শাহ আলম নূর : নাট্য আন্দোলনের অগ্রনায়ক - মাহবুব মুকুল

OHS
By - Imran Ali Shagor
1

শাহ আলম নূর : নাট্য আন্দোলনের অগ্রনায়ক

মাহবুব মুকুল


শাহ আলম নূর ভাইয়ের সাথে আমার সরাসরি পরিচয় ’৯০ দশকের শেষের দিকে। তার আগে তাঁর অডিও নাটকের সাথে পরিচয়। ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজিয়ে নাটকগুলো এতোবার শুনেছি যে প্রায় নাটকেরই আকর্ষণীয় সংলাপগুলো মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। নূর ভাইয়ের একটা নাটকের নাম ছিলো জান্নাতের সিঁড়ি। এই নাটকটি আমরা (সমন্বয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ) একাধিকবার মঞ্চস্থ করেছি। 

২০০০ সালের দিকে বগুড়া থেকে ঢাকায় একটা ট্রেনিং নিতে এসে নূর ভাইয়ের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ হয় আমার। হালকা পাতলা গড়নের একজন মানুষ। কৌতুহল দীপ্ত মুখাবয়ব। আমাদের সে ট্রেনিং এ তিনি একটি ক্লাস নেয়ার জন্য এসেছিলেন। তিনি একজন বিজ্ঞাপনের মডেল যুবককে সাথে এনেছিলেন। নূর ভাই কি বিষয়ে ক্লাস নিয়েছিলেন সে কথা মনে নেই। তবে সে মডেলের চেহারা এখনো কিছুটা চোখে ভাসে। টিভি বিজ্ঞাপনের মডেল আমাদের কাছে অনেক বড় বিষয় তখন। নূর ভাই আমাদের (শিক্ষার্থীদের) বললেন মডেলের কাছে থেকে কিছু জানতে চাই কিনা? আমরা তাঁর কাছে যা জানতে চাইলাম তার কোন কিছুরই তিনি সুবিধাজনক উত্তর দিতে পারলেন না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন মডেলকে কান্নার অভিনয় করে দেখাতে বললো। মডেল পড়ে গেলো মহাবিপদে। কাচুমাচু করে বললো আমার কাছে তো গিøসারিন নেই কান্না করবো কিভাবে। তার এই কথায় সবাই হাসিতে ফেটে পড়লো। নূর ভাই নিজেও খানিকটা হেসে সবাইকে থামিয়ে দিলেন। এরপর তিনি টিভি নাটক নিয়ে যে কাজগুলো করছেন সে বিষয়ে বেশ কিছু কথা বলে চলে গেলেন। 

নূর ভাই ছিলেন আমার ও আমার সমসাময়িকদের কাছে স্বপ্নের মানুষের মতো। তাঁর সাথে কখনো দেখা হবে, কথা হবে এটা ভাবতেই পারতাম না ছোটবেলায়।  কিন্তু সেই স্বপ্নের মানুষটি সময়ের ব্যবধানে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। নূর ভাই এমন একজন নাটক অন্তঃপ্রাণ মানুষ ছিলেন এর বাইরে তেমন কিছুই আর ভাবতেন বলে আমার কাছে মনে হয়নি। তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে নিউজ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন সে হিসেবে তিনি একজন সাংবাদিকও বটে। কিন্তু সে পরিচয় কখনোই নাট্যকার পরিচয়ের উপরে স্থান পায়নি। সে কাজটি তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্যেই করেছেন। নিশ্বাসÑপ্রশ্বাসে তিনি কেবল নাটক নিয়েই ভেবেছেন। তাঁর এই ভাবনাটা এতোটাই মৌলিক ছিলো যে কোন বাঁধাই তাঁকে এ পথ থেকে চুল পরিমাণ সরাতে পারেনি। তিনি যে সময়ে নাট্য আন্দোলন নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন সে সময়টি তাঁর এ কাজের জন্য অনুক‚ল তো ছিলোই না বরং পদে পদে প্রতিক‚লতা অতিক্রম করে তাঁকে এগুতে হয়েছে। তাঁর সহযাত্রী বা সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি খুব কম মানুষকেই কাছে পেয়েছেন। তিনি যে আদর্শের পতাকা আমৃত্যু বহন করেছেন সে আদর্শের কর্তা ব্যক্তিদের দ্বারাও খুব বেশী উৎসাহিত হয়েছেন এমন বলা যাবে না। আর তিনি সংগঠিত আদর্শিক আন্দোলেনর তেমন কোন পদÑপদবীতে বা নীতি নির্ধারণী ফোরামে কখনোই ছিলেন না। তিনি নিজেই ছিলেন একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মতো। তাওহীদ, রেসালাত, আখেরাত ভিত্তিক জীবনব্যবস্থার একটি সরল রূপরেখা তিনি তাঁর নাট্যভাবনার ভেতর দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সব সময়। সে দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অনেকেই মনে মনে বৈপরিত্য পোষণ করতেন। আর সে বিষয়টি শাহ আলম নূর জানতেন আর এ কারণে তিনি সারাজীবন কিছুটা একলা চলো নীতিতে চলেছেন এবং তাঁর চিন্তার উপর অটল থেকে কাজ করে গেছেন। তবে তাঁকে অনেকেই ভুল বুঝলেও তিনি কখনোই কারো সাথে বিতর্ক করেননি। শাহ আলম নূরের নাট্য উপস্থাপনার বিষয়টি ছিলো সরাসরি। অর্থ্যাৎ তিনি যা বুঝতেন তার একটি সরল চিত্র সকলের কাছে বোধগম্য করে তুলে ধরেছেন। ক্লাসিক্যাল ধারার নাটকে যে প্রতীকী বয়ান থাকে সে রকম জটিলতা মুক্ত ছিলো তাঁর নাট্য উপস্থাপনা। শিল্পমানের দিক থেকে অতি উচ্চমাত্রার কোন কাজ তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই করেননি। ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার বিষয়গুলো তিনি আকারে ইঙ্গিতে বা বিমূর্ত ফরমেটে করাকে পছন্দ করতেন না বরং বিমূর্ত বিষয়গুলোকে আকার দান করে সাধারণ দর্শকের বোধগম্য করার কাজটি তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে করতে পেরেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় তিনি শয়তানের একটি দৈহিক আকৃতি দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন শয়তান কিভাবে মানুষকে ধোকা দেয়। তদ্রæপ ভাবে মানুষের ভেতরগত আমল আখলাক পাপ পূর্ণকে তিনি আকারগত চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এ বিষয়গুলো নিয়ে অতি নান্দনিকতার ধ্বজাধারীরা হয়তো হাসাহাসি করতেন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন কিন্তু দিন শেষে তারাও টের পেতেন শাহ আলম নূর সাধারণ দর্শকদের কাছে যে মেসেজ দিতে চেয়েছেন তা তিনি অত্যন্ত সফলভাবে দিতে পেরেছেন।

শাহ আলম নূর বছর পাঁচেক আগে যখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও নাট্য সংসদের সভাপতি হলেন তখন তিনি অনেকটাই বিস্মিত হয়েছিলেন। আমাকে তিনি বহুবার বলেছেন এ ধরনের পদে থেকে কাজ করতে হবে তা কখনো ভাবতেই পারেননি। তিনি এ দায়িত্বটিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর উপর অর্পিত একটি দায়িত্ব মনে করে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এ পদের মর্যাদা রক্ষা করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। এ দায়িত্বকে তিনি সারা বাংলাদেশে নাট্য আন্দোলনকে বেগবান করার একটি সুযোগ মনে করে দিনÑরাত চিন্তা ফিকির করেছেন। প্রতিটি জেলায় জেলায় নাট্য সংগঠন দাঁড় করানো এবং যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নাট্যকর্মী বাহিনী গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। সৌভাগ্যবশত এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটিতে আমি সেক্রেটারি মনোনীত হওয়ায় তিনি সব সময় তাঁর ভাবনাগুলো আমার কাছে ব্যক্ত করতেন। আর এর বাস্তবায়নের পথ খুঁজতেন এবং আমাকে খুঁজতে বলতেন। আমি তাঁর ভাবনার জগতের খুব নিকটে আসতে পেরেছিলাম। তিনি আমাকে কি বলতে চান তা বলার আগেই তা উপলব্ধি করতে পারতাম। দ্বিতীয় মেয়াদে এই সংগঠনের তিনি পুনরায় সভাপতি এবং আমি সহ-সভাপতি হওয়ার পর তাঁর সাথে আমার হৃদ্যতার গভীরতা আরো বেড়ে যায়।

নূর ভাই আমার অফিসে (প্যানভিশন) আসতেন প্রায়ই। তিনি মৃত্যুর একদিন আগেও আমার অফিসে এসেছিলেন। সেদিন তিনি আমাকে ভবিষ্যত নাট্য আন্দোলনে আমার করণীয় কি হবে তা সবিস্তারে বলেন। নূর ভাইয়ের মৃত্যুরপর বারবার তাঁর শেষের দিনের কথাগুলো মনে পড়ছিল। তিনি আমাকে আকাশ সমান স্বপ্ন দেখালেন সেদিন। তাঁর কথাগুলো তৎক্ষণাত অসম্ভব মনে হলেও এখন মনে হয় সম্ভব। এখন ভাবি এই অসম্ভবগুলোকে সম্ভব করার জন্যই তো আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নূর ভাই সরকারী বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন দেশের ’৯০ ভাগ মানুষের লালিত বিশ্বাসের বিপরীত ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি এই সব প্রতিষ্ঠানকে আগামী দিনে বিশ্বাসী সংস্কৃতি কর্মীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র বানানোর চিন্তা লালন করতেন। তাঁর এই সব স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন আমাদের সকলের। 

 লেখক: নাট্যকার ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন