ্রধান হিসাবে চিনবার সুযোগ হয়নি। তাই নাস্তিক্যবাদী কমিউনিস্ট চীন-রাশিয়া এ শিক্ষাব্যবস্থায় তার জাতীয় আদর্শের প্রতিফলন এমনিভাবে ঘটেছে যার মাধ্যমে এমন সব মানুষ তৈরি হচ্ছে তাদের ভাষায় মানুষের প্রধানতম দুশমন খোদার বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং ব্যক্তিকে ধ্বংস করে সমষ্টির উন্নতি সাধন করবে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেখানে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যে, তাতে মানব জীবনের চরম বস্তুগত লক্ষ্য ও বৈষয়িক উন্নতি উৎকর্ষ লাভ সহজ হয়। আধুনিক শিক্ষাবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদগণ শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এর আদর্শিক ভিত্তির কথা স্বীকার করেছেন। বস্তুত তাদের দৃষ্টিতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হল উন্নতির সমাজের মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও যোগ্যতা যা অপরিপক্ব ও অপরিণত অবস্থায় রয়েছে সেগুলোকে স্রষ্টার থাকে সম্পর্কের আলোকে উৎকৃষ্ট পন্থায় লালন করে ঐ সমাজের উপযোগী ও যোগ্য সদস্য বানিয়ে তাদেরকে সমাজের বিকাশ কল্যাণ ও সহায়ক শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয় এবং প্রকারান্তরে, ব্যক্তির নিজের প্রয়োজন পূরণে, নিজের দেশ ও জাতির প্রয়োজন পূরণে এবং সর্বোপরি নিজের ধর্মীয় অনুশাসনের দাবি পূরণে শিক্ষা সহায়তা করবে। তবে ইসলামী শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সকল যুগে এক ও অভিন্ন, কেননা শিক্ষা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি স্বর্গীয় জ্যোতি যার উৎস একক শক্তি বা আধার থেকে উদগত।

মূল্যবোধ

কোন সুনির্দিষ্ট টার্গেট বা লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে, যুক্তি, দলিল ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করা হয় তাকেই মূল্যবোধ বলা হয়। মূলত যে কোন বিষয় বিচার বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক মূল্যবোধের, তদুপরি যে কোন মূল্যবোধের ভিত্তি হচ্ছে নীতি-নৈতিকতা বা আদর্শ বা ধর্মীয় চেতনা । বিশেষ করে জীবন, জগৎ এবং মানুষ সম্পর্কে ধ্যানধারণা ও এ মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে। অবশ্য প্রচলিত শিক্ষায় মূল্যবোধ আপেক্ষিক অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন পুঁজিবাদী দর্শন যা মানুষকে হাত-পা দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে এর আলোকে যাচাই বাছাই করার মন মানসিকতা ও কৌশল তাই পুঁজিবাদী মূল্যবোধ। পুঁজিবাদী দেশেও ধর্মের চর্চা হয় কিন্তু সেখানকার মূল্যবোধ ধর্মের ভিত্তিতে রচিত নহে। অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা মূল্যবোধ মানুষকে পেট দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করার আহবান জানায় এবং আদৌ ধর্মকে স্বীকার করে না। তাই এ দুটো মূল্যবোধ পরিবর্তনশীল ও ক্ষণস্থায়ী। সর্বোপরি ইসলামী আদর্শ যা মানুষকে তার উৎস, অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে সজাগ করিয়ে তাকে আত্মাপ্রধান নৈতিক হিসাবে চিনবার এবং মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করার সুযোগ দিয়ে সব কিছু যাচাই বাছাই করার যে মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করেছে তাই ইসলামী মূল্যবোধ। এখানে মূল্যবোধ আপেক্ষিক নহে। বরং প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামী মূল্যবোধের উৎস হচ্ছে তাকওয়া বা খোদাভীতি যা মানুষের মনে সদা জাগরুক থাকে এবং এ মূল্যবোধ মানুষকে তার শ্রেষ্ঠত্বের আসনে পৌঁছিয়ে দেয়। তাই ইসলামিক মূল্যবোধ চিরন্তন ও শাশ্বত। আল্লাহর পছন্দ অপছন্দ এবং আদেশ নিষেধের আওতায় এ g~j¨‡ev‡ai cwiwa AvewZ©Z n‡e|

 

শিক্ষা ব্যবস্থা ও মূল্যবোধ

কোন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সে দেশেরই বৃহত্তর জনগণের ধ্যান-ধারণা, দর্শন, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষি থেকে গড়ে ওঠে। এটা ভিন্ন দেশ থেকে আমদানির কোন পণ্য নয়। এর ভিত্তি হবে সে জাতির স্বতন্ত্র জীবনধারা বা জীবনবোধ। শিক্ষাব্যবস্থা সে জাতির মানবীয়, নৈতিক, আত্মিক, বৈষয়িক ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সঙ্গত কারণেই একই জাতির জন্য দ্বিবিধ শিক্ষানীতিও চালু করা যেতে পারে না। যদি তাই হয়, এর ফলশ্রুতিতে জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির পরিবর্তে বিভেদ, দূরত্ব, বিভাজন ও সংঘাত সৃষ্টি হয়। গোটা জাতি একটি সুনির্দিষ্ট টার্গেটের দিকে পরিচালিত হতে পারে না। এ শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই বিপরীতধর্মী মূল্যবোধ ও জীবনধারায় বিভিন্নতা জন্ম দেয়। পরিণামে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। অপরদিকে জনগণের কাঙ্ক্ষিত আসল মূল্যবোধের আলোকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠা সুবিন্যস্ত শিক্ষানীতি ও জনগোষ্ঠীকে দিতে পারে সন্ত্রাসমুক্ত অনুকূল পরিবেশ সামাজিক সংহতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুস্থ ও রুচিশীল সংস্কৃতির বিকাশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সর্বোপরি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ইহলৌকিক মুক্তির দিকনির্দেশনা।

মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা

প্রকৃত মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা কোনটি তা আমাদের বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত পৌঁছার জন্য আধুনিক শিক্ষাবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদদের মতামত প্রণিধানযোগ্য। বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ কবি John Milton বলেছেন "Educations is the harmonious development of body, mind and soul." অর্থাৎ “শিক্ষা হচ্ছে শরীর, মন ও আত্মার সুষম উন্নয়ন।” এই harmonious development কোন মূল্যবোধ ছাড়া সম্ভব নহে। তিনি আরো বলেছেন: । call a complete and generous education that which fits a man to perform justly, skilfully and magnanimously all the offices, both private and public of peace and war. অর্থাৎ আমি এ শিক্ষাকেই পূর্নাঙ্গ ও উদার শিক্ষা বলি যা একজন মানুষকে তৈরি করে ব্যক্তিগত বা সরকারি দায়িত্ব, শান্তিকালীন ও যুদ্ধকালীন দায়িত্ব ন্যায়সংগত ভাবে দক্ষতাসহকারে এবং উদারভাবে পালন করতে।” আরো একজন পাশ্চাত্য শিক্ষাবিদ Prof, Heman H. Home শিক্ষার দর্শন সম্পর্কে বলেছেন: "Education is the eternal process of superior adjustment of the physically and men- tally development free and concious human being to God as mani- fested in the intellectual, emotional and volitional environment of man” অর্থাৎ “শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বিকশিত ও মুক্ত সচেতন মানব সত্তাকে স্রষ্টার সঙ্গে উন্নতভাবে ও ঐচ্ছিকভাবে সমন্বিত করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া যেমনটি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত রয়েছে মানুষের বুদ্ধির দিক, আবেগগত ও ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধীয় পরিবেশে।” এ সম্পর্কে অধ্যাপক Niblet বলেন: The end of education is not happiness, but rather to develop greater capacity for being aware, to deepen human understanding perhaps inevitab- ley through conflict, struggle and suffering." অর্থাৎ "শিক্ষার মূল লক্ষ্য সুখ নয় বরং এর লক্ষ্য হচ্ছে সংঘাত, সংগ্রাম ও কষ্টের মাধ্যমে সচেতনতার ব্যাপকতর ক্ষমতা সৃষ্টি করা, মানবীয় বা শক্তির গভীরতা বৃদ্ধি করা।” অপর উল্লেখযোগ্য পাশ্চাত্য শিক্ষাবিদ Professor Clarke শিক্ষার দর্শন সম্পর্কে বলেন: “For whatever elso education means, it must mean primarily the self perpetuation of an accepted culture which is the life of determined society.” অর্থা” “শিক্ষা মানে আর যত কিছুই হোক না কেন, এর এক আবশ্যিক অর্থ হচ্ছে গৃহীত সংস্কৃতির আত্মস্থায়িত্ব বা চিরন্তনতা আর সে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি দৃঢ় সংকল্প সমাজের জীবন।”

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে শিক্ষা অবশ্যম্ভাবীরূপে আদর্শিক বা মূল্যবোধের রঙে রঙিন হওয়া বাঞ্ছনীয়। শরীর, মন ও আত্মার সুষম উন্নয়ন যে আমাদের শিক্ষানীতিতে যা পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী মূল্যবোধ থেকে উৎসাহিত তাও স্থান পায়নি। এ আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় বস্তুবাদী মূল্যবোধের মারাত্মক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার কারণে মানুষের জীবন ও শিক্ষায় যে মহামূল্যবান বিষয়টি সযত্নে চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে তা হচ্ছে মানবিক ও নৈতিক মূল্যমান (human and ethical values)এ শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষের দৈহিক, বৈষয়িক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটলেও মানুষের মানসিক ও আত্মিক উন্নয়ন না হওয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক আয়োজন ও অর্থবরাদ্দ সত্ত্বেও এক্ষেত্রে বিরাট সংকট দেখা দিয়েছে।

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আমেরিকার সমাজ বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ Albert Schezer তাঁর লেখা "The Teachig of Reverence for life" বইতে শিক্ষানীতিতে নৈতিক পুনর্জাগরণ ও মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলেন: Our age must achieve spiritual reewal, A new renaissance must come the renaissance in which mankind discovered the ethical action is the supreme truth and the supreme utilitariarism by which mankind will be liberated"

অর্থাৎ “আমাদের যুগকে অবশ্যই আধ্যাত্মিক নতুনত্ব লাভ করতে হবে; একটি নতুন লীনর্জাগরণ যেখানে মানবমণ্ডলি নৈতিক কাজকেই চূড়ান্ত সত্য বলে আবিষ্কার করবে এবং এমন চূড়ান্ত উপযোগবাদ যা দ্বারা মানবমণ্ডলী মুক্তি পাবে।” এই Spiritual liberation ছাড়া মানবজাতির কোন মুক্তি আসতে পারে না বলেই তিনি স্পষ্ট বলেছেন।

আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা যা Secular এবং liberal তার ব্যর্থতাকে সামনে রেখে Albert Schezer সে শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি বিশেষ মূল্যবোধ তথা আধ্যাত্মিকতার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন: "Three kinds of progress are significant progress in Knowledge and technology, progress in socialization of man and progress in spirituality. The last one is most important. " বিশিষ্ট শিক্ষাবিদগণের

পাশ্চাত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা পরিষ্কার যে প্রত্যেকটি শিক্ষা ব্যবস্থাই মূলত: সামাজিক আদর্শ, চরিত্র এবং মূল্যবোধ নিয়েই প্রণীত তথা সঠিক ও স্বতন্ত্র মূল্যবোধের আলোকেই শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অনুকরণ আত্মহত্যার শামিল। কলাকৌশল ও প্রযোগ পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যদের অনুকরণ করা যেতে পারে কিন্তু মূল্যবোধ, নীতি ও আদর্শের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে সচেতন কিম্বা অবচেতন ভাবেও যদি আমরা ভিন্ন জাতির মূল্যবোধ গ্রহণ করি, তা হলে আমাদের জাতীয় সত্তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এ প্রসঙ্গে ড. আলামা ইকবাল বলেন: ‘কোন আগুন তোমার চাই তা জানার জন্যে তুমি কোন মাটির তা আগে জেনে নাও। অন্যের আলোর পেছনে ছুটে তোমার লাভ নেই। পাশ্চাত্যের কাচ শিল্পীর প্রাচুর্য কামনা করে তোমার লাভ নই। ভারতের মাটি দিয়ে তুমি তোমার জগৎ গড়ে তোল।”

প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব তাঁর লিখা "Concept of Islamic Education." প্রবন্ধে শিক্ষার মূল্যবোধ সম্পর্কে বলেন, “শিক্ষা হবে দৈহিক, আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে সমতা, মানুষের বস্তুতান্ত্রিক ও অবস্তুতান্ত্রিক বিষয়ের মধ্যে সমতা, মানুষের প্রয়োজন ও আয়ের মধ্যে সমতা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থাসমূহের মধ্যে সমতা। এমনকি জীবনের সাথে সম্পর্কিত এমন সব বিষয়ের মধ্যে সমতা।” শিক্ষা সম্পর্কে আল-কোরআনের ঘোষণা “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্ত থেকে। পাঠ কর আর তোমার প্রভু, প্রতিপালক মহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতা না। (সুরা আলাক : ১-৫ আয়াত)। আল- কোরআনের এ ঘোষণা অনুযায়ী দেখা যায় যে স্রষ্টার নামে এবং তাঁর সাথে সম্পর্কের আলোকেই শিক্ষার আসল মূল্যবোধ স্থিরকৃত হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্জাগরণ কিভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব সে সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা করা যাতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি জাতির ধর্ম, সংস্কৃতি ও ধ্যান ধারণার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে সক্ষম এবং যাতে আজকের পৃথিবীর হতাশাগ্রস্ত মানব সমাজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বৈষয়িক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের সাথে সাথে আত্মিক সংকট থেকেও মুক্তি পেতে পারে। এটা তখনই সম্ভব যদি শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি আদর্শিক ভিত্তি ও মূল্যবোধকে বেছে নেয়া হয় যা মানুষের জীবনের সবদিক ও বিভাগে একটি নির্ভুল দিক নির্দেশিকা উপস্থাপন করতে পারে, যা মানুষকে একটি কল্যাণকর আদর্শ সমাজব্যবস্থার জন্য উপযোগী ও যোগ্য নাগরিক তৈরি করতে পারে যারা জ্ঞানের বলিষ্ঠতা, বৈষয়িক দক্ষতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিক মূল্যমান ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে পারবে যা স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক ও নিয়মিত বন্ধন বা যোগসূত্রের ব্যবস্থা করবে, যা দুনিয়ার সুশৃঙ্খল প্রকৃতি ব্যবস্থার সাথে মানুষের সৃজনশীল গুণাবলির সম্পর্ক স্থাপন ও বিকাশ ঘটাতে সহায়ক হবে এবং সর্বোপরি যা মানুষকে পারলৌকিক জীবনের সম্পৃক্ততা ও চূড়ান্ত পরিণতির অনুভূতিকে সদা জাগরণ রাখবে। এমনি ধরনের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন বা মূল্যবোধ একমাত্র ইসলামই হতে পারে যার পরিব্যাপ্তি শুধুমাত্র ধর্ম তথা স্রষ্টার সাথে মানবকুলের সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয় বরং যা মানব জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল দিক ও বিভাগে দিকনির্দেশনা উপস্থাপনা করবে সাথে সাথে একটি দেশ ও জাতির জন্য প্রীত শিক্ষানীতিতেও স্থায়ী ও কার্যকরী মূল্যবোধ পেশ করতে সক্ষম হবে এবং এতে এমন একটি শিক্ষা পদ্ধতি গড়ে উঠবে যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা প্রশাখার সমন্বয় সাধন করে শিক্ষার্থীদের একটি সুসংহত বিশ্ব অবলোকন করার জন্য উপহার দেবে একটি অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অত্যাবশ্যকীয়ভাবে বৃহত্তর কল্যাণে এহেন মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে। এ প্রয়োজনেই দেশের জন্য দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার গোটা সিলেবাস-কারিকুলমাকে সম্পূর্ণ নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। পরিণামে এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করবে দক্ষ ও যোগ্য সমাজ বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, কারিগর, প্রকৌশলী, ডাক্তার, সমাজকর্মী, ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক যারা নিজ নিজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা প্রশাখায় আরোহী হয়ে জীবন ও জগতের প্রতি অবলোকন করবে একজন মুমিন-মুসলিমের অখণ্ড ও সুষ্ঠু দৃষ্টি দিয়ে আর সমগ্র মানবমণ্ডলীর কল্যাণে নিজেকে করবে উৎসর্গ, বিনিময়ে কামনা করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি যাতে করে দুনিয়ার জীবনে শান্তি ও পরকালীন জীবনে মুক্তি পেয়ে তার জীবন সফল হয়। এহেন মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য চাই যথার্থ জ্ঞান এবং সৎসাহসের। বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সৎসাহস নিয়ে অগ্রপথিকের ভূমিকার অবতীর্ণ হউক এটা জাতির প্রত্যাশা। শিক্ষায় প্রচলিত মূল্যবোধ

যে কোন সমাজ-সভ্যতা-দর্শনে শিক্ষা আদর্শচ্যুত বা লক্ষ্যবিহীন নহে। যুগে যুগে সকল সমাজেই শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান অর্জন, চরিত্র গঠন এবং যোগ্যতা সৃষ্টি। তথা মানুষের আসল পরিচয়ের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে - বস্তুগত জ্ঞানের সাথে নৈতিক শক্তির সমন্বয় সাধন করে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু প্রচলিত সমাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষা এর স্বকীয় লক্ষ্য হারিয়ে এখন তা রাজনৈতিক মতাদর্শের হাতিয়ারে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধের আলোকে লালিত হয়েও নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য ও দর্শন সম্পন্ন অনেক মনীষী ও চিন্তাবিদ বের হয়ে এসেছেন তা অস্বীকার করা যায়। না। তারা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমধর্মী। তাই প্রচলিত মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্যসহ এর অবস্থার মূল্যায়নের অবকাশ রেখে নিম্নে তা আলোচনা হল: শিক্ষার প্রচলিত প্রথমত, মূল্যবোধ হচ্ছে বস্তুবাদ ও তথাকথিত আধ্যাত্মিকতা।

পাশ্চাত্যের প্রচলিত শিক্ষা মানুষকে আত্মা প্রধান নৈতিক জীব হিসাবে সুযোগ না দিয়ে শুধুমাত্র দেহসবস্ব উন্নত সংস্করণের জীব হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া প্রাচ্যের ধর্মীয় শিক্ষা (তথা মাদ্রাসা শিক্ষা) মানুষকে এক ধরনের আধ্যাত্মিকতার ধারণা দিতে গিয়ে তার বস্তুগত প্রয়োজনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তথা মানুষের আত্মার প্রয়োজন ও জৈবিক প্রয়োজন পূরণের সমন্বয় বিধানে শিক্ষার আধুনিক মূল্যবোধ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

দ্বিতীয়তা, শিক্ষার প্রচলিত অন্যতম মূল্যবোধ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈরাগ্যবাদ। আধুনিক শিক্ষা মূলত পাশ্চাত্য খোদাবিমুখ ধ্যানধারণা প্রসূত যেখানে ধর্মের কোন স্থান বা আবেদন নেই তাই ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে হিপ্পীইজম দেখা দিয়েছে। অপর দিকে প্রাচ্যের ধর্মীয় শিক্ষা (বা মাদ্রাসা শিক্ষার) খোদামুখী ধ্যানধারণা সৃষ্টি করলেও জাগতিক ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে অনীহা ও নির্লিপ্ত এবং ব্যবহারিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বিবর্জিত হয়ে এক ধরনের বৈরাগ্যবাদিতায় পরিণত হয়েছে এবং সংসার বিরাগী হয়ে অনেকে ভাঙারি সাজে।

তৃতীয়ত, প্রচলিত শিক্ষার আর একটি মূল্যবোধ হচ্ছে বিজ্ঞান ও ধর্মকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন রাখা এবং একটি আর একটির বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক করে প্রতিষ্ঠা করা। বিজ্ঞান ও ধর্ম একই উৎস থেকে উৎসারিত এবং একই মহাশক্তির অবদান এটা প্রচলিত শিক্ষায় সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। ফলত আধুনিক মূল্যবোধ হচ্ছে বিজ্ঞানই ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ধর্ম তার কার্যকরী শক্তি হারিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের নিকট আত্মসমর্পণ করে চলবে।

চতুর্থত, প্রচলিত পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক শিক্ষায় ব্যক্তি ও সমাজকে পরিপূরক শক্তিতে রূপান্তরিত করার মূল্যবোধ গড়ে তোলেনি। তাইত দেখা যায় পুঁজিবাদী সমাজে সমাজকে উপেক্ষা করে ব্যক্তির প্রাধান্য এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তির স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে অস্বীকার করে সমাজের প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অধিকন্তু প্রাচ্যের ধর্মীয় শিক্ষা সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে অতীব খাটো করে ব্যক্তির মূল্যমানকে কিছুটা গুরুত্ব দিয়েছে, ফলে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ভারসাম্যতা বিঘ্নিত হয়েছে।

পঞ্চমত, শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধ অনুযায়ী দুনিয়ার জীবন ও পরকালীন জীবনের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা হয়নি। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা পরকালীন জীবনকে প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করে দুনিয়ার জীবনকেই মানুষের চরম ও পরম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তাই মানুষ হয়ে উঠেছে চূড়ান্তভাবে বস্তুবাদী। অপরদিকে প্রাচ্যের মাদ্রাসা শিক্ষায় পরকালীন দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করলেও খোদভীতির নামে সংসার ত্যাগী মনোভাব সম্পন্ন একদেশদর্শিতায় পরিণত করেছে যা মানবতার জন্য আদৌ কল্যাণকর নহে । অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের দুনিয়া পূজারী মনোভাব আধুনিক বা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের তুলনায় অনেক বেশি।

ষষ্ঠত, শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধ মানুষের মধ্যে প্রকৃত মৌলিক মানবীয় গুণাবলি ও চরিত্র সৃষ্টির উদ্যোগ বিবর্জিত। এর ফলে আধুনিক শিক্ষা মানুষের মধ্যে আদর্শের অনুভূতি অনুসরণ, আত্মমর্যাদাবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, সংযমশীলতা, দেশপ্রেম, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য, জনসেবামূলক মনোভাব, স্নেহশীল, মমত্ববোধ, দায়িত্ববোধ ইত্যাকার চারিত্রিক গুণাবলি সৃষ্টির পরিবর্তে আত্মকেন্দ্রিকতা, হিংসা বিদ্বেষ, স্বজনপ্রীতি, সুদ-ঘুষ-জুয়া-বেশ্যাবৃত্তি মনোভাব, আইন অমান্য করার প্রবণতা, উচ্ছৃংখলতা, সন্ত্রাস, রাহাজানি, আত্মকলহ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভোটার বিহীন নির্বাচনে জোরপূর্বক জয়ী হবার প্রবণতা, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বেপরোয়া মনোভাব ইত্যাদি অসৎ গুণাবলি সৃষ্টি করে।

সপ্তমত, শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধ নারী ও পুরুষকে স্ব স্ব মর্যাদায় অধিষ্ঠিত না করে তাদেরকে একই কাতারে শামিল করে সহশিক্ষার মাধ্যমে সমাজ রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূলভিত্তি পরিবার সংগঠনকে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছন্ন করে দিয়ে চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। এরই ফলে জন্ম নিয়েছে নৈতিকতা বিবর্জিত আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বিবর্জিত ধর্মীয় চেতনা বা অনুভূতি যা কোন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক হতে পারে না। তাই পাশ্চাত্যের সহশিক্ষার কুফল থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য এবং পাশ্চাত্য জগতের নারী সমাজের পক্ষে থেকেও আন্দোলন "Save use from the hands of the young" নামীয় শ্লোগান শুনা যায়।

শিক্ষায় ইসলামী মূল্যবোধ

শিক্ষা সম্পর্কে ইসলামী মূল্যবোধ একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবিদার হিসেবে চিরন্তন ও শাশ্বত আদর্শ ও দর্শন পেশ করেছে। জীবন ও জগতের ব্যবস্থার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মানব জীবনের প্রত্যেক দিক ও বিভাগ সম্পর্কে ইসলাম তার নিজস্ব বাস্তবধর্মী নিয়ম বিধান উপস্থাপন করেছে। যা মানুষের ইহলোকিক ও পারলৌকিক জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত। ব্যক্তির স্বপ্ন-প্রতিভা ও মননশীলতার উন্মেষ সাধন এবং দৈহিক, মানসিক ও নৈতিক যোগ্যতা সৃষ্টির জন্য জ্ঞানার্জনের প্রেরণা ও সাধনায় নিয়োজিত করে ইসলাম ব্যক্তি মানুষকে সৃষ্টির সেরা তথা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে তৈরি করে আল্লাহ প্রদত্ত আইনের আলোকে দুনিয়ায় শান্তি ও কল্যাণ এবং পরকালে মুক্তির রাজপথ রচনার দৃষ্টিকোণ নিয়েই তার শিক্ষাকে পরিচালিত করে। এহেন মূল্যবোধেই শিক্ষা মানুষকে তার বস্তুগত জ্ঞানের সাথে নৈতিক শক্তির সমন্বয় সাধন করে তার মন, মগজ ও চরিত্রকে এমনভাবে গড়ে উঠায় যাতে করে তাকে দিয়ে ইসলামের পরিপূর্ণ জীবনাদর্শের আলোকে সমাজ, সভ্যতা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় যা সমগ্র মানবতার জন্য সার্বিক কল্যাণ ও শান্তি বয়ে আনবে। অবশ্য এ মূল্যবোধ তথাকথিত মৌলবাদের ধারণা থেকে সৃষ্টি নয় বরং ইসলামের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই উদ্ভূত। শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধের অসম্পূর্ণতা, অসামঞ্জস্যতা ও কল্যাণ বিমুখতার বিপরীতে ইসলামে মূল্যবোধে উপস্থাপিত শিক্ষার সামঞ্জস্যতা, পূর্ণতা ও কল্যাণমুখিতার উপাদানসমূহ মূল্যায়নের দাবি রাখে। তা নিয়ে উপস্থাপন করা হল:

প্রথমত, শিক্ষার ইসলামী মূল্যবোধে ব্যক্তিকে আত্মপ্রধান নৈতিক জীব হিসাবে চিহ্নিত করে তাঁর জৈবিক দাবি পূরণ ও আত্মার উন্নতি বিধানকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে যাতে করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণেই সে নিয়োজিত হতে পারে। ইসলামী শিক্ষা ব্যক্তির জৈবিক দাবি ও আত্মার দাবিকে এক ও অভিন্ন মনে করে এবং একটি আর একটির পরিপূরক শক্তি হিসাবে উপস্থাপন করে।

দ্বিতীয়ত, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতার কারণেই। কিন্তু এ স্বাধীনতা যেন লাগামহীন না হয় সেদিকে অবশ্যই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধে শিক্ষা চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসাবে কাজ করে যাতে মানবমণ্ডলী চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে পারে এবং উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে।

তৃতীয়ত, শিক্ষায় ইসলামী মূল্যবোধ বিজ্ঞান ও ধর্মের উৎসকে এক ও অভিন্ন মনে করে এতে এ দ্বয়ের মধ্যে কোন বিরোধ বা সংঘর্ষ নেই। ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পর সহযোগী হয়ে মানবতার সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত করাই ইসলামী শিক্ষার অন্যতম মূল্যবোধ। স্রষ্টা প্রদত্ত নিয়মনীতিতে ধর্ম ও শান্তির চূড়ান্ত অধিকার ও ব্যবহারকে শ্রেষ্ঠ এবাদত ও কল্যাণকর কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার এই ইসলামী মূল্যবোধের ফলশ্রুতিতেই আধুনিক যুগে ড. মরিস বুখাইলি ও প্রফেসর আবদুস সালামের মত বিজ্ঞানী ও ধার্মিক লোকেরা জন্মলাভ করেছেন।

চতুর্থত, ইসলামী মূল্যবোধ দুনিয়ার জীবন মানুষের জন্য সূচনা ও শেষ নয়, বরং মরণশীল মানুষের জন্য পরকালীন জীবনের ফলাফলই চূড়ান্ত এ শিক্ষা দিয়ে থাকে। বস্তুত মানব জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ এক ও অবিভাজ্য সত্তা হিসাবে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবন তার জন্য স্বতন্ত্র কোন সত্তা নয়। নৈতিকতার সীমার মধ্যে দুনিয়ার রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করে পরকালীন অনন্ত-অসীম জীবনের মুক্তির পথ প্রশস্ত করাই মানুষের দায়িত্ব। তাই ইসলামী মূল্যবোধে পরিচালিত শিক্ষা শুধুমাত্র দুনিয়ার প্রয়োজনই পূরণ করে না বরং পরকালীন জীবনের মুক্তির রাজপথ রচনারও সুমহান ব্যবস্থা করে।

পঞ্চমত, ইসলামী মূল্যবোধে শিক্ষা উন্নত নৈতিক জীব হিসেবে ব্যক্তি মানুষ এবং কল্যাণকামী সামষ্টিক রূপ হিসাবে সমাজকে পরিপূরক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। এহেন শিক্ষায় প্রচলিত পাশ্চাত্য শিক্ষার মত বস্তুবাদী ব্যক্তির ওপর যন্ত্রদানব নামীয় সমাজের প্রাধান্য যেমন স্বীকার করে না তেমনি সমাজের ওপরও ব্যক্তির লাগামহীন প্রাধান্য স্বীকার করে না। এমনিভাবে ইসলামী শিক্ষার মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সমাজকে পরিপূরক শক্তিতে রূপান্তরিত করে এক সার্বজনীন বৈজ্ঞানিক ও প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে ধরতে চায় যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়ও শিক্ষা গ্রহণ করতে এবং নিজ ধর্মের চর্চা করতে নির্বিঘ্নে সুযোগ পাবে।

ষষ্ঠত, ইসলামী মূল্যবোধে শিক্ষা মানুষকে একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ধারণা বিদূরিত করে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল বিষয়ের সাথে ইসলামী দর্শনের তুলনামূলক অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ ও গবেষণার অনন্য সুযোগ স্থাপন করে। শিক্ষার ইসলামী মূল্যবোধে আধুনিক অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, প্রাকৃতিক ও জীব বিজ্ঞান পড়ানো ও গবেষণার ব্যাপারে আদৌ কোন আপত্তি নেই।

সপ্তমত, সমাজগঠন ও পরিচালন অপরিহার্য অঙ্গ পুরুষ ও নারী উভয়কে স্ব স্ব মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে ও স্বাতন্ত্র্যবোধ সৃষ্টি করে শিক্ষার মাধ্যমে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত অবদান রাখার মূল্যবোধ থেকেই ইসলাম এর শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালিত ও পরিমার্জিত করতে চায়। এহেন ব্যবস্থাপনাই নারী-পুরুষের মধ্যে জ্ঞান, চরিত্র ও যোগ্যতা সৃষ্টি করে তাদের প্রতি প্রকৃত সুবিচার করতে চায়। নারীর ওপর পুরুষের অযৌক্তিক প্রাধান্য এবং পুরুষের ওপর নারীর শ্রেষ্ঠত্ব নয় বরং পরিপূরক শক্তি হিসাবে উভয়কে এহেন শিক্ষায় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধের আলোকে নারী সমাজকে পণ্যসামগ্রীর মত ভোগ-ব্যবহারকে ইসলামী মূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

- বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বনাম মূল্যবোধ

শিক্ষার প্রচলিত মূল্যবোধ ও ইসলামী মূল্যবোধ উপস্থাপনের পর বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় এর অবস্থান পর্যালোচনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যা বহুলাংশেই মানবীয়, আত্মিক ও নৈতিক মূল্যমান বিবর্জিত তা পরিচালিত হচ্ছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। সাধারণভাবে শিক্ষার যে সবত স্বাভাবিক সুমহান উদ্দেশ্য রয়েছে সকল দেশে এবং জাতিতে সেগুলোও অনেকাংশে অর্জিত হচ্ছে না আমাদের দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থায়। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বস্তরে ও সর্বপর্যায়ে; শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসকসহ শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সবাই আজ শিকার হাচ্ছে নৈতিক অবক্ষয় ও দেউলিয়াপনায় । গোটা শিক্ষাঙ্গন পরিবেশ ভরপুর হয়ে উঠেছে নীতিহীনতা, অদক্ষতা, চরিত্রহীনতা, অনৈতিকতা, অব্যবস্থাপনা ও সন্ত্রাসী তৎপরতায়। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষানীতির প্রেক্ষিতে (যা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টসমূহে উল্লিখিত) শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ শিক্ষক সমাজের অবস্থা, ছাত্রসমাজের অস্থিরতা, সিলেবাস কারিকুলামের দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাদান কার্যক্রম, পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, wkÿv cÖwZôv‡bi wewfbœ cwiPvjbv cl©` BZ¨vw` welq h_vh_ ch©v‡jvPbvi `vwe iv‡L|

অবশ্য বর্তমান নিবন্ধে এ বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। তবুও প্রাসঙ্গিভাবে এটা বলা অযৌক্তিক হবে না যে শিক্ষার সঙ্গে জড়িত ছাত্র-শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীসহ এর সর্বপর্যায়ে এবং বিভিন্ন দিক ও বিভাগে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। সন্ত্রাস ও সেশনজট সহ বহুবিধ শিক্ষা সমস্যা ও সংকটকে শিক্ষাঙ্গনের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। আমার মতে এসবের প্রধান কারণ সমাজজীবনের অন্যান্য সেক্টরের মত জাতীয় জীবনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধের আলোকে কোন স্থায়ী শিক্ষানীতি ও কল্যাণকর শিক্ষাব্যবস্থার আজও বিকাশ ঘটেনি। কারণ আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যা মূলত বৃটিশ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে Sir William Hunter যে মন্তব্য করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন: "The truth is that our system of education (public intruction) is opposed to the tradition, unuited to the requirements and hateful to the religion of Mussalman." অর্থাৎ 'সত্য কথা এই যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মুসলমানদের ঐতিহ্য বিরোধী এবং আমাদের ইতিহাসের প্রতি বিদ্বেষী

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বহুবিধ ত্রুটি ও গলদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিছু দিক এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা বা জ্ঞান দিতে পুরোপুরি সমর্থ নয়। কিছুটা বৈষয়িক জ্ঞানদান করলেও শিক্ষার্থীকে সুনির্দিষ্ট কোন আদর্শের আলোকে তার ব্যক্তিগত জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠার ব্যাপারে সাহায্য করে না। তাই তার জীবনে দেখা দেয় হতাশা এবং ফলে মানবীয় কোন সুমহান আদর্শের চর্চা সে করতে পারে না। এ ছাড়া তার মধ্যে সমাজের জন্য ত্যাগের অনুভূতিও জাগ্রত করে না। সে আত্মকেন্দ্রিকতায় বিভোর থাকে কিছুটা পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করলেও চারিত্রিক মান এবং আত্মিক উন্নতির কোন পথ ও পাথেয় সে খুঁজে পায় না এ শিক্ষাব্যবস্থায়।

মানবজীবনের যদিও বিভিন্ন দিক ও বিভাগ রয়েছে যেমন ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক তবুও এগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং গোটা মানব জীবন এক অখন্ড অবিচ্ছিন্ন ইউনিট হিসাবেই স্বিকৃত । কিন্তু আমাদের শিক্ষানীতিতে মানব জীবনের এক একটি দিক ও বিভাগকে প্রাধান্য দান করে মানুষকে খন্ডিত অংশ হিসাবে চিহ্নিত করেছে ফলে গোটা মানব জীবনকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ শিক্ষার্থী পায়নি। এ কারনেই সে তথাকথিত শিক্ষিত হলেও ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয় মানব জীবনের উৎস অবস্থান ও পরিনতি সম্পর্কেও সঠিক মানব সমাজের বিভিন্ন দিক ও বিভাগের সমস্যার সঠিক ও সামগ্রিক সমাধান দিতে মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, যার ফলে সে মানুষ ইহলৌকিক অবস্থান এবং প্রতিষ্ঠা লাভের সফলতাকেই জীবন সাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত করে।

প্রচলিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর মনে জগত সম্পর্কেও সঠিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে আগ্রহী হয়। বৈজ্ঞানীক তথ্য ও গবেষনার মাধ্যমে জগত সম্পর্কে বহু কিছু আবিষ্কার করলেও সৌরজগৎ সহ এ পৃথিবীর ব্যবস্থাপনার পেছনে যে অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে তার সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্দেশ করতে পারেনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই দেখা যায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি মানবকুলের বিভিন্ন আচরন । মানুষের অন্তরে ও বিশ্বাসে স্রষ্টার প্রতি স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি বা নিরপেক্ষতা। এতে হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন মূল্যবোধে বিরাট তারতম্য ও পার্থক্য। এরই ফলে সুনির্দিষ্ট কোন জীবন ব্যবস্থাও গড়ে উঠেনি আমাদের দেশে।

জীবন ও জগত সম্পর্কে সঠিক ধারনা ও মূল্যবোধের অভাবেই আমাদের শিক্ষর্থী যুবক সমাজ পায় না ( পৃথিবীতে সঠিক ভাবে চলার পথ এবং ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক ব্যক্তির সাথে সমাজের সম্পর্ক, জগতের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক এবং স্রষ্ঠার সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের দিশা। এর ফলে জীবন সমস্যার সঠিক সমাধান খুজে বের করার যোগ্যতা সে হারিয়ে ফেলে। আদর্শ ভিত্তিক কোন সমাজ ব্যবস্থার ভিত রচনা করতে সে দূর্ঘপদে এগিয়ে আসেনা। দোদুল্যমান অবস্থায় সংশয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তাকে জীবন অতিবাহিত করতে হয় ।

আমাদের শিক্ষানীতিতে আমাদের জাতীয় অতীত ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সঠিকজ্ঞান প্রদানের কোন টার্গেট নেই যার ফলে অজানার কারনে অতীতের গৌরবজ্জল ইতিহাস শিক্ষার্থীর মনে কোন মনোবল ও উৎসাহ সৃষ্টি করে না এবং সংস্কৃতির বিকাশ ধারায় সে কোন অবদানও রাখতে পারে না। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জ্ঞান বিবর্জিত শিক্ষার্থী ও জনগোষ্ঠী জীবনের নৈতিকমূল্যবোধ আপুত হয় না বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ববোধ পরিচালিত হয়না। সমাজে ও রাষ্ট্রে আদর্শিক পরিবর্তন ঘটানোর বৈপবিক পদক্ষেপ নিতে পারে না।

প্রচলিত শিক্ষানীতিতে আমাদের শিক্ষর্থীকে আত্মপ্রত্যয় ও নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর সুযোগও বহুলাংশে অনুপস্থিত। কেননা শিক্ষা নীতিতে মানবীয় দর্শন ও আদর্শহীনতার কারনে সে দর্বলচিত্ত হতে বাধ্য হয়। বৈষয়িক ও পেশাগত জ্ঞানের পাশাপাশি সাধারন ও নৈতিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ না থাকায় সে নৈতিক শক্তির অধিকারী ও আত্মপ্রত্যয়ী হতে পারে না। ফলে মহৎ কর্ম সাধনেও সে সাহসী ভূমিকা নিতে পারে না।

আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষনা মানবিক মূল্যবোধও স্রষ্টার আনুগত্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয় আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার কোন যোগ সূত্র নেই। এমনকি বিকল্প কোন মূল্যবোধও তদস্থলে গ্রহন করা হয়নি। তাই দেখা যায় শিক্ষার্থীদের সামনে কোন সমুচ্ছ আদর্শ ও প্রত্যয় সদাজাগ্রত থাকে না তার মধ্যে সৃষ্টি হয় না জীবন ও জগত সম্পর্কে জ্ঞান গবেষনায় পূর্নাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি। এর কারন পাশ্চাত্য জগতের জ্ঞান বিজ্ঞান যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পূর্নভাবে স্থান করে নিয়েছে সে সমড় জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ যাদের হাতে হয়েছিল তারা ছিল খোদা বিমুখ যারপা চিল্ড্রজগত ও কর্মজীবন থেকে স্রষ্টার অস্ত্বিকে নির্বাসিত করেছিল। বৃটিশ প্রতা তাদের দেশে জ্ঞান বিজ্ঞানের যে সমস্ত বই পুড়ক চালু করেছিল আমাদের দেশেও জ্ঞান বিজ্ঞান বিভিন্ন ক্ষেত্রে যথা কলা, সমাজবিজ্ঞান, বানিজ্য, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসা শিক্ষা, আইন শিক্ষা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, শরীর চর্চা ও সামরিক শিক্ষা প্রভৃতিতে আজো সে সমস্ত বই পুস্তক চালু রয়েছে। ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য,ভূগোল,বানিজ্য, ও বিজ্ঞানের সকল বিষয়ের কোথাও শিক্ষার্থী বিশ্বনিয়ন্দ্র বিশ্ব পরিচালক ও বিশ্বস্রষ্টার যিনি সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎস ও একমাত্র আইন রচয়িতা তার অস্ত্বিত্ব পায় না|

সময়ের পরিক্রমায়

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা

মুহাম্মদ শামীমুল বারি

c„ôv - 344

 

খ. নারী শিক্ষা ঃ একটি সফল, পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সমাজ বিপ্লব সাধন করতে হলে নারী পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে, এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা) ভালভাবেই জানতেন। তাই তিনি নারী শিক্ষার প্রতি সমান গুরুত্ব দিতেন। তিনি পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরকেও আলাদাভাবে নির্দিষ্ট সময়ে তালীম দিতেন। ঈদের মাঠে দেখা যেত তিনি পুরুষদের সামনে ভাষণ শেষ করে নারীদের সমাবেশে গিয়ে বক্তব্য রাখতেন। নারী শিক্ষার প্রতি তিনি ভীষণভাবে তাগিদ দিতেন, উৎসাহ জোগাতেন। এ কারণে হযরত সুফিয়া, খানসা, আতিকা, জয়নব, মাইমুনা, রুকাইয়া (রা) এর মত বড় বড় কবি, হযরত আয়েশা (রা) এর মত প্রসিদ্ধ নারীদের দেখা যায় । যাদের জ্ঞান-গরিমা অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে বেশি মনে করা হতো। যে আটজন সাহাবী সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেন তন্মধ্যে হযরত আয়েশা (রা) হলেন দ্বিতীয়। কারো কারো মতে ইসলামী শরিয়তের বিধানে এক-চতুর্থাংশে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে । (তাবাকাতে ইবনে সাদ ২য় খণ্ড পৃ : ৭২১)

হাদীস বর্ণনাকারীদের গ্রন্থ ‘আসমাউস বিজাল'। এতে প্রায় এক হাজার সাহাবীর জীবন বৃত্তান্ত রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একশ পঞ্চাশ জন হচ্ছেন মহিলা সাহাবী। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, সে যুগে নারি শিক্ষার প্রতি কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।

গ. ক্রীতদাস-দাসীদের শিক্ষা : সমাজের সকল স্তরে যাতে শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন হয় সে দিকেও রাসূল (সা) নজর দেন। তিনি ক্রীতদাস-দাসীদের সাথে ভাল ব্যবহার করার সাথে সাথে তাদেরকে উত্তম শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দেন। হযরত বেলাল, সালমান ফরসি, খাব্বাব, ইয়াসার, আম্মার, যায়েদ ইবনে হারেসা, সুমাইয়া (রা) সহ এমন নারী-পুরুষ সাহাবা পাওয়া যায়, যারা শিক্ষা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, যোগ্যতার কারণে ইতিহাস খ্যাত হয়েছেন, অথচ তারা ছিলেন ক্রীতদাস-দাসী মাত্র।








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)