কবি ফারুক মাহমুদ ভাইয়ের এক টুকরো স্মৃতি
আবদুল হালীম খাঁ
স্মৃতির জানালা খুললেই দেখি প্রিয় কবি ফারুক মাহমুদ ভাইয়ের ছবি। আজো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর মুখ, শুনি তাঁর আন্তরিকতাপূর্ণ ভালোবাসার কথা, কবিতা আবৃত্তি। মনে হয় যেনো হাজার বৎসর কাল যাবত ছিল তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সত্যি বলতে কি হৃদয়বান মানুষ ক্ষণিকের দেখায় মানুষকে আপন করে নিতে পারেন। আর তিনি হয়ে যান আত্মার পরম আত্মীয়। কবি ফারুক মাহমুদ ভাই ছিলেন এমনি একজন হৃদয়বান মানুষÑ হৃদয়বান উদার মহৎ কবি।
তাঁর অনেক কবিতা আমি পত্রিকায় পড়েছিলাম। একজনে তাঁর একটি কবিতার বই আমাকে উপহার দিয়েছিলেন, বলেছিলেন তাঁর সংগ্রামী জীবন কাহিনী। তাঁর জীবন কাহিনী শুনে তাঁকে দেখার ও তাঁর কবিতা পড়ার আগ্রহ আরো বেশি বেড়ে গিয়েছিল।
তখন ইসলামী ফাউন্ডেশনের অফিস ছিল বায়তুল মুকাররমে। একদিন দশটার দিকে কবি মুকুল চৌধুরীর অফিস রুমে বসে কথা বলতে ছিলাম। এ সময়ে অফিসের সম্মুখ দিয়ে বেশ লম্বা মানান সই স্বাস্থ্যের অধিকারী এক ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন। চৌধুরী সাব বললেন, উনাকে কি চিনেন? আমি বললাম, না, চিনি না। তখন মুকুল ভাই বললেন, উনিই তো আপনার প্রিয় কবি ফারুক মাহমুদ।
তাই নাকি? তাহলে তো দেখা করা প্রয়োজন।
মুকুল চৌধুরী তখনই আমাকে নিয়ে তাঁর অফিসে গিয়ে বললেন, কবি আবদুল হালীম খাঁকে চিনেন? এই যে আপনার কবিতার মুগ্ধ পাঠক, আপনার ভক্ত কবি আবদুল হালীম খাঁ।
আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, বসেন, কেমন আছেন? ঢাকা আসেন না?
এভাবে কবি ফারুক মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা এবং কথা হয়। সে সময় আমি ভঁ‚ইয়াপুর থেকে মাসিক ‘রেনেসাঁ’ নামে একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করি। দেশের খ্যাতিমান অনেক কবি সাহিত্যিকদের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লোক মারফত সংগ্রহ করে আমার পত্রিকায় প্রকাশ করি। কবি ফারুক মাহমুদ ভাই এর কয়েকটি কবিতা সংগ্রহ করে ছেপে ছিলাম। লেখকদের কাছে পত্রিকা ডাকে পাঠাতাম। পত্রিকার উপরে লিখে দিতাম ‘প্রাপ্তি সংবাদ জানাবেন’।
দু’চারজন বাদে কারো কাছ থেকেই প্রাপ্তি সংবাদ পেতাম না। অবহেলা করেই তারা আমাকে সংবাদ জানাতেন না। কিন্তু কবি মতিউর রহমান মল্লিক এবং কবি ফারুক মাহমুদ ছিলেন দারুণ সচেতন। তাঁরা প্রতিটি সংখ্যার প্রাপ্তি সংবাদ জানাতেন, পত্রিকার মানের প্রশংসা করতেন এবং আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন। তাঁদের সেই চিঠিপত্র আমি ‘রেনেসাঁ’ র পরবর্তী সংখ্যায় ছাপাতাম। এর ফলে আমাদের ভঁ‚ইয়াপুর গ্রাম অঞ্চলে যেখানে দু’একজন পাঠকÑলেখক ছিল, যাদের হাতে তুলে দিয়ে রেনেসাঁ পড়াতাম তারা ঐ সব খ্যাতিমান কবিদের মন্তব্য পড়ে খুশি হয়ে বলতেনÑ ‘বেশ তো আপনার পত্রিকার প্রশংসা বড় বড় কবি সাহিত্যিকরা করেছেন।’ কবি আবদুস সাত্তার সাহেবের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। আমার শ^শুর বাড়ি আমার গ্রামের পাশের গ্রামে। তিনি শ^শুর বাড়ি যাওয়ার সময় আমার পথে ভঁ‚ইয়াপুর এসে লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে আমাকে খুঁজে বের করে আমার লেখালেখির ও রেনেসাঁ পত্রিকার খোঁজ খবর নিতেন। রেনেসাঁর মাধ্যমেই আমি কবি আবদুল সাত্তার এর মতো এতো বড় উচ্চমানের ও বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে যাবার সুযোগ পাই।
যাক, কবি ফারুক মাহমুদ ভাই আমার রেনেসাঁর কোনো এক কপি পেয়ে পোস্ট কার্ডে লিখেছিলেন :
হালীম সাব,
আসসালাম। আপনার রেনেসাঁ পেলাম। গ্রাম অঞ্চল থেকে এত উন্নত মানের এতো সুন্দর পত্রিকা প্রকাশের জন্য আপনাকে অনেক মুবারকবাদ।
অশেষ শুভাক্সক্ষী
ফারুক মাহমুদ
মাসিক ‘রেনেসাঁ’ ৪র্থ বর্ষ, ৫ম সংখ্যা ডিসেম্বর/৮৬ বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত হয়। এ সংখ্যায় কবি ফারুক মাহমুদ এর ‘বৈপরীত্যে ঐক্য’ কবিতাসহ ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী, ড. গোলাম সাকলায়েন, কবি আল মাহমুদ, কবি আবদুস সাত্তার, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, আসাদ বিন হাফিজ ও কবি মোশাররফ হোসেন খানের লেখা ছাপা হয়। রেনেসাঁর এ সংখ্যাটি বেশ উন্নত মানেরই ছিল বলা চলে। ফারুক মাহমুদ ভাই রেনেসাঁ পেয়ে লিখেছিলেন :
কবি আবদুল হালীম খাঁ
সম্পাদক : রেনেসাঁ, ভ‚ইয়াপুর
আসসালাম। আপনার ‘রেনেসাঁ’ বিজয় দিবস সংখ্যা পেলাম। ভঁ‚ইয়াপুর বসে এত সব খ্যাতিমান কবির মত মূল্যবান রচনা সংগ্রহ করেন কিভাবে। হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ ভঁ‚ইয়াপুরের। মাটির একটা গুণ আছে। ইবরাহীম খাঁর তাছির পড়েছে আপনার উপর। চেষ্টা চালিয়ে যান। ঢাকা এলে দেখা করবেন।
শুভাকাক্সক্ষী
ফারুক মাহমুদ।
এরপর ১৯৯০ সাল। আমার ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ’ কাব্যটি প্রকাশিত হয়েছে। কিছু কাজে ঢাকা গিয়ে কবি মুকুল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তাঁকে এক কপি বই দিয়ে আলাপ করতে ছিলাম। বইটির আলোচনা কাকে দিয়ে করানো যায়। তিনি বললেন ফারুক মাহমুদ ভাইকে বলুন। ফারুক মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর দরজায় প্রবেশ করতেই তিনি নাটকের সংলাপের মতো বলতে লাগলেন :
কী হে কবি
দেখি না তো ছবি
পত্রিকায় পড়ি শুধু কবিতা-ছড়া
আগুন ভরা
ঝরা ঝরা.....
অফিস কক্ষে কয়েকজন বসেছিলেন, তারা সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। ফারুক ভাই একটু মুচকি হেসে তাঁর নিজের কি একটা কবিতা আবৃত্তি করলেন আবেগ ভরা কণ্ঠে। তারপর বললেন : কবিতা লিখে কাজ হবে না, কাজ হবে না। কলম চালানোর সঙ্গে এখন অস্ত্র চালাতে হবে। অস্ত্র চালাতে হবে। আজকাল পাঠকদের চামড়া বড় শক্ত হয়ে গ্যাছে। কলম আর তুলির আঁচড় তাতে বিদ্ধ হয় না। এ চামড়ার উপর-
নয় শুধু কলম
লাগাতে হবে অস্ত্রের মলম।...
এতোটুকু বলেই তিনি আবার এক চিলতে হাসলেন। আর অফিসে বসে থাকা কয়জন হো হো করে হেসে ওঠলেন।
এতোক্ষণ আমি শুধু আসসালামু আলাইকুম ছাড়া আর কিছুই বলার সুযোগ পাইনি। এবার তাঁর কুশল জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমার কুশল জিজ্ঞেস করে বললেন, ঢাকা করে এসেছেন, লেখালেখি কেমন করছেন। নতুন কোনো বইপত্র প্রকাশ করেছি কিনা জিজ্ঞেস করলেন। আমার ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ’ বইখানা ব্যাগ থেকে বের করে তাঁর নাম লিখে হাতে দিয়ে বললাম- একটু আলোচনা করে দেবেন।
তিনি বইটি কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে মধ্যে মধ্যে দু’একটা কবিতার অংশবিশেষ পড়ে উচ্চ কণ্ঠে আবৃত্তি ও করলেন এবং তারপর মন্তব্য করলেন- কবিতাগুলো বেশ শাণিত- বুলেটের মতোই। ‘ধন্যবাদ’ বলেই ওঠে দাঁড়ালেন এবং বেরুয়ে পড়লেন। বেরুতে বেরুতে বললেন, মাসে একটা প্রবন্ধ লিখছি খুব কষ্ট করে, বইয়ের আলোচনা করবো কখন?
ফারুক মাহমুদ ভাই আমার দাঁড়াও বাংলাদেশ কাব্যের আলোচনা করে দেননি বা আলোচনা করার সময় পাননি। তখনই তাকে কিছুটা অসুস্থ মনে হয়েছিল। এটাই কবি ফারুক মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা এবং আলাপ।
মাসিক রেনেসাঁ/১৯৮৬ বিজয় দিবস সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর সেই কবিতা
বৈপরীত্যে ঐক্য
ফারুক মাহমুদ
বিপরীত মেরুতে থেকেও আমরা দুজন এক,
অভিন্ন প্রকৃতি।
অদৃশ্যে বিশ^াস করি আমি,
তুমি বলো, ‘যা দেখি না মানি না কখনো।’
আমি বলি, আল্লাহ ছাড়া প্রভু নেই কেউ,
তুমি বলো, আল্লাহ খোদা শোষকের মন গড়া কেউ।’
আখিরাত ফেরেশতার আমার বিশ^াস,
তুমি বলো, ‘পরলোক পুরোটাই কল্পনা বিলাস।’
আমি বলি, আল কুরআন আসমানি কিতাব,
তুমি বলো, ‘বানোয়াট কিস্সা ও কাহিনী।’
আমি মানি, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল
তোমার যুক্তিতে, সেও ধুরন্ধর দক্ষ রাজনীতিক।’
তবু দেখো।
অর্থ লোভে নিত্য আমি ল²ীর পূজারী,
কামদেবতার দ্বারে উৎসর্গিত প্রাণ
ক্ষমতার দেবীমূলে সিজদায় আনত।
আর তুমি
ঝঞ্ঝা ক্ষুব্ধ যমুনার বেহাল ফেরিতে
পড় কালিমা এন্তার,
রুগ্ন হালতে
নামাজের পাটি আর অজুর বদনা হাতে প্রহর কাটাও,
সবার অলষ্যে লোে হামদ নাত নোট বুক ভরে
বার্ধক্যে বিবর-বৃত্তে দেখো।
বৃক্ষ-গুল্মপত্রে পুষ্পে অকৃত্রিম ঐশ^রিক আলো কুরআন তর্জমা নিয়ে পক্ষপুটে পথ চলো আর প্রশ্ন করো
‘লোকে যাক বলছে, বলো, আসলে কি আমি ঠিক তাই?’
আমিও মুমেন নই, তুমিও কাফির নও ঠিক
আমি তুমি দু জনই খাঁটি মুনাফিক।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক

